Friday, 17 November 2017

অমিয়ার একদিন

অমিয়ার একদিন #Throwback 17.11.2016

উদাস হয়ে বসেছিল অমিয়া। বিগত কয়েকমাসে জীবনটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল।  অমিয়া আজ দিশেহারা ।  সুনন্দ সামন্তের সঙ্গে সখ্যতা তো আজকের নয়, সেই যে যবে সুনন্দের প্রথমা স্ত্রী আত্মঘাতী হল, গোটা অফিস, আত্মীয় পরিজন সকলে বর্জন করেছিল ওকে।  অপ্রয়োজনে কেউ বার্তালাপ ও করত না।  শুধু অমিয়া ছিল, সেই গভীর ডিপ্রেসনের দিনগুলিতে ওরা ছিল নিছক বন্ধু।  অফিস অন্তে নির্ভেজাল আড্ডা,কখনও সাথে ঠান্ডা বীয়র।  আবার কখনও বা নিছক চা সিগারেট।  সুনন্দ বলত ,“ অমিয়া, মাই বাডি। ” কবে যে এই বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নিল সে কি ছাই অমিয়াও বুঝেছিল? বাবা মারা যাবার পর অমিয়া তখন এ্যাকিউট ডিপ্রেসনে ভুগছিল, দিনের পর দিন   অফিস কামাই।  নিজের চতুর্পাশে দুর্ভেদ্য  প্রাচীর গড়ে তুলেছিল অমিয়া। সেই প্রাচীর উড়িয়ে  টেনে হিঁচড়ে ডিপ্রেসন থেকে বার করেছিল সুনন্দ।  সেই কৃতজ্ঞতাবোধই হয়ে উঠল যত নষ্টের গোড়া।  বিবাহের প্রস্তাব অমিয়াই দেয়।  সুনন্দ ও আপত্তি করেনি।  বিয়ের পরও বছর কয়েক মন্দ কাটেনি। তারপর কি যে হল? সুনন্দ যেন ধীরে ধীরে ভুলে যেতে লাগল যে অমিয়া ওর জীবনে আছে।  প্রথমে ছুঁতোনাতায় আলাদা হল বিছানা।  স্টাডি রুমটাই হয়ে উঠল সুনন্দের শয়ন কক্ষ।  কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের কোন যুৎসই জবাব ওকে দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি সুনন্দ।  তীব্র অভিমানে দিন কয়েক মায়ের কাছে থেকে আসা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি অমিয়া। পরের ধাপে বন্ধ হল বার্তালাপ।  কথা বলতও না।  জবাবও দিত না। তৃতীয় ধাপে বন্ধ করল অমিয়ার মুখদর্শন। অমিয়া ডাইনিং হলে গিয়ে হাজির হলেই সটান উঠে চলে যেত সুনন্দ। অমিয়া কিছু কিনে আনলে বা রান্না করলে খেত না ।  অন্তিম ধাপে ছিল প্রকাশ্যে পরকীয়া।  অমিয়ারই চোখের সামনে ওদেরই দপ্তরের মহিলা সহকর্মীর সাথে রগরগে অ্যাফেয়ার।সেই নিয়ে গোটা অফিসে সে কি কেচ্ছা।  শেষে বীথি বলল,“ অমিয়াদি জানি তুমি সুনন্দ স্যারকে ভীষণ ভালবাস।  কিন্তু সহ্যের ও তো একটা সীমা আছে? উনি চান না এই বৈবাহিক সম্পর্ককে দীর্ঘায়ত করতে।  তুমি কি সত্যি সেটা বুঝতে পারছ না?”

মাস ছয়েক হল মায়ের কাছে আছে।  সম্পর্ক ভাঙা নিয়ে সুনন্দ কোন উচ্চবাচ্য করেনি। অমিয়াও নয়।  মা, বন্ধুরা বার কয়েক বলেছে উকিলের সাথে কথা বলতে।  বীথি পরিচিত  এক উকিলের নম্বরও যোগাড় করে দিয়েছে।  তাও মাস তিনেক হবে। অমিয়া ফোন করেনি। করতে পারেনি।

“ এই মরেছে! পয়সার ব্যাগটা কোথায় ফেললাম?” জনৈক মহিলা কণ্ঠ বলে উঠল, চমকে বাসে ফিরে এল অমিয়া। উল্টো দিকের সিটে বসে এক মধ্যচল্লিশের মহিলা তার ব্যাগ হাঁটকে চলেছেন, বাতানুকূল ভলভো বাস।  কন্ডাকটর পরম ভদ্র।  বিনীতভাবে বলল, “ আছে নির্ঘাত দিদি।  দেখুন না।  আমি ততক্ষণ অন্য টিকিট গুলো কাটি। ” কন্ডাকটর চলে গেলেও মহিলা ব্যাগ হাঁটকানো থামালেন না। কিছুক্ষণ পরে আবার আর্ত স্বর শোনা গেল,“ পেলাম না তো।  এবার কি হবে? হে ঠাকুর আমার আর কত পরীক্ষা নেবে?” শেষের দিকে মহিলার গলা ভেঙে গেল।  কেউ একজন পাশ থেকে বলল,“ কোথায় যাবেন?”
মহিলা কান্না চেপে জানাল,“ হাইকোর্ট নামব। ” পাশ থেকে অন্য কেউ বলল,“পয়সা  যখন নেই, এখানেই নেমে যান। ” ফিসফিসানি শোনা গেল,“ এসব এদের রোজের কেত্তণ। ” কথাটা মহিলার ও কানে গেল।  চোখের জল চলকে  উঠল।  উনি আর্ত স্বরে বললেন, “ বিশ্বাস করুন, আমি ভদ্র- ” কথা শেষ করত পারলেন না।  ক্ষণিক দম নিয়ে কাতর ভাবে বললেন,“ কেউ অনুগ্রহ করে টিকিটটা কাটিয়ে দেবেন? বিশ্বাস করুন আমার খুব বিপদ।  আমার ভাই আদালতে অপেক্ষা করছে, আমি পৌছেই টাকাটা ফেরৎ দিয়ে দেব।” অমিয়ার অসহ্য লাগছিল ওণার অসহয়তা। দৃঢ় স্বরে জানাল, “ আমি কাটিয়ে দিচ্ছি। ” টিকিটটা মহিলার হাতে দিতে উনি কৃতজ্ঞ ভাবে জানালেন, “ আপনি একটু হাইকোর্ট চলুন, আমি টাকাটা ফেরৎ দেব। ”
অমিয়া মৃদু হেসে বলল,“ মাত্র পঁয়তাল্লিশ টাকার জন্য আপনাকে হাইকোর্ট অবধি ধাওয়া করব? ছাড়ুন।  আপনি বিপদে পড়েছিলেন, এটুকু আর কি এমন?”
মহিলা নাছোড়বান্দা, “ আপনার নাম ঠিকানাটা দিন অন্তত।  প্লিজ ভাই!” মহিলার কাতর দৃষ্টির সামনে অমিয়া আর না করতে পারল না, দায়সারা ভাবে ঠিকানা দিয়ে নির্দিষ্ট  স্টপে নেমে পড়ল। ওর সঙ্গে রোজ নামেন, এক ভদ্রলোক  শুধু বললেন, “ রোজকার ব্যাপার দিদি।  কতজনকে দেবেন? ও টাকা আর পেয়েছেন?”

মহিলা সত্যিই এলেন না।  মঙ্গল থেকে রবিবার হয়ে গেল, তাঁর টিকিও দেখা গেল না। ভুলেও গেল অমিয়া।  রবিবার ভরপেট জলখাবার  খেয়ে, ছাতে গিয়ে মনের সুখে একটা বিড়ি ধরিয়েছে, হঠাৎ নীচে থেকে মা হাঁক পাড়ল, কে যেন দেখা করতে এসেছে।  দুড়দাড় করে নীচে নেমে দেখে সেই মহিলা একা বসে আছেন।  অমিয়া বাকরহিত। মহিলা সলজ্জ ভাবে বললেন, “ তোমার কবে ছুটি তা তো জানি না ভাই।  যদি দেখা না হয়, তাই -”
অমিয়া হাসবে না কাঁদবে? “ মাত্র কটা টাকা দিতে এত কষ্ট করলেন?”
“ মাত্র হতে পারে, তবে আমার দুঃসময়ে তোমার উপকারটুকু ভুলি কি করে?”
“ বসুন না। চা?” মহিলা মাথা নাড়লেন।  চা হতে যেটুকু সময় লাগে, ততক্ষণ কি কথা বলা যায়? মহিলাও মাথা নীচু করে নিজের হাত দেখছেন।  অমিয়া গলা ঝেড়ে বলল,“ তা আপনার সমস্যা মিটেছে?”
“ হুঁ চিরতরে। ”
“ বাঃ।  তাহলে তো নিশ্চিন্ত। ”
মহিলা মাথা না তুলেই ঘাড় নাড়লেন। নেহাৎ কথা বলার জন্যই অমিয়া জিজ্ঞাসা করল,“ তা কি সমস্যা সেটা কি জানতে পারি? মানে যদি সমীচীন হয়। ”
“ঐ দিন আমার স্বামীকে মুক্তি দিলাম। ”
“ অ্যাঁ?”
“ ডিভোর্স। ” মাথা তুলে করুণ ভাবে বললেন উনি।
“ কিন্তু  কেন?” উত্তেজিত ভাবে জিজ্ঞাসা করেই অমিয়া বুঝতে পারল শালীনতার সীমা লঙ্ঘন  করে ফেলেছে। ক্ষমা চাইতে যাবে, মহিলা বলে উঠলেন,“ সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।  পচা গলা সম্পর্ক আঁকড়ে তাও বসেছিলাম।  শয্যা আলাদা যে কবে হয়েছে আজ আর মনে পড়ে না। শেষের দিকে কথা বলা দূরের কথা, আমার উপস্থিতিও সহ্য করতে পারত না।”

“ ঘেন্না হত নিজেকে।  তোমাদের মত লেখাপড়া  শিখলে কবেই হয়তো বেড়িয়ে  আসতাম।  কোথায় যাব?নিরাপত্তাহীনতা নাকি প্রেম জানি না, হয়তো এই দ্বিধায় কেটে যেত জীবন।  কিন্তু উনি করজোড়ে মুক্তি চাইলেন। জানালেন, উনি শীঘ্রই বাবা হতে চলেছেন। সেই মহিলা ওণার বন্ধু পত্নী। ”
“ ছিঃ। ”ধপ করে বসে পড়ল অমিয়া। 
মহিলা মৃদু হাসলেন,“ওণার জীবন ভাই। যা ভাল বুঝেছেন। মাথা উঁচু করে বেড়িয়ে  এলাম।  খোরপোশ আদায় করার কথা বলেছিল আমার উকিল। নিইনি। ”
“কেন? ওটা আপনার অধিকার।  খাবেন কি? আপনাদের জন্যই এরা এত বাড়ে। ”ক্ষোভে ফেটে পড়ল অমিয়া।  অসহ্য ন্যাকা মেয়েছেলে। মহিলা ঘাড় উঁচু করে বললেন,“বাচ্ছা পড়াব, প্রয়োজনে লোকের বাড়ি বাসন মাজব। কিছু না হলে নিজেকে বেচব।
-----শেষের রেশ রাখব না। ”

মহিলা চলে গেছেন। মায়ের সঙ্গেও কিছুক্ষণ গল্প করে গেলেন।  নিজের ব্যক্তিগত কথা অবশ্য কিছু বলেননি। উনি চলে যাবার পর থেকে অমিয়া গোটা বাড়ি মাথায় তুলেছে, সেই বীথির দেওয়া উকিলের কার্ডটা কোথায় গেল? মা বা কাজের দিদি নির্ঘাত কোথাও ফেলেছে। ওটা ওর এক্ষুণি চাই।

Monday, 13 November 2017

অফিস অফিস

#১ ০৭/১১/২০১৭
সক্কাল সক্কাল তানিয়াদির ফোন, “ওরে মেইল আইডি টা দে রে।” কাল রাতে কথা দিয়েছিলাম,আজ অফিসে ঢুকেই, এক বিশেষ সরকারী দপ্তরের মেইল আইডি পাঠিয়ে দেব। যথারীতি ভুলে গেছি, তড়িঘড়ি মেল খুলে বললাম, “একটু লিখে নেবে প্লিজ।”
“বল”।
“wbhgl”
“ডবলু বি এইচ আর কি বললি বি?”
“বি নয় রে বাবা জি।জি। জি ফর গোয়াল ঘর।”
তানিয়া দি ফোনের ওপাশে হাল্কা হেসে গম্ভীর ভাবে বলল, “আমি বলতে যাচ্ছিলাম গরু আর তুই বললি গোয়ালঘর। কি বিস্ময়কর মিল আমাদের চিন্তাধারায়! ”
কি করব বলুন। দিনরাত্রি সবাই মিলে যে ভাবে গরু, গোমাতা, গোমূত্র, গোময়, গোবলয় নিয়ে পড়েছেন, আমাদের মত দুই তুচ্ছ মহিলাশ্রমিকের মাথাতেও আজকাল তাই জি দিয়ে গরু, গোয়ালঘর এসবই আসে।

Saturday, 11 November 2017

শ্রমিক আমি

শ্রমিক আমি (পর্ব-৪)
মনে করুন আপনি কোন বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত একজন শ্রমিক,এবার মালিকপক্ষ হঠাৎ করে একদিন আপনাকে বলে দিল কাল থেকে আর কাজে আসতে হবে না, কোনরকম নোটিশ ধরালো না, শোকজ করল না, এক মাসের অগ্রিম বেতন দিল না, কিছুই করল না, শুধু বলল, “বাপু অনেক হয়েছে, ভালোয় ভালোয় বিদায় দিলাম, আলোয় আলোয় চলে যাও”। তখন আপনি কি করবেন?
আপনাকে আসতে হবে আমাদের কাছে, আপনার মহকুমায় যে অ্যাসিস্ট্যান্ট বা ডেপুটি লেবার কমিশনারের দপ্তর আছে, আপনাকে সেখানে গিয়ে সাদা কাগজে তিন কপি দরখাস্ত দিতে হবে। আপনি অবশ্যই মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রেও আদালত জানতে চাইবে আপনি আমাদের কাছে এসেছিলেন কি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আদালত আবার ঘুরিয়ে আপনাকে আমাদের কাছেই পাঠাবে।
যাইহোক এবার আমরা কি করব? ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট, ১৯৪৭ অনুসারে আমরা হলাম কন্সিলিয়েশন অফিসার, আইনে আমাদের অসীম ক্ষমতা দেওয়া আছে, ডিসপিউটের মীমাংসা করার জন্য আমরা আক্ষরিক অর্থেই যা খুশি করতে পারি, এমনকি তেমন ত্যাঁদড় মালিক পক্ষকে দরকার হলে সমন পাঠিয়ে ধরে আনার অধিকারও আমাদের আছে। বাবা-বাছা করে হোক, ধমক-ধামক-হুমকি দিয়ে হোক, দুপক্ষকে বুঝিয়ে শুনিয়ে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি, পেরে গেলে ভালো, কিন্তু আদালতের মত কথা না শুনলে শাস্তি দেবার ক্ষমতা তো বেচারি কন্সিলিয়েশ্ন অফিসারের থাকে না, হাতে কোন ডাণ্ডা থাকে না যে গোঁয়ার গুলোকে দুঘা দিতে পারি, তাই যখন দেখা যায় এই কেসটার আর কোন মেরিট নেই, বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল মার্কা কানা গলিতে ঢুকে পড়েছি, তখন বাধ্য হয়ে ফেলিওর রিপোর্ট করতে হয় ওপরতলায়।গুরুত্ব বুঝে যা কালক্রমে কোর্টে পাঠানো হবে কি হবে না, সে সিদ্ধান্ত নেয় সদর দপ্তর।
আমার এই এগারো বছরের চাকরী জীবনে এরকম যে কটি কেসের সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রতিটিকে নিয়েই একেকটা গল্প লেখা যায়। যেহেতু নিখাদ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে তাই কন্সিলিয়েশন অফিসারের চেয়ারে বসেও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারি কই? অধিকাংশ সময়ই আমি নিজেই শ্রমিকের হয়ে সওয়াল জবাব করি এবং মনে মনে মালিক পক্ষকে শূলে চড়াই। এত বড় সাহস? এক কথায় একটা লোকের চাকরী খেয়ে নাও? কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে মালিকেরও তেমন দোষ থাকে না, মালিক পক্ষ চায়, বাবা অন্যায় হয়ে গেছে, না জেনে করে ফেলেছি এসো মিট্মাট করে নি- কিন্তু বলে না বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়, শ্রমিক নিমরাজি হলেও তার হিতাকাঙ্ক্ষীরা কিছুতেই রাজি হয় না।
সময়কাল বা স্থানকাল সম্বন্ধে নীরব থাকছি, একদিন এক ভদ্রমহিলা এলেন আমার কাছে, “নমস্কার ম্যাডাম। আমি অমুক স্কুলে পড়াই।“ দিদিমণির বরের একটি কেস চলছিল আমার তৎকালীন দপ্তরে। ফাইল থেকে যা বুঝলাম, ভদ্রলোক একজন কনট্রাক্টরের অধীনে একটি আপৎকালীন সরকারী দপ্তরে মোবাইল ভ্যান চালাতেন, কোন কারণবশতঃ উনি একদিন এমারজেন্সি ডিউটিতে যেতে পারেননি, ফলে ওনার চাকরী চলে যায়। কেসটা এসেছিল আমার পূর্বসূরির জমানায়, মালিক পক্ষকে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য লিখিত ভাবে জানাতে বলার পরই সে বেচারা বদলী হয়ে যায় এবং যাবার সময় দিদিমণিকে বলে যায় যে, “ম্যাডাম আসছেন। উনি ঠিক ধমকে ধামকে আপনার স্বামীর চাকরী ফিরিয়ে দেবেন।“যদিও বন্ধু মানুষ, তবু মনে মনে পূর্বসূরির মুণ্ডপাত করলাম, খুব ভালোই জানে, যে, ম্যাডাম তো দুরস্থান ম্যাডামের পিতৃদেবও কাউকে চাকরীতে পুনর্বহাল করার ক্ষমতা রাখেন না।
মালিক পক্ষকে উদোম ঝাড়লাম, লিখিত জবাব দেননি কেন? বৃদ্ধ মালিক ভয়ে ভয়ে বলল, “ম্যাডাম আমার শরীর ভালো নয়, ভেলোরে গেছিলাম, এই ফিরেছি, আপনি যেদিন ডাকবেন আসব।“ ডাকলাম দুপক্ষকে। শ্রমিকের সাথে সাথে দিদিমণিও এলেন।আলোচনা শুরু হল,মালিক জানালেন, ঐ ড্রাইভারের জন্য সেদিন সরকারের আপৎকালীন পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়,সরকারী দপ্তর ওনাকে শোকজ করে, এবং দপ্তরের আধিকারিক হুমকি দেন,ঐ ড্রাইভারকে না সরালে ওনার কন্ট্রাক্ট বাতিল করে দেবেন। নিঃসন্তান বৃদ্ধ মালিক, কন্ট্রাক্ট গেলে ওনার খাওয়া পড়ার অভাব হবে না, কিন্তু ওনার অধীনে কর্মরত বাকি ছেলে গুলোর কি হবে, এই ভেবে উনি এই ড্রাইভারটিকে বরখাস্ত করেন। এ গল্প আমার বহু পরিচিত। সব কেসেই মালিক এমনই কিছু ফাঁদে, যদিও এই লোকটিকে খুব একটা প্যাঁচালো মনে হল না।
এবার শ্রমিকের পালা, মালিকের বক্তব্যের মধ্যেই দিদিমণি অন্তত বার পাঁচেক মিথ্যা কথা, মিথ্যাবাদী, বাজে বকছে এসব করেছেন। বার কয়েক ধমক দিলাম, তাও শোনে না। শ্রমিককে যখন বলার সুযোগ দেওয়া হল, দিদিমণি, আগ বাড়িয়ে বললেন, “আমি বলছি, তুমি থামোঃ।“ আবার ধ্মকালাম,কে কার কথা শোনে, অচিরেই বুঝতে পারলাম না আমি দিদিমণির ক্লাশে বসে আছি, না দিদিমণি আমার চেম্বারে। তবে দিদিমণির প্রবল ধমক হুমকি অভিযোগের যা সারমর্ম বুঝলাম, শ্রমিক চায় ক্ষতিপূরণ সহ তাকে আবার পুনর্বহাল করা হোক। মালিক পক্ষ জানালো, আপাতত কোন কাজ ফাঁকা নেই,ড্রাইভার একজন নেওয়া হয়ে গেছে, যেহেতু মোবাইল ভ্যানটি সচল থাকা আবশ্যক। দিদিমণি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চিৎকার জুড়লেন, “ঐ ছেলেটাকে নেয় কোন সাহসে? ওকে আজই তাড়িয়ে দিয়ে আমার স্বামীকে নিতে হবে।“
এবার দেখলাম দিদিমণির ক্লাশ না নিলে চলছে না, ওনার চার গুণ চিৎকার করে বললাম, “আপনি শ্রম কমিশনারের অফিসে এসে,আর একজনকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করার দাবী করছেন? অনেক ক্ষণ থেকে আপনার বকবক শুনছি, মুখ বন্ধ করে না বসলে, চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।“ জোঁকের মুখে নুন পড়ার মত উনি শান্ত হয়ে বসলেন। মালিককে আলাদা করে বললাম, বিনা নোটিশে এভাবে ছাড়িয়ে দেওয়া বেআইনি কাজ, মিটমাট করে নিন। ঐ কাজ না দিতে পারেন, অন্য কোন কাজে লাগিয়ে দিন। একদিন যেতে পারেনি, হতেই পারে। এমন কিছু গর্হিত অপরাধ তো করেনি।
মালিক নিমরাজি হল, অন্য একটি চাকরী দিতে কিন্তু শ্রমিক কিছু বলার আগেই ওনার জাঁদরেল দিদিমণি ঝাঁপিয়ে পড়লেন, “ না নেব না। আমরা কিছুতেই অন্য চাকরী নেব না। নতুন ছেলেটাকে দূর করে আমার বরকে তার পুরানো চাকরী ফেরত দিতে হবে। ও ভেবেছেটা কি? ওকে আমি কোর্টে টেনে নিয়ে যাব। জেলের ঘানি ঘোরাব।“ দিদিমণিকে বুঝিয়ে বললাম, কোর্টে টেনে নিয়ে যাবেন সে তো ঠিকই আছে, কিন্তু এই অপরাধে কারো জেল হয় না। মাত্র কয়েকটা মিটিংয়েই যখন মিটে যাবার সম্ভবনা দেখা দিচ্ছে, তখন অনুগ্রহ করে তা নষ্ট করবেন না। কিন্তু কোন কথাই ওনারা শুনতে রাজি নন। ক্রমাগত দিদিমণির বাক্যবাণে আহত হতে হতে এবার বুড়ো মালিকও বেঁকে বসল।
অবস্থা আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ডিএলসি সাহেবের শরণাপন্ন হলাম, স্যারের ঘরে মিটিং ডাকা হল যতদিনে, ততদিনে চাকরী যাবার পর থেকে দশ মাস অতিক্রান্ত। প্রস্তাবিত ফাঁকা চাকরিটাও ইতিমধ্যে একজনকে দিয়ে দিয়েছেন বুড়ো মালিক। দিদিমণির দাবী সেই এক। স্যার খুব ভালো ভাবে বোঝালেন,এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণই একমাত্র উপায়। মালিককে বাইরে পাঠিয়ে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলেন শ্রমিককে, “দিদিমণি আপনি চুপ থাকুন। ভাই সত্যি বলতো, দশ মাস ধরে তুমি তো বসে নেই, কিছু করছ তো?” প্রসঙ্গত ওনারা যদিও বলেননি, কিন্তু আমরা জানতাম যে লোকটি টুকটাক কাজ করছে। ব্যাপারটা ওনাদের কাছে ইগোর পর্যায়ে চলে গেছে, মালিক শ্রমিক একই পাড়ার বাসিন্দা, একজন আর একজনকে বসিয়ে দিয়েছে, এবার এ শ্রম দপ্তরের সাহায্যে বুড়োকে উচিৎ শিক্ষা দিতে চায়, তাই ঐ চাকরিটাই ওদের চাই। স্যারের সামনে যদিও তা স্বীকার করল না, লোকটি বলতে গেল, “ঐ আর কি-“। দিদিমণি হাত নেড়ে বললেন,”সেটা কথা নয়। নতুন ছেলেটিকে ছাড়িয়ে...”।
অনেক ধস্তাধস্তির পর স্যার উভয় পক্ষকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে এবং নিতে রাজি করলেন। ঠিক হল, পরের মিটিং এ এসে এরা জানাবে, কত চায়, ওদের ওটা দিতে হবে, যেহেতু দোষ মালিকেরই।
নির্দিষ্ট দিনে এলেন সকলে, স্যার আগে সস্ত্রীক শ্রমিকের সাথে কথা বললেন, ওরা কোন টাকা ঠিক করে আসেনি, স্যার যা বলবেন তাই নেবে। স্যার বললেন, তিন মাসের বেতন যাতে ও পায় উনি সেই দাবীই জানাবেন, শ্রমিক রাজি হয়ে ঘাড় নাড়াতে লাগল, দিদিমণি শক্ত হয়ে বসে রইলেন, মালিক এল, স্যার কথা পাড়তে যাবেন, দিদিমণি ফোঁৎ করে বলল, “ঐ কটা টাকায় কি হয়? নতুন ছেলেটাকে দূর করে আমার বরকে তার পুরানো চাকরী ফেরত দিতে হবে।“স্যার হতাশ হয়ে বললেন, “অনিন্দিতা ১২/৪ করে দাও।এর কোন মীমাংসা হওয়া সম্ভব নয়।“ ১২/৪ হল ফেলিওর রিপোর্ট। হয়ে যাওয়া কেস দু- দুবার এভাবে কেঁচে যেতে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল, ক্লান্ত হাতে নোটশিট লিখছি, আড়চোখে দেখলাম, শ্রমিকটি মাথা নিচু করে বসে আছে্‌, একবার চোখ তুলে তাকালো এক রাশ হতাশা নিয়ে প্রশ্ন করল, “এবার কি হবে? কোথায় যাব?” কি জবাব দেব? সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার পর যদি হেরে যেতে হয়, তাও যার জন্য লড়াই তারই নির্বুদ্ধিতায়, কিই বা বলার থাকে-

Friday, 20 October 2017

অনির চিকমাগালুরের ডাইরি II

অনির চিকমাগালুরের ডাইরি ৩রা অক্টোবর  ২০১৭ (পর্ব-৫)
মুথুডি আসলে ভদ্রা অভয়ারণ্যেরই একটি অংশ। চিকমাগালুর শহর ছেড়ে মাত্র ৩৮কিলোমিটার গেলেই ভদ্রা অভয়ারণ্য শুরু।

কথিত অছে ১৯৫১ সালে তৎকালীন মহীশূর সরকার সাড়ে সাতাত্তর বর্গ কিলোমিটার জঙ্গল নিয়ে জাগারা উপত্যকা সংরক্ষিত অভয়ারণ্য গড়ে তোলেন। ১৯৭৪সালে আসে পাশের আরো খানিক এলাকা এই অভয়ারণ্যের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় এবং সাথে সাথে এর নতুন নাম দেওয়া হয় ভদ্রা। ১৯৯৮ সালে ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্প চালু হয়। বর্তমানে ভদ্রা নাকি ৩৩টি বাঘের আবাস স্থল।শুনলাম ভদ্রার মূল সমস্যা হল আসেপাশের ঘণ জনবসতি। মানুষ প্রায় জঙ্গলে ঢুকে চোরাগোপ্তা শিকার করত, গাছে কেটে নিয়ে যেত।গবাদী পশু দিব্যি চরতে আসত,এই গবাদী পশুদের থেকেই ফুট এন্ড মাউথ রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং জঙ্গলী গাউরদের প্রায় নির্বংশ করে ফেলে। অবশেষে এই অভয়ারণ্যে অবস্থিত ২৬টি গ্রামকে স্থানান্তরণ করা হয়। ভারতের প্রথম অভয়ারণ্য যেখানে পশুর জন্য মানুষকে পিছিয়ে যেতে হয়।
এহেন ভদ্রা থুড়ি মুথুডিতে যখন আমরা পৌঁছলাম ঘড়ির কাঁটায় বেলা সোয়া দুটো। গাড়ি যেখানে নামাল একটা খোলা চত্বর, চতুর্দিকে বড় বড় গাছ আর দুতিনটি একতলা বাড়ি। একটা বাড়ির সামনে একটা বড় বাস দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল, এই বাসে করে ঘোরাবে নাকি?জলপাই রঙের মিনিবাসের সাইজের বাস, যার জানলা গুলি বিশাল বড় বড়। এই ধরণের বাসে করে নন্দনকাননে সাফারি করায়,যদিও তার জানলা গুলি অনেক ছোট এবং ঘেরা। শৌভিক আর দেবু বলাবলি করছিল জিপেই চড়বে। চড়বে তো বটে চড়াবে কে?আসে পাশে অনেক মানুষজন, সব কন্নড় ভাষায় বার্তালাপ করছে, বাচ্ছারা ক্যাঁওম্যাও করছে কিন্তু টিকিটের কোন কাউন্টার নেই। একটা বন্ধ বাড়ির বারন্দায় অনেকগুলি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা তাতে বয়স্ক মানুষজন বসে বসে হাঁটুতে হাত বুলাচ্ছে,পিছনে বড় বোর্ডে লেখা আছে, সাফারির রেট কত। ব্যাস আর কেউ নেই।
আমি আর অন্বেষা বাচ্ছাদের নিয়ে ফাঁকা চেয়ারে বসলাম, শৌভিক আর দেবু শিকারী বেড়ালের মত দাঁড়িয়ে রইল। তিনটে নাগাদ একটা জলপাই সবুজ ইউনিফর্ম পরা লোক এল,হাতে একটা পিসবোর্ডে আটকানো কাগজ আর পেন, দণ্ডায়মান  যাবতীয় পুরুষ তাকে ঘিরে ধরল। কয়েক মুহূর্তমধ্যে পিলপিল করে এক দঙ্গল লোক বাসে উঠে পড়ল। বাস ছেড়েও দিল।একটা চতুর্দিক খোলা জিপ এল,একটা চতুর্দিক ঢাকা জিপ এল,একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। শৌভিকের মুখ ক্রমে কালো হয়ে উঠছিল।হেরে যাওয়া স্বরে বলল,“সব বুকড্। ”সত্যি বলছি মুথুডিতে না ঢুকতে পারলেও আমার কিচ্ছু যায় আসে না। দেবু হাল ছাড়ল না,“না দেখে যাবই না। এবার আমাদের জায়গা না দিলে বাংলায় কথা বলতে শুরু করব। যেতে পারি না পারি গালাগাল তো দিয়ে যাব। ”
জায়গা শেষে পাওয়া গেল,খোলা জিপ,মাথায় শুধু একটা ছাউনি। গোঁতাগুতি করে উঠলাম আমরা আরো কয়েকজন কন্নড় আর একটা পাঞ্জাবি সবৎস দম্পতির সাথে। যাদের বছর দুয়ের শিশুপুত্র গোটা সাফারি চলাকালীন হয় চিল্লালো নয় বল মনে করে শৌভিক আর অন্বেষার পিঠে লাথি মেরে গেল।
যাই হোক জিপ জঙ্গলে ঢুকল। ড্রাইভার দাবী করল সে হিন্দি জানে, জঙ্গল এর নাম জঙ্গল,জানোয়ার আছে এক দঙ্গল-প্রথমবার গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার খুব নাটকীয় ভঙ্গীতে বলল, সামনের কালো গাছটিতে ইন্ডিয়ান ম্যানইটার আছে। সবাই চুপ। ম্যানইটার মানে আমি ভাবলাম,বাঘমামা নির্ঘাত গাছে চড়ে বসে আছে,এখুনি ধপ করে লাফিয়ে নামবে এবং সবকটাকে একসাথে গপ্ করে গিলে নেবে। ওবাবা কোথায় বাঘ মামা? সবাই ফিসফিস করে বলছে ঐতো ঐতো। আমি আর আমার মেয়েই খালি দেখতে পাচ্ছি না, তালকানা আর কাকে বলে? শেষে দেখলাম বাঘ নয়,একটা বড় গোসাপ জাতীয় প্রাণী, যার পোশাকী নাম কমন ইন্ডিয়ান মনিটর আদপেই ম্যানইটার নয়। আরো গভীর জঙ্গলে ঢুকল গাড়ি,আবার মনিটর, এবারে একজোড়া,গভীর আশ্লেষে আলিঙ্গনাবদ্ধ। বছরে এক আধবারই ব্যাপারটা হয় বলে বোধহয় ওদের কোন হেলদোল নেই, পাশ দিয়ে গড়গড়িয়ে লড়ঝড়ে জিপ চলে গেল,গুচ্ছ গুচ্ছ ক্যামেরা মোবাইল ক্লিক্ ক্লিক করে উঠল,চারটে বাঙালী আর পাঞ্জাবি বাচ্ছা চিল্লিয়ে উঠল ওদের ভ্রূক্ষেপ নেই। শৌভিক শুধু ফিসফিসিয়ে জানতে চাইল, দুটো গোসাপের ইয়ে দেখাকে শুভ লক্ষণ বলে না?তাহলে হয়তো বাঘ মামার দর্শন পেতেও পারি। মুখ ঝামটা দিয়ে জানিয়ে দিলাম দুটো সাপের ইয়ে শুভ বলা হয়,গোসাপেরটা কি কেউ জানে না।
এরপর দেখলাম একটা গাউর। কি বিশাল। কাদায় দাপাদাপি  করছিল, আমাদের দেখে এত সুন্দর পোজ দিল কি বলব। যেন পোষা। একবার সামনে ফিরে, একবার পিছন ফিরে, যাবতীয় পেশী প্রদর্শনপূর্বক এন্তার ছবি তুলিয়েও সে নড়ল না। অগত্যা আমরাই ওকে ছেড়ে এগোলাম। এবার একটা পুঁচকে বার্কিং ডিয়ার আমাদের দেখে পোঁ পোঁ করে দৌড়ল। তারপর একদল গাউর,দিব্যি চড়ছিল, আচমকা আমাদের দেখে ল্যাজ তুলে দৌড়ে পালাল। ড্রাইভার অনেকবার গাড়ি এগোলো পেছোলো, ওবাবা কি চালাক গাউর সব, পাশের ঝোপ থেকে উঁকি ঝুঁকি মারছিল, কিন্তু ক্যামেরা তাগ করলেই টুক করে লুকিয়ে পড়ছিল। আবার একটা ইন্ডিয়ান মনিটর,পোঁ পোঁ করে এপাশ থেকে ওপাশে পালিয়ে গেল,সবাই বলল নির্ঘাত সেই প্রেমালাপী যুগলের একজন। এতক্ষণে প্রেমপর্ব সমাধা হয়েছে হয়তো। জঙ্গলে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছিল, দেবু বলল,“ভালোই হয়েছে আমরা প্রথম চোটে ঢুকতে পারিনি। এই সন্ধ্যার মুখেই সব জন্তু গুলো বের হয়। ” পলায়মান ছোট বড় জীবজন্তু দেখতে দেখতে কোর এরিয়াকে পাশ কাটিয়ে আমরা যখন বেরিয়ে আসছি আবার দেখা সেই আলিঙ্গনাবদ্ধ  মনিটরদ্বয়ের সঙ্গ, নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে দিব্যি মাটিতে গড়াগড়ি করে আনন্দমিলনে আবদ্ধ দুটোয়। এবার ফেরার পালা, কাল সকাল সাড়ে আটটায় বেরোতে হবে,মূল্যায়নগিরি দেখতে,দেরী হয়ে গেলেই ব্যস্,এমন জ্যাম হয়ে যায়, ফিরে আসতে হয়। প্রায় ২-৩কিমি ট্রেক করে উঠতে হয়, তাই অন্বেষা কাল যাবে না। দুটো গুড়গুড়িকে নিয়ে হোটেলেই থেকে যাবে। তুত্তুরীও মহানন্দে রাজি। সারাদিন গাড়ি করে ঘোরা ওর ও নাপসন্দ অন্বেষা মামির সাথে খেলাই হল না আজকে, কাল পুষিয়ে  নেবে। ওঃ ভুলে গেছিলাম, আজ তো বিজয়া দশমী। শুভ বিজয়া।
অনির চিকমাগালুরের ডাইরি ৪ঠা অক্টোবর  ২০১৭ (পর্ব ৬)
আজ গন্তব্য মূল্যায়নগিরি। মূল্যায়নগিরি হল আদতে পশ্চিমঘাট পর্বতমালারই একটি অংশ এবং কর্ণাটকের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। কর্ণাটকের সবথেকে জনপ্রিয় ট্রেকিং রুট। কোন এককালে পাকদণ্ডী যাকে এরা বলে সর্পদণ্ডী, বেয়ে উঠতে হত। এখন পিচের রাস্তা উঠে গেছে অনেকটাই, তারপর ৩০০খাড়াই সিঁড়ি।
চিকমাগালুর থেকে যেতে বেশীক্ষণ লাগে না,ঘন্টা খানেক। কিন্তু সাংঘাতিক জ্যাম হয় নাকি,ডেভিড অর্থাৎ আমাদের বাহনচালক বলল সাড়ে আটটা থেকে পৌনে নটার মধ্যে যদি না বেরোতে পারি, রাস্তা এত জ্যাম হয়ে যাবে যে আর যেতে পারব না।
ঠিক পৌনে নটায় বের হয়েও শেষ রক্ষা হল না। দুপাশে মনোরম জঙ্গল মাঝখান দিয়ে রাস্তা। ডেভিড বলল, এ গুলো জঙ্গল না এস্টেট। বিশাল বিশাল জনমানবশূন্য  এস্টেটের কোনটিতে কফি চাষ হয়, তো কোনটিতে গোল মরিচ, এলাচ বা দারুচিনি। এছাড়া নানা ঔষধি গাছেরও চাষ হয়। সদ্য মনোরম জঙ্গল পেরিয়ে পাহাড়ি পথে উঠেছে গাড়ি, উল্টো দিক সাঁ করে থেকে আসা একটি গাড়ির চালক উত্তেজিত ভাবে আমাদের ডেভিডকে কন্নড় ভাষায় কিছু বলল, যার মধ্যে জ্যাম শব্দটিই শুধু পরিচিত। দেবু উত্তেজিত হয়ে বলল,“এখানে জ্যাম হয় কি করে?কতজন ট্যুরিস্ট আসে?”সত্যি বিগত কয়দিনে একটিও বাঙালি চোখে পড়েনি। ভাত-পোস্ত-মাছ-গ্যাস-অম্বল এসব মনে হয় গতজন্মে শুনেছিলাম, তাহলে?আর জ্যাম কোথায়?দিব্যি ৮০কিমি বেগে টাটা সুমো দৌড়চ্ছে। পথে আরো অনেকগুলি গাড়ি দেখলাম নেমে যাচ্ছে। কেউ কেউ ফাঁকা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে খাদের সামনে দাঁড়িয়ে সেল্ফি তুলছে। মাঝে একটু জ্যাম হল বটে আবার গাড়ি চলতে লাগল। শৌভিক এবার প্রশ্নই করল,“জ্যাম আছে ডেভিড?”ডেভিড মাথা নেড়ে জানাল,“জ্যাম তো হ্যায়।”তাহলে এত গাড়ি উল্টো দিকে নামছে কেন?দেবু বলল ওরা জ্যাম দেখে কেটে পড়ছে, আমরা যতক্ষণে পৌছব, ময়দান ফাঁকা হয়ে যাবে। এত সহজ নয় ব্যাপারটা। একটা বাঁকে এসে পুলিশ আর উঠতে দিল না। শৌভিক করুণ সুরে জানতে চাইল এখান থেকে নেমে হাঁটলে কেমন হয়? ডেভিড মাথা নেড়ে নাক চুলকে জানাল ২৫কিলোমিটার মাত্র, হাঁটতে চাইলে ওর আপত্তি নেই।
অগত্যা তিক্ত মুখে গাড়ি এগোলো কাবিকালগুণ্ডি ভিউ পয়েন্টের দিকে। পথে দেবু আর শৌভিক মুণ্ডপাত করতে লাগল,“যত উটকো লোকজন সব। তিনদিন ছুটি পেয়েছে ওমনি ব্যাঙ্গালোর থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। এদের পাহাড়ে গাড়ি চালাতে দেয় কেন?নভিশ ড্রাইভারের দল, গাড়ি ঘোরাতে পাারে না, এগোতে পারে না” ইত্যাদি ইত্যাদি। ডেভিড আবার নাক আর টাক চুলকে বলল, ফেরার পথে নিয়ে যাবেই আমাদের।
কাবিকালগুণ্ডি ভিউ পয়েন্টেও বেশ ভিড়। দুপাশে গভীর খাদ, অল্প দূরেই তিনটি চূড়া আর হুহু করে ঢুকে পড়া মেঘের দল। খাদের ধারে বেঞ্চে বসে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আবার রওনা দিলাম। এখানেও যথারীতি  নব্য ড্রাইভারদের জন্য জ্যাম। বড় বাস গলে গেল, কিন্তু দামী পুঁচকে গাড়ি না এগোয় না পিছোয়, যদি দাগ লেগে যায়। এরপর একটা ঝর্ণা দেখিয়ে গাড়িটা ঘ্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে গেল। ডেভিড পাশের মোরাম রাস্তাটা দেখিয়ে বলল জেরি ফলস্ দেখতে হলে হেঁটে যেতে হবে। হাঁটতে লাগলাম। জনমানবশূন্য লাল মাটির রাস্তা। একপাশ ঘণ জঙ্গল আর খাদ, অন্যপাশে সবুজ পাহাড়, মাঝে এক দেড় ফুট চওড়া রাস্তা। কত যে রঙ বেরঙের ফুল ফুটেছে, মনোরম স্বপ্নময় পরিবেশ। হাঁটছি  হাঁটছি হাঁটছি, প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে ফেললাম, কোথায় ঝর্ণা। মাঝে নীচে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা জঙ্গুলে নদী চোখে পড়ল, খলখল করে বয়ে যাচ্ছে। দেবু মাথা টাথা চুলকে বলল, আমরা ক্রমেই নামছি,নীচের দিকে ঝর্ণা কি করে থাকতে পারে?মেঘের উপদ্রব ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাগ, ছাতা ফোন সবই গাড়িতে। হঠাৎ বৃষ্টি এলে ডাহা ভিজতে হবে। বেশ ঠাণ্ডা এমনিতেই লাগছিল।
ভাবতে ন ভাবতেই টিপটিপিয়ে বৃষ্টি। উর্ধবশ্বাসে দৌড়লাম তিনজন। বাঁক নিতেই সামনে একটা হোম স্টে বোধহয় ঈশ্বরেরই দান।
ফাঁকা একতলা ছবির মত বাড়ি।জনমানবশূন্য। সামনে একটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়ে আমরা সামনের বারন্দায় উঠতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। এতক্ষণ একটিও লোক চোখে পড়েনি, আমরা বারন্দায় বসতেই দেখা গেল জনা কয়েক সুন্দরী মেয়ে ভিজতে ভিজতেই এগিয়ে চলেছে ফলসের দিকে। যদিও জানি না আদৌ ফলস্ আছে কিনা বা থাকলেও কতদূর।
বসে আছি প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে। ফাজলামি ইয়ার্কি খুনসুটি সব শেষ। গান্ধীজির তিন বান্দরের মত বসে আছি তিনজনে। মাঝে শৌভিক ক্যামেরা নিয়ে খুটখাট করতে করতে সব ছবিও ডিলিট করে ফেলল, প্রাণ ভরে গালমন্দ করার পার্টও চুকিয়ে ফেললাম। ঘড়ির কাঁটা দেড় ঘন্টা ছাড়ালো। পাহাড়ের মাথায় মেঘ একটু কমে, আবার তোড়ে বৃষ্টি।
প্রায় দুঘন্টার মাথায় দেবু বলল, আর বসে লাভ নেই, চল এই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই এগোই।
এগোতে লাগলাম, এতক্ষণে সিক্ত বসনা সুন্দরীদের দল ফিরছে,আমরা জানতে চাইলাম সত্যি কি কিছু আছে?না দেখলে কি কোন ক্ষতি আছে। একদম স্বচ্ছ বসনা একটি মেয়ে, যার কোলে একটি বছর খানেকের বাচ্ছা, বলল  না গেলে বিশাল মিস করবেন। কোলের বাচ্ছাটি ঐ ঠাণ্ডা হাওয়া আর বৃষ্টিতে ভিজে পরিত্রাহী কাঁদছে। পাশে একটি বছর পাঁচ ছয়ের বাচ্ছা সেটিও ভিজে থরথর করে কাঁপছে, না মায়ের হেলদোল আছে না বাবার। সাথে একটি ঠাকুমা দিদিমা গোত্রীয় মহিলা ছিলেন, তিনিও দেখলাম বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না। বাচ্ছা গুলির কষ্ট দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। আমাদের বাচ্ছাগুলোকে আমরা নিরাপদে অন্বেষার তত্ত্বাবধানে রিসর্টে রেখে এসেছি আর এরা এতটুকু বাচ্ছাদের নিয়ে এই দুর্গম পথে এক অনামা জলপ্রপাত দেখে ফিরছে।
এবার রাস্তা বেশ চড়াই, বেশ সরুও বটে। জঙ্গল গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে। কেমন যেন হিংস্র এ জঙ্গল। রাস্তা বলে সেভাবে কিছু নেই পায়ে চলা এক ফুট রাস্তা, তাতেও কোথাও জমা জল আর গর্ত। এক বৃদ্ধ সাবধান করে গেলেন, খাদ ঘেঁসে যাওয়াই মঙ্গল, কারণ পাহাড়ের দিকের ঝুলন্ত গাছপালা গিজগিজ করছে জোঁকে। একসাথে তিনজন হাঁটা অসম্ভব। দেবু আর শৌভিক রুমাল দিয়ে ক্যামেরা ঢেকে যত দ্রুত পারল হাঁটতে লাগল। আমি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছিলাম। শৌভিক যদিও প্রতিটা বাঁকের মুখে আমার প্রতীক্ষা করছিল, আমার তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও। গাছপালা থেকে অঝোরে ঝরছে জল নাকি জোঁক কে জানে? ইচ্ছা করছিল ফলস্ চুলোয় যাক আগে ঘসঘস করে  গা চুলকাই। কিন্তু দেবু সমানে বলে চলেছে,“কেন চুলকাবি? কোন সুন্দরী মেয়েকে কোনদিন চুলকাতে দেখেছিস?” কি আজব যুক্তি মাইরি।
শেষ প্রতিবন্ধক ছিল পথ আটকে পড়ে থাকা একটা ভাঙা গাছের ডাল। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না গলে যাব না টপকে যাব। শৌভিক দেখলাম টপকালো। অগত্যা আমিও কোন মতে ডাল টপকে কয়েকশ ফুট যেতেই সামনে জেরি ফলস্। কি অপরূপ সুন্দর, সম্পূর্ণ ভার্জিন বিউটি। লোকজন আছে বটে আমাদের মতই গুটি কয়েক বদ্ধোন্মাদ পাবলিক। খড়খড়ে পাহাড়ের ওপর থেকে লাগাম ছিঁড়ে পড়ছে টলটলে জলরাশি।
অনির চিকমাগালুরের ডাইরি ৫ই অক্টোবর  ২০১৭ (পর্ব ৭)
এত কষ্ট করে পৌছালাম জেরি ফলসে, এখনও সর্বাঙ্গ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছে। ক্যামেরার গায়ে জড়ানো রুমালও সপসপে। কোন মতে গুটি কয়েক ছবি তোলা হল। লাল মাটি বলেই বোধহয় দিব্যি হাঁটাচলা করা যাচ্ছিল, বাংলার মাটি হলে আছাড় খাওয়া অনিবার্য ছিল।
এবার ফেরার পালা, আবার ঐ একই দুর্গম পথ ধরে ফেরা। মাঝ পথে ঐ নির্জন হোম স্টে তে আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম আমরা যদি বৃষ্টি থামে। দাঁড়িয়ে থাকা জিপ গাড়ির ড্রাইভারকে খুঁজতে এদিক ওদিক গেল শৌভিক আর দেবু, যা নেয় নিক অন্তত বড় রাস্তায় তুলে দিয়ে আসুক। চতুর্দিক ভোঁ ভাঁ।
আমাদের ড্রাইভারকেও ফোনে ধরার চেষ্টা করা হল,ডেভিডের ফোন পরিসীমা ক্ষেত্রের বাইরে। অগত্যা যতটা পারা যায় জল নিকড়ে ঐ ভেজা পোশাকেই হাঁটতে লাগলাম আমরা।
এবার চড়াই, পচপচে জল ভরা জুতো পড়ে হাঁটতে আমার জিভ বেরিয়ে যাচ্ছিল। শুধু গাড়িতে আমাদের প্রতীক্ষারত চিজ স্যান্ডউইচ আর শক্ত মিইয়ে যাওয়া ফ্রেঞ্চ ফ্রাই গুলি ছাড়া এ পথ ধরে হাঁটার আর কোন উদ্দীপনাই ছিল না।   একটা জিনিস দেখলাম, যত উঠছি, ততোই ধরে আসছে বৃষ্টি। পথে কয়েকটা অল্প বয়সী ছেলে প্রবল লম্ফঝম্প করে জামাকাপড় খুলছিল,আমাদের দেখে সামলে গেল, কি বলল বুঝলাম না,শুধু লিচটা শুনলাম। দেবু হাসি চেপে বলল,“ খাদের ধার দিয়ে চল, ওদের জোঁকে ধরেছে। ” তখনও কি জানি যে আমাদেরও ধরেছে!
ওঠার পথে আরো বহু লোককে পথ দেখিয়ে তথা উৎসাহ বর্ধন করে অবশেষে আমরা গাড়িতে উঠলাম। পরবর্তী  গন্তব্য মূল্যায়নগিরি। সেই যে সকালে জ্যাম জটে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরতে হয়েছিল-
ভিজে হাওয়ায় ভিজে জামাকাপড়ে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানি না। শৌভিক যখন তাড়া লাগালো, এবার নামতে হবে, চোখ খুলে দেখি, মেঘের মাঝে ঢুকে পড়েছি। দৃশ্যমানতা শূণ্য। অসীম ক্লান্তি ঘিরে ধরেছিল,আর নামতে ইচ্ছা করছিল না। খোলা জানলা দিয়ে স্যাঁতসেঁতে মেঘ ঢুকে আরো কাঁপিয়ে দিচ্ছে।ঘুমে মস্তিষ্ক অসাড়, কোনোমতে জানালাম, ওরা এগোক,আমি একচোট ঘুমিয়ে নি। শৌভিক আশ্বস্ত হয়ে বলল, “তাহলে ঘুমো। পরে আর আসার দরকার নেই। আমরা চটজলদি ঘুরে আসি। ”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওরা মেঘে হারিয়ে গেল, আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। মেঘের মধ্যে দিয়ে কিছুটা এগোতেই পথ দুভাগ হয়ে গেছে,ওরা একজন পুলিশকেই জিজ্ঞাসা করল,কোন পথ?সে জানালো দুটো পথই শিখরে পৌছয়। বাম দিকেরটা ধরে এগোলে তিন কিলোমিটার হাঁটতে হবে আর ডানদিকেরটায় দুই। ওরা ডান দিকেরটাই ধরল। পথ ভীষণ খাড়া,মেঘে ঢাকা।  দশ মিনিটের মধ্যেই একটা মেঘলা চূড়োয় গিয়ে উপনীত হল দুজনে। এবার?এইটাই কি? কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। বেশ ভিড়। অনেকে ঐ মেঘের সাথেই সেল্ফি নিচ্ছে। ওরা কয়েকজনকে প্রশ্নও করল, কেউই কিছু বলতে পারল না। অবশেষে একজন স্থানীয় প্রৌঢ় জানালো এটা নয়, যে রাস্তাটা উনি দেখালেন, সেটা সটান নেমে গেছে, কোথায় কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। ইতস্ততঃ করে ঐ পথেই নামতে থাকল দুজনে, পথ মানে ঢালু কাঁকরে রাস্তা। হড়কাতে  হড়কাতে মেঘ হাতড়াতে হাতড়াতে দুজনে অবশেষে এক পিচ ঢালা ভাঙা চোরা রাস্তায় গিয়ে উঠল। ঐ রাস্তা দিয়ে আরো অনেকে ওঠানামা করছে, ঐটাই হল সেই তিন কিলোমিটারের লম্বা রাস্তা, ওরা পাহাড়ের ওপর দিয়ে শর্টকাটে ঐ রাস্তাতেই মিশেছে।
মূল্যায়নগিরির চূড়ায় একটি মন্দির আছে। পিচের রাস্তা চূড়ার কাছে এসে শেষ হয়ে যায় এরপর ৩০০খানা সিঁড়ি ভাঙতে হয় মন্দিরে পৌঁছতে।
আমি ইতিমধ্যে দিব্যি ঘুম দিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। জানলার বাইরে পুরু মেঘের চাদর। এতক্ষণ বসে পা ধরে গিয়েছিল,ভিজে জুতো মোজায় পা অসাড় লাগছিল বলে জুতো খুলতে গিয়ে দেখি গলগলিয়ে রক্ত ঝরছে পা দিয়ে। বুঝতে অসুবিধা হল না জোঁকে ধরেছে। কালো ছোট সোয়েটের টিপের মত দেখতে জোঁকটি এত রক্ত খেয়েছে যে আর নড়তে পারছে না। পা দিয়ে ঘসে থেঁতলে দিলাম। প্রায় চারটে বাজছে, ভাবলাম নেমে একটু হাঁটাচলা করি, গাড়ির দরজা খুলতেই ডেভিড দৌড়ে এল,“ক্যায়া ম্যাডাম?ট্যায়লেট?” ইশারায় একটা মেঘে ঢাকা পথ দেখিয়ে দিল। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দেখি,বিশাল গ্রীলের দরজা দিয়ে ঘেরা শৌচাগার কিন্তু তালা দেওয়া। আর এক দম্পতিও দাঁড়িয়ে ছিল, বরটি হিন্দিতে বিরক্তি প্রকাশ করে ভাবছিল কোন খাদের ধরে দাঁড়াবে, বউটি প্রবল ধমক দিল,এইখানে খাদ খুঁজতে গেলে সোজা খাদে নেমে যেতে হবে। সবই তো মেঘে ঢাকা। আমরা তিনজনে তালাটা মুচড়েও দেখলাম, চেইন দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। চতুর্দিকে অজস্র মানুষ,কিন্তু সব মেঘে ঢাকা। অবশেষে একটি মেয়ে এল, হাতে মুড়ি তেলেভাজার মত গরম খাবার নিয়ে, আমাদের দেখে সে বুক পকেটে হাত ঢোকাতে আমরা আশ্বস্ত হলাম, যে ইনিই এই শৌচাগারের দ্বারী।
মেঘলা পথে বেশি ঘোরাঘুরির সাহস পেলাম না। ঘাড়ের কাছে না এসে পড়লে তো গাড়িও দেখতে পাব না। শৌভিককে অনেক কষ্টে ফোনে যখন পেলাম, ওরা সবে চূড়ায় পৌঁছেছে। জানালো আরো ঘন্টা খানেক লাগবে নামতে।
কার্যক্ষেত্রে  আধ ঘন্টার মধ্যেই ওরা নেমে এল যদিও। দেবু ঠিকই বলে পতন অনেক সহজ। আমাকে দেখেই দুজনে বত্রিশ পাটি বার করে জানালো ওদেরও জোঁকে ধরেছিল। মূল্যায়ণগিরির মন্দিরে পৌছে জুতো খুলতে গিয়ে দুজনেই দেখে ওদের প্যান্ট রক্তে ভেসে যাচ্ছে। শৌভিক টেনে নিজের জোঁক ছাড়িয়ে তাকে থেঁতলে মেরেছে, আর দেবু দৌড়েছে নুন খুঁজতে, কেন দৌড়বে না, ওকে যে তিন তিনটে জোঁকে ধরেছিল।
হোটেলে ফিরেও সেই রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না, আর পুটপুট হাউমাউ করে কাঁদছিল,“বাবাকে লিচু কামড়েছে। বাবা তুই বাঁচবি তো বাবা?”
অনির চিকমাগালুরের ডাইরি ৬ই অক্টোবর ২০১৭ (পর্ব ৮)
আজ চিকমাগালুরে আমাদের শেষ দিন। আজ সোমবার, রিসর্ট এক্কেবারে খালি। চেক আউট টাইম যদিও বেলা এগারোটা, ওরা জানিয়েই দিল আমাদের সুবিধামত ঘর খালি করলেই চলবে।  লাঞ্চ করে সাড়ে বারোটা নাগাদ বেরোব। গন্তব্য কুর্গ। তবে মাঝে বেলুরে কিছুক্ষণ দাঁড়াব। চেন্নাকেশভা মন্দির দেখা বাকি যে?
চেন্না মানে সুদর্শন বা হ্যান্ডসাম। কেশব মানে আবাল্য শ্রীকৃষ্ণকেই জানি, এখানে কেশব হলেন বিষ্ণু স্বয়ং। তাঁর এক পাশে ভূদেবী অর্থাৎ পার্থিব সম্পদের দেবী বা সীতা ও বলতে পারেন। অপর দিকে ধনসম্পদ তথা সৌভাগ্যের দেবী শ্রীদেবী।মা লক্ষ্মীরই দুই রূপ। হয়তো একজন স্থাবর আর একজন জঙ্গম স্বরূপ সমৃদ্ধি দেন।
মন্দির গাত্রে খোদিত কন্নড় ভাষায় লেখা তারিখ অনুসারে এই মন্দির নির্মানকার্য শুরু হয় ১১১৭খ্রীস্টাব্দে। হয়সল বংশীয় রাজা বিষ্ণুবর্ধন এই মন্দির নির্মান করেন। যদিও মন্দিরটি সম্পূর্ণ তৈরি হতে সময় লাগে ১০৩বছর। বার বার আক্রান্ত হয় এই মন্দির, বারবার গড়ে তোলা হয়। তবে সবই হয়তো চেন্নাকেশবের মায়া যে কেউ কখনও এই মন্দির ধুলিসাৎ করতে পারেনি।শেষ বার লুণ্ঠিত হবার পর বিজয়নগরের রাজারা শুধু পুনর্নিমান করেই ক্ষান্ত হননি, একটি বিশাল দুয়ারও বানিয়ে দেন। চেন্নাকেশভা মন্দিরে আপনি কন্নড়, তামিল এবং উত্তর ভারতীয় তিন ধরণের স্থাপত্যেরই নিদর্শন পাবেন।

মূল মন্দিরের বাম পাশে একটি ডামি মন্দির আছে। প্রাথমিক ভাবে ঐ মন্দিরটি তৈরি হয়, পরবর্তী  কালে পাশের বিশাল মন্দিরটি নির্মিত হয়। এই মন্দিরে নাকি ১৫০০০ ছোট বড় মূর্তি আছে। প্রতিটি স্তম্ভের গাত্রে অলংকৃত আছে অসংখ্য গহনার নক্সা। এই মন্দিরকে নাকি ইন্টার ন্যাশানাল জুয়েলারি বক্সও বলা হয়।
বেলুর বা ভেলুপুরা ছিল হয়সালা রাজাদের রাজধানী। এত পবিত্র এই নগরী যে একে বৈকুণ্ঠ্য বা দক্ষিণের বারাণসীও বলা হত।
চেন্নাকেশভার মন্দিরের ভিতরটা ঐ গনগনে গরমেও কনকনে ঠাণ্ডা। গাইড বললেন,“ন্যাচারাল এইসি ম্যাডাম”। প্রতিটি দেওয়ালে শুধু যে অসংখ্য ছিদ্র আছে তা নয় প্রতিটি মূর্তির মধ্যেও অসংখ্য ফাঁক। যা আপাত ভাবে চোখে পড়ে না, টর্চের আলো ফেললে তবে বোঝা যায়। দেবতার সামনে বিশাল পাথরের মণ্ডপ, যার চারকোণে চারজন নৃত্যরতা সুন্দরীর মূর্তি। প্রতি সন্ধ্যায় আগে দেবতার সামনে নৃত্যগীতাদি পরিবেশন করা হত। এমনকি রাণী শান্তলাদেবী স্বয়ং নাচতেন।
মন্দিরে বাঁদিকে বাস্তুশাস্ত্র মোতাবেক একটি পুষ্করিণী, ডানদিকে একটি কুয়া এবং রন্ধনশালা। একটি বিশাল দীপস্তম্ভ আছে, যার তিনটি দিক মাটিতে বসা একদিক হাফ ইঞ্চি উঁচু। কোন সিমেন্ট মর্টার ছাড়াই শুধু ব্যালেন্সে দাঁড়িয়ে আছে আজ হাজার বছর ধরে। মন্দিরের ভাস্কর্য দেখতে দেখতে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। কোথাও কোথাও পাথর ক্ষয়ে ব্রোঞ্জ এমনকি রূপা বেরিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ সেই রূপা খুঁটেও নিয়ে গেছে। যদিও খুবই নিম্নমানের রূপা।
বেরোবার পথে প্রসাদম বিক্রি হচ্ছিল,১০০টাকায় দুটি লাড্ডু। ব্যাগ গাড়িতে রেখে এসেছি, শৌভিকের কাছেই হাত পাততে হল। মুণ্ডপাত করতে করতে কিনে দিল বটে,মুখে দিয়ে সব ভুলে গেলাম। কি ভালো খেতে। ঝুরো বোঁদের বিশাল লাড্ডু। হাল্কা ঘি আর এলাচের গন্ধ।
এবার কুর্গ। বেলুর থেকে কুর্গ যাবার রাস্তাটি ছবির মত সুন্দর। ঘন্টা তিনেক লাগে। কুর্গ আসলে একটি জেলার নাম। যার সদর শহর মাডিকেরি।  মাডিকেরিতে  কোন হোটেলে থাকব না। দেবু নটিং হিল হোম স্টে বুক করেছে। জীবনে প্রথমবার হোম স্টেতে থাকব। তিনটি ঘর সমেত গোটা বাড়িটাই আমাদের। ওরাই রান্না করে দেবে, চাইলে নিজেরাও রাঁধতে পারি। দেবুকে মালিক বলেছে ওদিকে অসাধারণ পর্ক পাওয়া  যায়। আমরা বললেই রান্না করে দেবে। ছিঃ চেন্নাকেশবার মন্দির থেকে সদ্য বেরিয়েই পর্ক? এদের নরকেও জায়গা হবে না। ওরা দুজনেই সমস্বরে জানালো স্বর্গে যেতে কেউই ইচ্ছুক নয়, যাবতীয় ভোগ্যদ্রব্যই যেহেতু পাপ,তা কেবল নরকেই সুলভে পাওয়া যাবে, কাজেই----
অনির চিকমাগালুর-কুর্গের ডাইরি ৭ই অক্টোবর ২০১৭(পর্ব ৯)
কর্ণাটকের এক অদ্ভুত সুন্দর জেলা হল কদুগু। কদুগুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে স্কটল্যাণ্ডের এত মিল যে বৃটিশ প্ল্যান্টাররা সোহাগ করে একে বলত ভারতের স্কটল্যাণ্ড। কদুগুকেই আমরা সাহেবী উচ্চারণে কুর্গ বলে থাকি। ঘণ বর্ষায় কুর্গের রূপ নাকি ফেটে পড়ে। কুর্গের সদর শহর মাডিকেরি।
আমরা যখন মাডিকেরি পৌছলাম তখনও সূর্য পাটে বসেছে। মাডিকেরী ছোট এবং সমৃদ্ধ শহর।
আমাদের হোম স্টের নাম নটিং হিল। শুনেই চোখের সামনে জুলিয়া রবার্টস্ আর হিউ গ্রান্টের মুখ ভেসে ওঠে।জিপিএস অনুসারে আমরা যে জনমানবশূন্য রাস্তায় পৌছলাম, তার একপাশে গভীর খাদ,  অন্যদিকে উঁচু উঁচু টিলার ওপর সারি সারি ছবির মত সুন্দর একতলা বাংলো। নটিং হিল এদের মধ্যে কোনটি বোঝা দুষ্কর। যাই হোক এক প্রস্থ ভুল বাংলোয় কড়া নেড়ে কুত্তার তাড়া খেয়ে যখন আমরা নটিং হিলে ঢুকলাম, মুখ দিয়ে একটাই শব্দ বের হল আঃ।
ছবির মত সুন্দর একতলা বাড়ি। মাঝারি সাইজের সাজানো বাগানের ভিতর দিয়ে হেঁটে বেশ কয়েকধাপ সিঁড়ি টপকে লম্বা খোলা বারন্দা। বারন্দায় দু সেট সোফা আর কফি টেবল পাতা। বারন্দার এককোণে একটি সিঙ্গল খাটও রাখা আছে। লাল ঠাণ্ডা মেঝে। সন্ধ্যা নেমেছে মাডিকেরীর বুকে, বারন্দা থেকে নীচে আলোকসজ্জিত মাডিকেরীকে দেখে মনে হল যেন সলমা চুমকির কাজ করা ঘণ কালো সিল্কের শাড়ি। বারন্দায় কেন যে একটি মিটমিটে আলো জ্বলছে এতক্ষণে বুঝলাম, যাতে এই অসাধারণ সৌন্দর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করা যায়।
বারন্দার সংলগ্ন দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলে প্রথমেই বাঁদিকে একটি শোবার ঘর আর ডানদিকে খাবার ঘর। সুদৃশ্য ৬টি চেয়ার আর টেবল দৃশ্যমান। টেবলে কুরুশের কাজের গোল ডাকনি দিয়ে চাপা দেওয়া পোর্সিলিনের নক্সা করা জগে জল রাখা। আর একটু এগোলে বাঁদিকে আর একটি শোবার ঘর, এটিতে অ্যাটাচড্ টয়লেট নেই অবশ্য। আর ডানদিকে চোখ ধাঁধানো ড্রয়িং স্পেস। ড্রয়িং স্পেসের মধ্যমণি একটি বিশাল টিভি। অন্তত ৬০ইঞ্ছি তো হবেই। এছাড়া গরম গদি আঁটা সোফা, ডিভান, টিপয়, গুচ্ছ গুচ্ছ বই, বাচ্ছাদের খেলনা সুন্দর করে সাজানো। হোম স্টেতেও হোটেলের কমফর্ট। আর একটু এগোলে বামদিকে আর একটি শয়নকক্ষ আর ডানদিকে কিচেন। কিচেনে একজন মহিলা রান্না করছিলেন, উনি রান্না করে দিয়ে চলে যান। ব্রেকফাস্ট আর ডিনার এরাই দেয়। লাঞ্চ আপনাকে কিনে খেতে হবে, কারণ যে অল্প বয়সী ছেলেটি দেখাশোনা করে সে এগারোটা নাগাদ কলেজে যায়। সান্ধ্যকালীন স্ন্যাক্স পেতে হলে আগে থেকে বলে রাখতে হয়। বলা হয়নি বলে আমাদের শুধু কফিই জুটল। বিশাল মগ ভর্তি ধুমায়িত ঘণ দুধের কফি।
সাড়ে নটা নাগাদ যখন আমরা ডিনারে বসলাম, চারপাশ নিঃশব্দ শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া কোন শব্দই শোনা যায় না। ডিনারে গরম গরম হরেক সাইজের ক্যাসারোল ভর্তি -ভাত, সিদ্ধ রাইস নুডলস্ টাইপ একটা বস্তু, ডাল(সাম্বারের গন্ধ ওলা হলেও খেতে বেশ ভাল), সব্জী(লাউ বা স্কোয়াশ টাইপ সব্জি জিরে জিরে করে কেটে, প্রচুর নারকেল কোরা দিয়ে বানানো), চিকেনের ঝোল, রুটি(মাথা পিছু একটি করে), কদুগু চিকেন(কষা মাংস,টক টক খেতে) আর সিমুইয়ের পায়েস। এত আয়োজন যাদের জন্য তারা ঘাবড়ে গিয়ে তেমন খেতেই পারল না।
পরদিন ভোরে যখন ঘুম ভাঙল, বারন্দায় গিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ঘুমন্ত মাডিকেরি শহরের বুকে মোলায়েম সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। নটিংহিলের রেশমী সবুজ লনে এবং তৎসংলগ্ন গাছগুলিতে সদ্য জল দেওয়া হয়েছে, মিষ্টি সোঁদা গন্ধ আর কিচেন থেকে আসা দক্ষিণী কফির সুগন্ধ মিলে মিশে একাকার। খোলা বারন্দার কিনারা বরাবর, সিঁড়িতে হরেক রকম ফুলের গাছ রংবেরঙের  ফুুলের ডালি নিয়ে আড়ামোড়া ভাঙছে। অন্বেষার স্নান ব্রেকফাস্ট প্রসাধন সব ইতিমধ্যে সারা। আমায় হাত ধরে নিয়ে গিয়ে অনেকগুলি গাছ আর ফুল চেনালো। প্রতিবারই চেনায় এবং অমনোযোগী ছাত্রীর মত প্রতিবারই ভুলে যাই। সবেদা গাছে ঝুলন্ত সবেদা দেখে মোহিত হয়ে গেলাম।
ব্রেকফাস্টে ছিল আটার লুচি, সব্জী, রাইস বল। রাইস বল গুলি পাতি ইডলির বাচ্ছা। একই রকম বিস্বাদ। সব্জী আর আচার দিয়ে খেতে হয়। তুত্তুরী চটকে মটকে এক কাণ্ড বানিয়েছিল বলে প্রবল বকলাম,কিন্তু সত্যি ঐ রাইসবল গুলিকে চটকে তরকারি আচার মেখে খাওয়াই ভালো।
প্রাতরাশ সেরে সোয়া নটা নাগাদ বাড়িতে তালা দিয়ে আমরা বেরোলাম। চাবি বারন্দায় রাখা একটি বেতের সোফার তলায় রাখতে বলা হয়েছিল। প্রথম গন্তব্য ওঙ্কারেশ্বরের মন্দির মাডিকেরি শহরের নামি শিব মন্দির ড্রাইভারই বলল, দেখে আসুন। এমন কিছুই দ্রষ্টব্য নয়। সামনে একটি ঘেরা পুষ্করিণী ছিল, যাতে অনেক মাছ আর কচ্ছপ বিলবিল করছে। মুড়ি জাতীয় খাবার দিলে মারামারি করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে চায়। বাচ্ছা গুলো প্রভূত খুশি হল।
এবার তালা কাবেরি। কাবেরী নদীর উৎস স্থল। এত বড় নদী,দক্ষিণের গঙ্গা, যাকে নিয়ে কর্ণাটক তামিলনাড়ুর শুম্ভ নিশুম্ভের যুদ্ধ হয়ে চলেছে, তার উৎস নির্ঘাত খুব দুর্গম হবে। কিন্তু গাড়ি তো মোটামুটি সমতলেই চলেছে। পথে মাঝে মাঝে ছোট খাট জনপদ পড়ছে আর গুচ্ছ গুচ্ছ হোমমেড ওয়াইনের দোকান। উটিতে যেমন ঘরে ঘরে চকলেট তৈরি হয়,এখানে কি ওয়াইন তৈরি হয় নাকি কে জানে? কাঁচের বোতলে রঙবেরঙরে তরল সাজানো আছে। শৌভিক জিজ্ঞাসা করল, কাছেপিঠে কোন আঙুরের খামার টামার আছে কি না। কি যে জবাব দিল ড্রাইভার কিছুই বুঝতে পারলাম না। সম্ভবত স্থানীয় কোন ফল থেকে হয়।
গাড়ি যখন ঘ্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে গেল, চমকে উঠলাম এই কি তালা কাবেরি? কোন পাহাড় টিলা কিছুই তো নেই।  ড্রাইভার বলল, অত্যন্ত পবিত্র তীর্থ স্থল এটা। ত্রিবেণী সঙ্গম। জুতো খুলে খালি পায়ে এগোলাম। কুচকুচে কালো কাবেরী নদী খলবলিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জুতো পরে নদীর জলে নামা, থুতু ফেলা, প্রস্রাব করা বা সাবান মেপে চান করা নিষিদ্ধ। জায়গাটির নাম ভাগমণ্ডলা। কাবেরীর দুই উপনদী কানিকে এবং সুজ্যোতি নাকি মিলিত হয়েছে কাবেরীর সাথে। কিছুই বোঝা গেল না। নদীর পাড়ে শিবলিঙ্গ। জলে নেমে সকলে দুই হাতে কাবেরীর জল তুলে শিবের মাথায় ঢালছে। তুত্তুরী আর আমিও নামলাম। নেমেই আঁতকে উঠলাম কি ঠাণ্ডা জল বাপরে।
এবার তালা কাবেরী যেতেই হবে। এখান থেকে আট দশ কিমি যেতেও বেশীক্ষণ লাগে না। গাড়ি যত গড়াতে লাগল বুঝলাম পাহাড়ে চড়ছি। তাপমাত্রা কমতে লাগল ক্রমশঃ এবং মেঘেদের আনাগোনা শুরু হল।
অনির চিকমাগালুর-কুর্গের ডাইরি, ৮ই অক্টোবর পর্ব-১০
ভাগমণ্ডলা বা ত্রিবেণী সঙ্গম থেকে যদিও ড্রাইভার বলেছিল তালাকাবেরী মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার, দশ মিনিট লাগে পৌছতে, কিন্তু বাস্তবে একটু বেশীই লাগে। ফাঁকা ফাঁকা মেঘে ঢাকা পাহাড়ী পথে হুহু করে দৌড়চ্ছে গাড়ি, দক্ষিণ ভারতের গঙ্গার উৎসস্থল দেখতে যাচ্ছি আমরা। ইতিপূর্বে গঙ্গোত্রী আর গুরদংমার গেছি,যে কোন নদীর উৎস স্থল সাধারণত চূড়ান্ত দুর্গম হয় বলেই আমার ধারণা ছিল,কিন্তু গাড়ি ঘ্যাঁচ করে যেখানে দাঁড়িয়ে গেল, সামনে গাঢ় মেঘের পর্দার আড়ালে একটা অস্পষ্ট মন্দির ছাড়া আর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। দেবু বিরক্ত হয়ে বলল, “এই মন্দিরটাই তালাকাবেরী? ধুর ধুর। তাই বলছি নদীর উৎসে যাচ্ছি অথচ গোটা পথে কোথাও জলের শব্দ পেলাম না। ” সকলেই মোটামুটি দৃশ্যত বেশ হতাশ। দক্ষিণ ভারতীয়রা সর্বত্রই একটা করে মন্দির বানিয়ে রাখে আর জুতো খুলে সেখানে প্রবেশ করতে হয়। খালি পায়ে মেঘ মেখে বিশাল চওড়া চওড়া সিঁড়ি ভেঙে উঠে আরো হতাশ হলাম। একটা খোলা চত্বর, বসার বেঞ্চ করা আছে, তার ওপর আরো খান কতক সিঁড়ি ভেঙে উঠে এবং নেমে নীচে একটি কুণ্ড আছে। বিশাল চৌকো শান বাঁধানো চৌবাচ্চার মত। ঐটিই তালাকাবেরী। তালাকাবেরীর কাছে যাবার থেকে শৌচাগারে যাবার প্রয়োজন বেশী ছিল সকলের, সেই মুহূর্তে।বিশাল চাতালের একপাশে সিঁড়ি নেমে গেছে, নীচে শৌচাগার। মনে রাখবেন সকলের কিন্তু খালি পা। খালি পায়ে গণশৌচাগারে যেতে হবে তা বাপের জন্মে ভাবিনি। তুত্তুরী এবং পুটপুট প্রবল ক্যাঁওম্যাও জুড়ে দিল। বাবা বাছা করে মেয়েদের নিয়ে নীচে নামলাম। পাঁচ টাকা করে মাথা পিছু দক্ষিণা দিয়ে ছেলেরা একটিতে ঢুকল আর আমরা চারজন মহিলা একটিতে প্রবিষ্ট হলাম। পা ফেলছি আর ভাবছি ছিঃ ছিঃ ছিঃ। বাড়ি গিয়ে ডেটল, সুথল, কার্বলিক অ্যাসিড সব দিয়ে পা ধোব। হে মা কাবেরী, এ যাত্রা রক্ষা কর মা।
কাজকর্ম মিটিয়ে বাইরে এসে শৌভিককে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন?সাধারণত ছেলেদের শৌচাগারগুলি অকহতব্য রকমের নোংরা হয়। শৌভিক প্রবল হাসি চেপে জানাল মোটামুটি পরিষ্কার তবে দেবু ঢুকেই দেড় পায় লাফাচ্ছিল আর বলছিল, “মাটিটা ভিজে কেন?কিসের জল পড়েছে?”

তালাকাবেরীর কুণ্ডটিতে শুধু আমি আর তু্তুরীই নামলাম। কুণ্ডটিতে অনেকে পয়সা ফেলছে। আমরাও ফেললাম। জল ঠাণ্ডা কনকনে এবং কালো। একদিকে মা কাবেরীর মূর্তি,আর মূর্তির সামনে উপাসনারত কয়েকজন পুরোহিত। অনেকে পুজো দিচ্ছে। তুত্তুরী আর আমি ভাল করে প্রণাম করলাম, এখানকার পুরোহিতরা চরণামৃত দেবে বলে সবসময় তৈরি।
এই কুণ্ড আসলে একটি প্রস্রবণ। জল কুণ্ড উপচে একটি মনুষ্য নির্মিত পাথরের গোমুখ দিয়ে বাইরে বের হয়, এরপর কোন নালা দিয়ে যায় জানি না বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে নদী রূপে বহির্প্রকাশ ঘটে। কুণ্ডের ওপরে আরো কয়েকটি মন্দির আছে, যার একটি গণেশের এবং একটি অগস্ত্য মুনির মন্দির। কোনটিই আহামরি কিছু নয়।
অতঃপর লাঞ্চ। পথে কোথাও খাবার দোকান নেই ফলে মাডিকেরীতেই ফিরতে হল। আমাদের হোম স্টে তে তো তালা দেওয়া,ফলে ড্রাইভার একটি রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড় করালো। লাঞ্চে বিরিয়ানি। এখানকার বিরিয়ানি মোটেই কলকাতার মত নয়। না আছে সুগন্ধ, না আলু না ডিম।তেমনি ঝাল।  তুত্তুরী,পুটপুট ছাড়ুন আমার চোখ দিয়েই দরদর করে জল পড়ছিল।  বিরিয়ানির সাথে রায়তা আর গ্রেভি ফ্রি। গ্রেভি মানে পাতি মাংসের ঝোল। দেবু চিকেন আর রুটি নিয়েছিল, ঐ একই একবাটি ঝোলে কয়েক টুকরো মাংস। আমার বাবার ভাষায় গামছা পড়ে নামতে হবে মাংস খুঁজতে। সবথেকে বড় কথা, এখানে কোন রেস্তোরাঁতে কোন ডেসার্ট পাওয়া যায় না। এখানে খাবার পর মিষ্টি মুখ করতে হলে কোকোকোলা বা থামস্ আপ। সেগুলিও যে কি ভয়ানক মিষ্টি কি বলব। কোক তো দিব্যি কলকাতার পান্তুয়ার রসের সাথে মিষ্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারে। থামস আপ শুদ্ধু। এমন কি শৌভিকের বক্তব্য এখানকার ভ্যাট ৬৯ বা ওল্ড মঙ্কও নাকি কলকাতার তুলনায় কিটকিটে মিষ্টি। যেহেতু ও রসে বঞ্চিত তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।
লাঞ্চের পর গেলাম মাডিকেরি ফোর্ট দেখতে। সপ্তদশ শতকে কোন এক স্থানীয় ভূস্বামী বানিয়েছিলেন বটে, তবে ১৭৯০এ মাইশোর টাইগার টিপু সুলতান♥ এটার পুনর্নিমাণ করেন। আমি বরাবরই টিপুর বিশাল বড় অনুরাগী। গত বছর দক্ষিণ ভারত ভ্রমণের সময় শ্রীরঙ্গাপত্তনম ঘুরে এসে এই অনুরাগ আরো বেড়েছে বই কমেনি। পারলে একবার অবশ্যই ঘুরে আসবেন। মাত্র ৫ফুট ২/৩ইঞ্চি দৈর্ঘের এক পুরুষের অসীম সাহস এবং বীর্যবত্তায় মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না।আমাদের গাইডের বলা কথা গুলো আজো কানে বাজে,“ওহ শের থে সাব। শের। সহি মে মাইশোর টাইগার থে ওহ। ”
যাই হোক বর্তমানে এই দুর্গ কুর্গের জেলাধীশের দপ্তর। দ্রষ্টব্য তেমন কিছুই পেলাম না, শুধু অন্বেষা কতৃক আবিষ্কৃত একটি গিরগিটি ছাড়া। ঘাসের মাঝে লুকানো ঘণ সবুজ গিরগিটি দেখে আমাদের দুই কন্যার ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। তুত্তুরী কিছুতেই ওর রঙ বদল না দেখে নড়বে না, শেষে দেবু বলল,“ ওরে ওটা গিরগিটি, মানুষ নয়, যে এখুনি রঙ বদলাবে। ”
টিপুর পতনের সাথে সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এই দুর্গটি দখল করে। ১৮৫৯খ্রীষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের উদ্যোগে এই দুর্গের প্রাঙ্গনে গড়ে ওঠে সেন্ট মার্কস্ চার্চ। ভারত স্বাধীন হবার পর এই চার্চটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৭১ সালে কর্ণাটক সরকার এই চার্চটি অধিগ্রহণ করে এবং ঐ স্থলে মাডিকেরি মিউজিয়াম গড়ে ওঠে। বাইরে থেকে এক্কেবারে সাধারণ কিন্তু ভিতরে ঢুকলে আপনিও মানবেন,  মাডিকেরির সব থেকে আকর্ষণীয় বস্তু এই মিউজিয়াম। ছোট্ট মিউজিয়াম ভর্তি নবম শতক থেকে উনবিংশ শতক পর্যন্ত বিভিন্ন মূর্তিতে। কোনটি কুবেরের মূর্তি তো কোনটি গণেশের,কোনটি মহাবীরের তো কোনটি বরাহীর। কি অনুপম ভাষ্কর্য সে সব মূর্তির। একাধিক জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি পাশাপাশি সাজানো। বর্ধমানের সিক্স প্যাকের পাশাপাশি নেমিনাথের নেওয়া পাতি ভুঁড়ি আপনাকে মোহিত করবেই। এছাড়াও বেশ কিছু একনলা, দোনলা বন্দুক, তরোয়াল পাবেন বিভিন্ন  সময়ের। বৃটিশ আমলের টাইপ রাইটার ইত্যাদি দ্রব্যও পাবেন।
মিউজিয়ামে প্রথম আমরা একদল বাঙালি দর্শক পেলাম। অবশ্য পার্শ্ববর্তী  দেশের নাগরিকও হতে পারে। সবজান্তা একপাল লোক,মিউজিয়ামের নিজস্ব গাম্ভীর্যকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন পূর্বক সোচ্চারে সব মূর্তি, অস্ত্রাদি সম্পর্কে নিজেদের এক্সপার্ট ওপিনিয়ন দিচ্ছিল।
এরপর অ্যাবি ফলস্। গাড়ি থেকে নেমে শখানেক সিঁড়ি ভেঙে অ্যাবি ফলস্ মন্দ নয়। তবে জেরি ফলসের দেখার পর অ্যাবি নেহাতই অপাপবিদ্ধ  শিশু বলে মনে হবে। নাতি উচ্চ পাহাড় থেক ঝরঝরে জলরাশি দুভাগে বিভক্ত হয়ে প্রবল গর্জন করে নীচে পড়ছে। প্রবল জলোচ্ছাস জনিত জলীয় বাষ্প উড়ে আসছে দর্শকদের দিকে। জলপ্রপাতের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি একটি ব্রীজ গিয়ে মিশেছে ওপাশের পুঁইশাক রঙা ঘণ সবুজ গভীর অরণ্যে। কিন্তু ব্রীজটি আপাতত বন্ধ, হয়তো আমাদের মত অ্যাডভেঞ্চারেচ্ছু উটকো দর্শকদের আসু বিপদের হাত থেকে বাঁচাতেই।
সন্ধ্যা নামছে, এবার হোম স্টে তে ফেরার পালা।
বাড়ি ফিরে ধুমায়িত দক্ষিণ ভারতীয় কফিতে চুমুক দিতে দিতে প্রগাড় অন্ধকারে দূরের আলোকজ্জ্বল মাডিকেরী শহরের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। আর মাত্র একটি দিন কাটাব নটিং হিলে তারপর ব্যাঙ্গালোর আর তারপরের দিন--- সেই আবার থোড় বড়ি খাড়া।

অনির চিকমাগালুর-কুর্গের ডাইরি পর্ব- ১১
৯ই অক্টোবর  ২০১৭
আজকের গন্তব্য দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প।কুর্গ জেলার কুশলনগরে কাবেরী নদীর ধারে বনবিভাগের হাতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চাইলে আপনি হাতিদের খেতে দিতে বা স্নান করাতেও পারেন। হাতিতে চড়াও আগে যেত বর্তমানে যদিও তা বন্ধ আছে। দুবারে ক্যাম্প থেকে কাবেরী বরাবর আপনি রিভার রাফটিংও করতে পারেন। মাথা পিছু ৬০০টাকা লাগে। আগের দিনই ড্রাইভার বলে দিয়েছিল, যদি রাফটিং করতে হয় তাহলে এক সেট শুকনো জামাকাপড় যেন অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যাই। শৌভিক,আমি এবং দেবু অতি উৎসাহী ছিলাম। কিন্তু দুটো বাচ্ছা সমেত অন্বেষাকে ফেলে রাফটিংএ যেতে শেষ পর্যন্ত আর কেউই রাজি হলাম না।
যাই হোক দুবারেতে বেলা এগারোটার পর আর ঢুকতে দেয় না।আমরা তাই তড়িঘড়ি সাড়ে নটায় বেরিয়ে পড়লাম। দুবারে দেখার জন্য বাচ্ছাগুলোর ধৈর্য আর ধরে না। প্রায় পৌনে একঘন্টা বাদে কাবেরীর ধারে গাড়ি থেমে গেল। ওপাড়ে দুবারে। কাবেরী পেরোতে সরকারী বোটই ভরসা। সাধারণ মোটর বোটে গাদাগাদি  লোক তুলে খরস্রোতা কাবেরী পেরিয়ে ওপাড়ে নামিয়ে দিল। টিকিট কেটে ঢুকে দেখি একটা নাতি দীর্ঘ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মাঠের মধ্যে বেশ অনেক গুলি দাঁতাল, একটি মাদী হাতি এবং একটি শিশু হাতি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ঘিরে পাঁচিলের এপাশে অনেক মানুষের ভিড়। একপাশে গ্যালারি করা আছে,গ্যালারিতে বসেও হাতি দেখতে পারেন। পাশেই খোলা বিশাল মাঠে আরো কয়েকটি হাতি দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম অনেকগুলি হাতিকে নাকি মহিশূর নিয়ে যাওয়া হয়েছে, দশেরা উৎসবের শৌর্য তথা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। আগে নাকি এখানে শুধু মহিশূর রাজের ব্যক্তিগত হাতিদেরই প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। দুবারের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল চন্দনদস্যু বীরাপ্পনের জমানায়। বীরাপ্পনের সন্ধানে জঙ্গলে তত্ত্বতলাশে চালাতে এই পোষা হাতিগুলিই ছিল সরকারের ভরসা।
যাইহোক। হাতির গায়ে হাত বোলানোর অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ভালো করে শুঁড়ে হাত বুলিয়ে দিলাম।  কি খসখসে চামড়া বাপরে বাপ। খুব কোমল হাত হলে, ছড়ে ও যেতে পারে। দাঁতালটা আবার শুঁড় তুলে নমস্কার  করছিল। তুত্তুরী আর পুটপুট হাতিকে খাওয়ালো। ২০টাকার বিনিময়ে ওরাই এক আঁটি খড় আর ধান দিয়ে পাকিয়ে একটা গোল্লা  দেয়, প্রশিক্ষিত হাতির সামনে ধরলে তৎক্ষণাৎ শুঁড়ে  নিয়ে হয় মুখে পুরছে, আর যদি মুখ ভর্তি থাকে তো পায়ের কাছে রাখছে, কাউকে নিরাশ করছে না। হাতি যখন শুঁড় বাড়িয়ে খড়ের গোল্লাটা হাত থেকে নিল, বাচ্ছাগুলো কি আমারই ভয়ে বুক কেঁপে উঠল। একটা দাঁতাল আবার শুঁড় তুলে হাঁ  দাঁড়িয়ে আছে, খড়ের গোলা তার মুখে ঢুকিয়ে দিতে হবে। শুনেছিলাম হাতির চোখ ছোট ছোট হয়, খুব কাছ থেকে বাস্তবে দেখলাম ততোটাও ছোট নয়, হ্যাঁ হাতির বিশালাকৃতির তুলনায় ক্ষুদ্র তো বটেই, আঁখি পল্লব বেশ বড়বড় হয়। চোখের চারপাশে বা মুখমণ্ডলে যে কয়টি রোম আছে, বেশ ফাঁক ফাঁক এবং সূঁচের মত খাড়া খাড়া। প্রতিটি হাতির কানে ফুটো, ঐ দিয়েই অঙ্কুশ গলিয়ে ওদের চালনা করা হয়।
দুবারে থেকে নৌকায়  যখন ফিরছি, দেখি একটি হাতি সটান পাশ বালিশ জড়িয়ে শোওয়ার মত  কাবেরীর বুকে শুয়ে পড়ল এবং মাহুতের নির্দেশানুসারে ভ্রমনার্থীরা ঘষে ঘষে হাতিকে স্নান করাতে লাগল।
রিভার রাফটিং করা গেল না বলে মনটা খারাপ ছিল, ড্রাইভার বলল,“ স্যার স্টীল ওয়াটার রাফটিং করবেন?” সে আবার কি? যা বুঝলাম ঐ ফোলানো নৌকায়  শান্ত কাবেরীর বুকে খানিক ঘোরা, সোজা কথা বোটিং কিন্ত রাফটে চড়ে। খরচ ঠিক অর্ধেক ৩০০টাকা মাথা পিছু। পুটপুটকেও নিয়ে চড়া যাবে, কোন সমস্যা নেই, শুকনো জামাকাপড়ও লাগবে না। নির্দেশমত আমরা জুতো, ব্যাগ সব গাড়িতে রেখে লাইফ জ্যাকেট পরে ফোলানো রাফটে উঠলাম। একটি রাফটে দশজন ট্যুরিস্ট আর একজন গাইড চড়বে। গাইড একদম পিছনে বসে হাল টানে আর তার নির্দেশ মোতাবেক ছয়জন সওয়ার দাঁড় টানবে। বাঁ পাশে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক, তার কনিষ্ঠা কন্যা আর আমি দাঁড় ধরলাম । ডান পাশে ধরল বৃদ্ধর জ্যেষ্ঠা কন্যা, শৌভিক আর দেবু। অন্বেষা দুই বাচ্ছা নিয়ে মাঝে বসল। গাইড কর্ণাটকী টানে হিন্দি ইংরাজি খিচুড়ি ভাষায় বুঝিয়ে দিল কি ভাবে দাঁড় টানতে হয়। প্রথম চোটে সবাই ভুলভাল টানতে লাগলাম, নৌকা অতিকষ্টে গোল গোল ঘুরল কিছুক্ষণ,অগ্রবর্তীনীর সাথে আমার বেশ কয়েকবার দাঁড়ে দাঁড়ে খটাখটি লাগল। দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়ে দুঃখপ্রকাশ করলাম।  ধীরে ধীরে ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল। তবে অচীরেই হাত ব্যথা করতে লাগল। দেবু বুঝিয়ে দিল, দাঁড় দিয়ে জলটা অল্প ঠেলেই তুলে নিতে হয়, বেশী ঠেললে হাতে এবং কাঁধে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। চালাও পানসি করতে করতে ছায়াময় পাথুরে কিন্তু শান্ত কাবেরীর বুকে খানিক ভাসলাম। একজায়গায় গাইড দাঁড়িয়ে যেতে বলল, ছোট্ট চড়া মত, গাইড ইশারায় বলল ছবি টবি তোলার থাকলে তুলে নিন। জলে নামতে চাইলে নামতে পারেন। আমার অগ্রবর্তীনী ঝপাৎ  জলে নামতেই জানুসন্ধি অবধি জলের তলায়। তাতে বিশেষ হেলদোল আছে বলে মনে হল না। বৃদ্ধ পিতাও নামলেন। বেশ কিছুক্ষণ জলকেলি,  নিজস্বী তোলার পর এবার ফেরার পালা। আবার দাঁড় বাওয়া। মন খারাপ হয়ে গেল। এত অল্প সময়ে মনই ভরল না। গাইড জানালো রাফটিং এর সেরা সময় জুন থেকে অগস্ট। যাবার পথে এক জায়গায় নদী দুভাগে বিভক্ত  হয়ে গিয়েছিল, আমরা ডানদিকে বেঁকে ছিলাম, বাম দিকটা আসল রিভার রাফটিং এর পথ। নদী ওদিকে বেশ উচ্ছল। আমাদের সামনেই একটি রাফট উল্টে গেল। আরোহীরা প্রবল চিল্লাচিল্লি জুড়ে দিল, কিন্তু কেউ ভেসে গেল না দেখে আশ্বস্ত  হলাম। ধরে  রাফটিকে সোজা করে একজন দুজন উঠতে না উঠতেই আবার গেল উল্টে-।
রাফটিং সেরে সকলেই বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম। লাঞ্চ সেরে আজ আর বিশেষ কোথাও যাবার নেই। কাছেই নিসর্গধাম ডিয়ারপার্ক, ড্রাইভার আমাদের “খুব ভালো স্যার, যান না দেখুন না” বলতে বলতে ওখানেই নিয়ে গেল। আমাদের বাঁকুড়ার বনপুকুরিয়া ডিয়ারপার্ক দেখার পর পৃথিবীর কোথাওই আর ডিয়ার পার্ক দেখতে আমি ইচ্ছুক নই। তারওপর বেশ রোদ আর গরম। তবু গেলাম। কাবেরীর ওপর ঝুলন্ত ব্রীজ পেরিয়ে ওপাশে নলবন  টাইপ একটা পার্ক। বাঁশ ঝাড়ে ভর্তি। অনেক খুঁজে পেতে অবশেষে জাল দিয়ে ঘেরা গুটি কয়েক হরিণ পাওয়া গেল। বাচ্ছা গুলো খুব খুশি হল।
এবার হোম স্টেতে প্রত্যাবর্তন। পথে পুটপুট বলল,“বাবা আমি কেনাকাটা করব। তুই পয়সা দিবি, হ্যাঁ বাবা?” আমরা সাধারণত কোথাও বেড়াতে গিয়ে কিছুই কিনি না। মালপত্রের ওজন বৃদ্ধিতে শৌভিকের তীব্র আপত্তি। তবে পুটপুটের মিষ্টি আব্দারের পর আর কোন ওজর আপত্তি চলে কি? ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল মাডিকেরিতে কর্ণাটকা সিল্ক আর্ট এন্ড ক্রাফ্টস্ এম্পোরিয়ামে। বিশাল দোকান, আমরা ছাড়া কোন খরিদ্দার নেই। একদিকে সুদৃশ্য শাড়ির সম্ভার। নানা রকম নজর কাড়া সিল্কে ঠাসা। ওরা বারবার ডাকাডাকি করছিল,শৌভিক রীতিমত হুমকি দিয়ে সরিয়ে নিয়ে গেল। অন্য দিকে নানা সুদৃশ্য শো পিস্,গয়না, তেল, সাবান, সেন্টের ভান্ডার। চন্দনকাঠের যেকোনো  শো পিসে হাত দিলেই হাত পুড়ে যাবে,এমন দাম। ছোট চাবির রিঙের দাম ১০০টাকা। একটি রোজ উডের বিশাল অপরূপ দোলনা রাখা ছিল, আমাদের দুই কন্যা অযাচিত ভাবেই তাতে চড়ে দুলছিল, নামিয়ে আনতে গিয়ে আড় চোখে তাকিয়ে দেখি দাম বেশী না পৌনে ছয় লাখ মোটে। মেয়েদের নামিয়ে নিজেই একবার চড়ে নিলাম,শৌভিকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। আহাঃ পৌনে ছ লাখের দোলনা বাবা।

চন্দন মধু দিয়ে তৈরি বৃন্দাবন সাবান নিলাম এক বাক্স মা এবং শাশুড়ীমার জন্য, তিনটি সাবান ৪০০টাকা। সেন্টের নাম হাজার দেড়েকের কমে নেই। কাঁচের বোতলের ভিতর চন্দনকাঠের চোকলা ফেলা আছে। ওরা বলে যত ভিজবে তত সুগন্ধে আমোদিত হবে। দেবু বলল,“গায়ে চন্দনের গন্ধ কি ভালো লাগবে?” ঐ ওজর দেখিয়েই রেখে এলাম, তবে যে টেস্ট স্যাম্পলটুকু হাতে মাখিয়েছিল পরদিন সন্ধ্যা অবধি ভুরভুর করে  গন্ধ পাচ্ছিলাম। একটা চন্দন ফেস প্যাক গছালো লোকটা, হাতে মাখিয়ে বলল পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে, পাঁচ মিনিট বাদে যখন ভিজে স্পঞ্জ দিয়ে মুছিয়ে দিল, দৃশ্যত মনে হচ্ছিল ডান হাতের তুলনায় বাঁ হাতটা এক পোঁচ ফর্সা হয়ে গেছে। দাম ৬০০টাকা। বাড়ি ফিরে ভুলেই গিয়েছিলাম, যেদিন রাতে লাগালাম, প্রথমে মনে হচ্ছিল চন্দন তেলের মাখন লাগাচ্ছি, এত মোলায়েম,মখমলী স্পর্শ। আর মুখ ধুতে মনে হল,সারা সপ্তাহের ট্যান এক টানে তুলে দিল। যাই হোক এছাড়াও কুর্গ থেকে কিনতে পারেন কফি। রোস্টেড কফি বিনস্ কিনল দেবু পাশের দোকান থেকে। কিনতে পারেন হোম মেড চকলেট। আমরা এক বাক্স সাদা আর এক বাক্স কালো চকলেট কিনলাম শ্বশুর মশাইয়ের জন্য। স্বাদ আমার ভালো লাগে না। ডেয়ারি মিল্কের নখের যুগ্যি না,তবে আমার শাশুড়ী মা খেয়ে মোহিত। এছাড়াও কিনতে পারেন গরম মশলা যেমন এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি। বিভিন্ন এসেন্সিয়াল ওয়েল, যেমন ইউক্যালিপটাসের তেল,লবঙ্গর তেল ইত্যাদি। আমরা কিছুই কিনিনি যদিও।
এবার ফেরার পালা। পরদিন জলখাবার খেয়ে বেলা সাড়ে নটা নাগাদ মাডিকেরিকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম। বাঙ্গালোর পৌছলাম বিকাল সাড়ে চারটে নাগাদ। আগের বার মূল ব্যাঙ্গালোরে থাকিনি, এয়ারপোর্টের কাছে হাওয়ার্ড জনসনে ছিলাম। ঐ হোটেলের একটি ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য ছিল, বাথরুম এবং ঘরের মাঝের দেওয়ালটি ছিল স্বচ্ছ কাঁচের। অর্থাৎ আপনি স্বচ্ছন্দ আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর স্নান ইত্যাদি প্রত্যক্ষ  করতে পারেন। পর্দা ছিল এই যা স্বস্তি। এবারে ব্যাঙ্গালোর শহরের কেন্দ্রস্থলে রামাডা এনকোরে থাকা। ব্যাঙ্গালোরের রিং রোডের বিখ্যাত  জ্যামের একটু স্বাদ পেলাম। ধনীদের শহর,এতে কোন সন্দেহ নেই। পা বাড়ালেই গুচ্ছ গুচ্ছ মল,নামীদামী হরেক ব্রাণ্ডের শোরুম, তবে এ ছাড়াও আরেকটা শহর লুকিয়ে আছে, যা আমাদের শহরের মতই নোংরা, অপরিচ্ছন্ন। খোলা লরি, প্রকাশ্য রাজপথ দিয়ে বদগন্ধযুক্ত আবর্জনা বয়ে নিয়ে চলেছে, একটা প্লাস্টিক পর্যন্ত ঢাকা দেওয়া নেই। আর এই হোটেলেরও বাথরুমের একটি দেওয়াল স্বচ্ছ কাঁচের। কি ভাগ্যি পর্দাটুকু আছে। শুধু রাতটুকুই তো কাটানো এই শহরে, কাল মধ্যাহ্নে প্লেনে চড়া, সন্ধ্যা ঘনাবার আগেই বাড়ি। আর পরশু থেকে- উফ্ আর ভাবতে চাই না।
(শেষ)