Thursday, 8 February 2018

"আই লাভ ইউ"-

- হ্যালো!
- হ্যাপি প্রোপজ ডে।
- (হাসি চেপে, ক্লান্ত স্বরে) এটা আবার কোথা থেকে শিখলে?
- আরেঃ সকাল থেকে দেখছি এফবি’তে।
- উফঃ তোমাকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়াটাই ঝকমারি হয়েছে দেখছি।
- সে তুই যাই বলিস, প্রোপজ মানে তো ঐ আই লাভ ইউ বলা, আমাকে জীবনে কেবল একজন পুরুষই আজ অবধি আই লাভ ইউ বলেছে, আর সেটা হল তুই।
- (হাসি চেপে) হুম!
- সত্যি বলছি, ছোট থেকে আমার কত শখ ছিল, যে কেউ বলবে-। কলেজ থেকে ফেরার সময় মাথা নিচু করেও হন্যে হয়ে খুঁজতাম, কেউ তো বলুক-। অন্য সব বান্ধবীদেরই কেউ না কেউ বললও আমায় কেউ কোনদিন বলল না জানিস। একে কালো, তায় বিশাল মোটা, তায় আবার মাথায় গুড়গুড় করছি। কার দায় কেঁদেছে আমায় ভালবাসতে?
- আঃ। আবার শুরু করলে? তোমাকে যথেষ্ট সুন্দর দেখতে মা-
- সেতো শুধু তুই বলেছিস বাবু, আর কেউ কোনদিন বলেনি।জ্যাঠাইমা- ঠাকুমা- কাকিমা সবাই মা-বাবাকে কথা শোনাত, ভয় দেখাত, কালো মেয়ের বিয়ে দিতে অনেক টাকা বর পণ দিতে হবে।
- ঐ জন্য আমি তোমার বাপের বাড়ির কাউকে দেখতে পারি না।
- পারার কথাও না। তোর মেয়ে বন্ধুগুলোর মত যদি আমার মনের জোর আর বাড়ির সাপোর্ট থাকত, তাহলে আমিও বলতাম, “মারো ঝাড়ু অমন বিয়ের মুখে।“ এরা যেদিন দেখতে গেল, বলল পছন্দ, তোর বাবাকে দেখে আমি কেমন বিগলিত হয়ে গেলাম। আহাঃ এই লোকটা! এই লোকটা বলবে, আই লাভ ইউ।
- ( হাসি আর চাপা গেল না) বাবা? বাবা বলবে? ওফ মা! তুমি পারোও বটে-
- কেন রে? বউ হয়ে বরের মুখে আই লাভ ইউ শুনতে চাওয়াটা কি অন্যায় আব্দার নাকি? তোর বাবার মুখেই তো শুনতে চেয়েছি,পাশের গ্যারাজের আনসার কাকুর মুখে তো নয়?
- হো- হো-হো। মা, ইউ আর টু ফানি।
- সেটাই তো বলবে বাপু। মাকেই তো জোকার বলবে- মা তো ক্লাউন। বিয়ের পর কটা মিষ্টি কথা বলেছে বল তো? কটা সিনেমা নিয়ে গেছে? হানিমুন গেছি কোথায়? না পুরী।সঙ্গে কে?শাশুড়ি, ভাশুর- জা। সেখানে গিয়েও রাঁধো- বাড়ো। এক সাথে সৈকতে বসে চারটে বাদাম ভাজাও খেতে পারিনি। সব জায়গায় তোর জেঠি, ঠাকুমা—কাবাবে হাড় হয়ে উপস্থিত।
- হুম।
- সত্যি কথা বলছি বাবু, তোর বাবারও যে আমাকে খুব একটা পছন্দ ছিল তা নয়।সারাদিন ব্যাঙ্কের কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফিরে, বই মুখে বসে পড়ত, আমি গিয়ে বসলে- দুটো কথা বলতে গেলে কি বিরক্তি।
- বাবা ঐ রকমই।
- আমিও তাই ভাবতাম রে বাবু। তারপর একদিন সত্যিটা জানতে পারলাম।
- কি সত্যি?
- তোর বাবার একজন প্রেমিকা ছিল। তোর বাবা সব আই লাভ ইউ তাকেই বলে বসেছে। আমার ভাগে কাঁচকলা- লবডঙ্কা।
- আঃ মা। সে বিয়ের আগে অমন প্রেমিকা সকলেরই থাকে। তুলতুলির আগেও তো আমার জীবনে রিঙ্কি ছিল—
- হ্যাঁ বাবা থাকে। তাকে কেউ হিসেবে ধরে না। কিন্তু ইনি বিয়ের আগেও ছিলেন-পরেও। ওনার স্বামী তোর বাবার ব্যাঙ্কেই কাজ করতেন, মারা যাবার পর উনি চাকরী পান। সেই সময় থেকেই দুজনের মাখোমাখো সম্পর্ক। মহিলারও একটা ছেলে ছিল, তাই উনি তোর বাবাকে বিয়ে করতে রাজি হননি।
- কি যা তা বলছ মা?আজ কেনই বা এইসব কথা বলছ?
- তোদের বাড়ির লোক সব জানত। ছেলের ঘাড় থেকে মহিলাকে নামাতেই আমার সাথে জবরদস্তি বিয়ে দেওয়া। বিয়ের পরও দুজনের সম্পর্ক অবিকৃত থেকে যায়।কি বোকা ছিলাম আমি। বুঝতেই পারিনি—খালি ভাবতাম লোকটা আমায় ভালো তো বাসে শুধু বলতে লজ্জা পায়।
- মাঃ।
-  আমি যখন জানতে পারি,  তোর বয়স পাঁচ। প্রচুর ঝগড়া করলাম, প্রচুর কাঁদলাম, তারপর বললাম, হয় আমি নয় ও। তোর বাবা নির্বিকার মুখে বলল, “ও থাকবে।তুমি দ্যাখো।“
- মা এসব কি?
- হ্যাঁ বাবা। তোর মনে আছে? একদিন তোতে আমাতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম, অনেকক্ষণ গড়ের মাঠে বসে রইলাম, আমি কাঁদছি আর তুই খেলছিস। কি আনন্দ তোর। মাঝে মাঝেই এসে আমায় জড়িয়ে ধরছিস।তোকে ছেড়ে মরার কথা ভাবতেও পারলাম না। ভাবলাম তোকে নিয়েই রেলে গলা দেব। টিকিট কেটে স্টেশনেও গেলাম, একটার পর একটা ট্রেন এল- সামনে দিয়ে চলেও গেল। রোদের তাত, সারাদিনের খালি পেট, তুই আমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলি, একবার করে রেললাইনের দিকে তাকাচ্ছিলাম, একবার করে তোর মুখের দিকে। পারলাম না জানিস। বড় ভীতু তোর মা, বাবা। মরতেও পারল না। বেশ বুঝলাম যাবার কোন জায়গা নেই, মাথা নিচু করে ফিরে গেলাম তোর বাবার কাছে।
- মা এসব কথা আমাকে কেন কোনদিন বলোনি-
- বলিনি বাবা, বলে কি হত? ভালোই তো ছিলাম তোতে –আমাতে। তোর বাবাকে সচেতন ভাবেই কেটে ফেলে দিয়েছিলাম- শুধু দায়িত্ব- কর্তব্যের কেজো সম্পর্কটুকু বাদে। তোকে নিয়ে বাঁচতে শিখলাম— তুই হয়ে উঠলি আমার সবথেকে বড় বন্ধু। তুই ই শেখালি নিজের শর্তে বাঁচতে, তোর কথাতেই হোম ডেলিভারির কাজ শুরু করলাম। তুই’ই বললি আমায়, “আই লাভ ইউ।“
- আই লাভ ইউ মা।
- তবে কেন বাবা, এই অসহায়, কালো মোটা বুড়িটাকে ছেড়ে মরতে যাচ্ছিস বাবা?
- মা! তুমি কি করে?
- আমি জানি বাবা, ডিভোর্সের পর আজ তোর প্রথম বিবাহবার্ষিকী। জানি তোর মন খুব খারাপ। বিশ্বাস কর, আমারও। সেই যে রিঙ্কি যখন তোর মন ভেঙেছিল, কত অভিশাপ দিয়েছিলাম রিঙ্কিকে মনে পড়ে?ভাগ্যিস ও শোনেনি। আজকাল যখন বাজারে দেখা হয়, আর পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে বলে, “কেমন আছো কাকিমা?” এত লজ্জা করে কি বলব।
- সে সব কিছু নয় মা। আমি ঠিক আছি।
- না বাবা। তুই ঠিক নেই। সকাল বেলা যখন তোর আর তুলতুলির বিয়ের ছবি গুলো আবার দিলি তখন থেকেই ভয় পাচ্ছিলাম। আর একটু আগের স্ট্যাটাসটা—
- মাঃ
- কেন বাবা? কেন? তুলতুলি অন্য কাউকে ভালোবেসেছে, তোকে ছেড়ে অন্য কারো হাত ধরেছে এটাই বড় হয়ে গেল বাবা? আর এই বুড়ি যে সারাজীবন তোকেই ভালোবেসে গেল- তার বুঝি কোন দাম নেই?
- মা আমি কিছু বুঝতে পারছি না। নিজেকে বড় ছিবড়ে মনে হচ্ছে। বেঁচে থাকার কোন কারণই খুঁজে পাচ্ছি না মা। নিজেকে ফেলিওর মনে হচ্ছে-
- আমি যে তোকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না বাবা। আমি যে তোর সাথে মরতেও পারব না বাবা। তোর মা টা যে বড় ভীতু বাবা। এই বুড়িটার জন্যই না হয়, একটু চেষ্টা কর না বাবা? কেউ তোকে একদিন পছন্দ করত, আজ আর করে না, তার মানে কি তুই ফ্যালনা হয়ে গেলি বাবা? এতদিন ধরে যে নিজের পরিচয় বানালি, এত বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী সব কি রাতারাতি অর্থহীন হয়ে যেতে পারে? এটা শুধু একটা খারাপ সময়, শনির দশা বলতে পারিস। কেটে যাবে। খুব তাড়াতাড়ি কেটে যাবে। আর যদি নাও কাটে, তুই অভ্যস্ত হয়ে পড়বি। যেমন আমি তোর বাবার সাথে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সময় সব ঘা সারিয়ে দেয় বাবা।
- বলছ মা?
- হ্যাঁ বাবা। যেমন পরীক্ষা এলেই ভয়ে তোর জ্বর আসত, আর পেট কনকন করত। তারপর আমার বুলি শুনে, সব জ্বর- পেট ব্যথা ঝেড়ে ফেলে পরীক্ষা দিতে যেতিস, আর রেজাল্ট বেরোলে এক গাল হেসে বলতিস, “ভাগ্যিস তোমার কথা শুনেছিলাম মা”, তেমনি  এবার ওঠ। উঠে দুটো সিদ্ধ ভাত বসা, গরম গরম দুটো ভাত পেটে পড়লেই সব মৃত্যু বিলাসিতা জানলা গলে পালাবে।কালই গিয়ে কটা দিন ছুটির দরখাস্ত দে, আমার কাছে এসে দুটো দিন থাকত বাপু।
- আই লাভ ইউ মা।
-  কি যেন বলিস তোরা, (একটু লজ্জা লজ্জা গলায়) আই লাভ ইউ টু বাবু।

বইমেলার কবিতা


দেখা হয়ে গেল বইমেলাতে। সেই বহু পরিচিত, দেখেও না দেখা নাক উঁচু ভাব করে চলে যাচ্ছিল। বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। আচ্ছা আমিই না হয় আগে নত হলাম। নির্ঘাত ভাবল কি গায়ে পড়া মেয়ে রে বাবা।  জিজ্ঞেস করলাম,“তুমি এখানে?” থমকে গেল, পলকের জন্য মুখ থেকে খসে পড়ল বিজ্ঞের মুখোশ।হতভম্বের মত বলল,“কেন আমি বই পড়ি না?” বললাম,“ না মানে ঐ যে কি সব ট্যাব,কিণ্ডল- পিডিএফ ঐ সব পড় বোধহয়।  তাই-”। কোন জবাব দিল না। চোখের দৃষ্টিতে মৃদু ধমক যে দিল বেশ বুঝলাম।চলে যাবে কি এখুনি? আবার অচেনা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল হৃদয়। মন চিৎকার করে উঠল, আরও কিছুক্ষণ না হয় রইলে কাছে--। শুনতে যে পেল না সেও বুঝলাম। মুখ বন্ধ ছিল যে।
আজ আর কিছুতেই কথার স্রোতকে থামতে দিতে চাই না। তাই বললাম,“ তোমার সেই ডাস্ট এলার্জি?সেরে গেছে বুঝি?” জবাবে ভ্রু কুঁচকে বলল,“কমোনি তো দেখছি এক ছটাকও। ” মোটা বলল বুঝি, রাগ হল না তো?হৃদয়ের বেদনা যেন কিছুটা উপশম হল, বললাম,“নাঃ কমিনি। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বরং বেড়েই গেছি। ” হাল্কা হাসির রোদ খেলে গেল কি দাড়িগোঁফের জঙ্গলে? সুযোগ বুঝে বললাম,“একটা সেল্ফি?” বলল,“সেল্ফাইটিস্ টাও বেড়েছে দেখছি।” বলতে পারলাম না,“কয়েদ করে রাখতে চাই এই মুহূর্তটাকে। যেমন রেখেছি তোমার সঙ্গে কাটানো আরো অজস্র মুহূর্ত।" বলতে পারলাম না, একদলা কষ্ট কোথা থেকে এসে চেপে ধরল বুক আর গলা। ছলছলে চোখকে অন্যদিকে ঘোরালাম, ধরা পড়তে চাই না। কিছুতেই না। সূর্য কি পশ্চিমে ঢলে পড়ল খানিকটা? এখনও একটাও বই কেনা হয়নি। তার হাত ও খালি। এবার যেতে হয় এবং যেতে দিতেও হবে। মন বলল,“ভালো থেকো। ” আর সে? সে বলল,“চলো তোমার ছবিটা তুলে নি”। হাসলাম দুজনেই। ক্যামেরার সামনে হাসতে হয় তো। শাটার বন্ধের সাথে সাথেই কি নেমে আসবে নিশ্ছিদ্র  অমানিশা?না কি সব নিয়ম ভেঙেচুরে দুমড়ে মুচড়ে উল্টোদিকে দৌড়বে পৃথিবী?

Saturday, 13 January 2018

অনাির ডাইরি


অনির ডাইরি ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮
শহর জুড়ে আজ প্রেমের মরশুম। আলোতে মাখামাখি আমাদের ড্রয়িং রুম। যার দেওয়াল জুড়ে তুত্তুরীর বানানো নানা ছবি,বানান(যার অধিকাংশই ভুলভাল),কমলা ফেব্রিক কালারে হাতের ছাপ, সোনালী গ্লিটারে ময়ূর আঁকা(দেখে উটপাখি মনে হলে আমি দায়ী নই)। হোক না তবু তো ইয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে। তারওপর আবার ছুটির দিন- আহাঃ সোনায় সোহাগা। গরম কৃষ্ণ কফির কাপটা বরের সামনে নামিয়ে পরম সোহাগ মাখা আধো আধো স্বরে বললাম,“তুমি আমাকে উইশ করবে না?” উইশ শুনে আমার বরের মুখের হাল কি হল সে আর লিখছি না। সকালের টাইমস্ অব ইণ্ডিয়া থেকে কোন রকমে চোখ তুলে  নাক উঁচু করে বলল,“হ্যাপি শিবরাত্রি। ” দিল পুরো মুডের পিণ্ডি চটকে, তবু যতটা সম্ভব তরল করে বললাম,“না। না। ওটা না।” বর গম্ভীর মুখে মারি চিবুতে চিবুতে বলল,“আমি শিবরাত্রি ছাড়া আর কিছু মানি না। তুই শিবরাত্রি করিসনি। তোকে দূর করে দেব। ”কি অমৃত সম্ভাষণ মাইরি। আজন্ম নাস্তিক, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র  অভাবিত আমার বর নাকি শিবরাত্রি ছাড়া আর কিছু মানে না। আর আজকের দিনে বউকে দূর করে দেবার চিন্তা কোন বাঙালী পুরুষের মনে হচ্ছে না?সদ্য বিবাহিতদের জানি না, তবে আমাদের মত পুরোণো পাপীগুলো ফেবু আর হোয়াটস্ অ্যাপ ভরিয়ে দিয়েছে ঘ্যাণঘ্যাণ করে। “আজকের দিনে বউকে চমকে দিন। গার্লফ্রেণ্ডের সাথে বউয়ের আলাপ করিয়ে দিন”,“বউ মানে বড় উৎপাত” মার্কা পচাগলা রদ্দি জোকস্ পাঠিয়ে পাঠিয়ে। এক ব্যাচমেট তথা অভিন্নহৃদয় বন্ধুকে তো সক্কালবেলায় উদোম ঝাড়লাম। এতই যখন উৎপাত তোরা বিয়ে করেছিলি কেন?বউকে ছেড়ে একটা বর খোঁজ, বুঝতে পারবি কতধানে কত চাল। মূর্তিমান আপদ এক একখানা।
যাইহোক ফিরে আসি আমাদের আলোকজ্জ্বল ড্রয়িং রুমে। বরকে করজোড়ে নমস্কার করলাম,দরকার নেই বাপু তোমার ভালোবাসায়,দয়া করে বাজার গিয়ে আমায় উদ্ধার করো। বাবার তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও জবরদস্তি তু্ত্তুরীও সঙ্গে গেল। ওদের ক্যাথলিক স্কুলেও আজ সারপ্রাইজ, শিবরাত্রির ছুটি। ঘড়ির কাঁটা আধ পাকও ঘোরেনি বাবা-মেয়ে ফিরে এল প্রবল ঝগড়া করতে করতে। শৌভিক যথারীতি,“অসভ্য গোভূতটাকে আমি আর কোথাও নিয়ে যাব না। ওষুধের দোকানে গিয়ে এমন বকেছে, বাপরে বাপ- 'ও ঐ ভায়োলেট ওষুধটা কিনছ। ওটা তো থাইরোনর্ম। থাইরয়েডের ওষুধ। মা খায়”।  হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। শৌভিক চিৎকার করেই চলেছে,“আরো শোন। বলল ‘বাবা,ঐ দেখ ঐ যে শিশির মধ্যে যে লজেন্স গুলো আছে, ওর নাম কফলেট। ওগুলো কিন্তু টফি নয়। কাশি হলে খায়। ’ ওর বকবকানির চোটে শঙ্কর বলল,‘বাপরে এ তো এখুনি ডাক্তার হয়ে গেছে। ওষুধ তো দিতেই পারবে। শুধু ডিগ্রীটা যা নেওয়া বাকি।’ ” হাসতে হাসতে বেদম দশা। তুত্তুরী গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে,শৌভিকবলেই যাচ্ছে,“শুধু তাই নয়, বাপ্পার সঙ্গে যা বকেছে, বাপরে বাপ।”বাপ্পা হল আমাদের চিকেন ওলা।  বাবা যখন কাঁচা আনাজ কিনছিল, তুত্তুরী বাবার হাত ছাড়িয়ে বাপ্পার কাছে গিয়ে বলেছে,“ একটা মুরগি কাটো তো। আমি দেখব। আমার অনেকদিনের শখ। কচকচ করে কেটে ফুলো। কিন্তু আমি মুর্গিটা কিনব না। তুমি তো এমনিই কাটতে, আমার সামনেই না হয় একটা কাটো। ”
তুত্তুরী অভিমানে ফুলছিল। বাবাকে অনেক অনুনয় বিনয় করেছে,একটা ফুল কিনে দাও। মাকে দেবো। আজ ভ্যালেন্টাইন ডে। বাবা যথারীতি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। উফ্ এই ফুল কেনা নিয়ে কাল কি নাটক। দিব্যি ডেপুটেশন খাচ্ছি, আচমকা তুত্তুরীর মাসির ফোন। ভয়ে আঁতকে উঠলাম। কি হল রে বাবা? ঝানু তথা বৃদ্ধ ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকে বললাম,থামুন। আগে দেখি বাড়িতে কি হল। ফোন ধরতে মাসির কাতর স্বর কানে এলো,“বোনি একটু বোঝাও। কি কাঁদছে। বাপরে বাপ। ফুলে ফুলে কাঁদছে। দম আটকে বমি করে ফেলবে। ”কেন কাঁদছে কেন? না ইস্কুল থেকে ফেরার সময় তুত্তুরী কাতর অনুরোধ করেছে,  মাসি একটা ফুল পেড়ে দাও। কাল ভ্যালেন্টাইনস্ ডে। আমি মাকে দেব। আমাদের আবাসনে  ফুলের বান ডেকেছে কিন্তু সিকিউরিটার আতঙ্কে মাসি গাছে হাত দেয়নি।
ডেপুটেশন দিতে আসা জঙ্গী তথা বৃদ্ধ নেতা নেত্রীদের বসিয়ে মেয়েকে বোঝালাম।ওণারাও মাথা নেড়ে নানা কথা বলে সাহায্য করলেন।  মাঝখান থেকে গেল বেচারাদের ডেপুটেশনের পিণ্ডি চটকে।
ফেরার পথে নৈহাটী স্টেশনের সামনে দেখি ঢেলে ফুল বিকোচ্ছে। টকটকে চকচকে গোলাপের জওয়ানিতে পিছলে যাচ্ছে চোখ।মেয়ের জন্য বুকটা টনটনিয়ে উঠল। আহাঃ।  অল্পবয়সীদের ভিড়ে মাঝে টুক করে ঢুকে পড়লাম। ফুলওয়ালাকে ফিসফিসিয়ে বললাম,“ভাই মেয়ের জন্য কিনব। সবথেকে বড়টা দাও। আর ঐ সব জঞ্জাল মাঝে মস্ ফার্ণ জরি একদম না।” সাদার ওপর চিকন গোলাপী বর্ডার দেওয়া গোলাপের দাম বলে ৩০টাকা। বললাম ভাগ্। পাতি লাল গোলাপ ৫টাকা দিয়ে কিনে প্লাস্টিকে মুড়ে সযত্নে ব্যাগে ভরলাম। আর একটা গোটা কুড়ি টাকার চকলেট। গরিব শ্রমিক মা, ভালোবাসার দিনে আর কি দেবে- ভালোবাসা ছাড়া?
ট্রেন বেশ ফাঁকা। অন্যমনস্ক ছিলাম হঠাৎ দেখি দুটি গেঁড়ি গেঁড়ি বাচ্ছা চলন্ত ট্রেনের দরজার সামনে টাইটানিক মার্কা পোজ দিচ্ছে। টেনে এনে বসালাম। এই তোদের মা কই?নিরুত্তাপ এবং নিরুত্তর। দুটোর গায়ে রঙ চটা সুতির জামা, পা খালি এবং ধুলি মলিন। কোন ব্যাগ ট্যাগও নেই। সর্বনাশ। পালিয়েছিস নাকি অ্যাঁ?বাড়ি কোথায়? কিছুই বলে না। খালি মিচকে মিচকে হাসি। এদুটোকে ছেড়ে তো আমি নামতেও পারব না। যা দিনকাল। কে ধরে নিয়ে যাবে। কি করবে, মায়ের মন শঙ্কায় কেঁপে ওঠে। বাবা বাছা করে অনেক বোঝাবার পর বলল, বিধাননগর বস্তিতে থাকে। মা লোকের বাড়ি বাসন মাজে। স্কুলে ভর্তি তো হয়েছে তেমন যায় না। মায়ের সময় কোথায়। বাবা নেই। মানে আছে কিন্তু আরেকটা বিয়ে করেছে। ইদানিং মা সন্ধ্যার দিকে পাশের ফেলাট বাড়িতে নতুন রান্নার কাজ পেয়েছে। মা বেরোতেই ওরাও বেরিয়ে পড়েছে। অনেক বোঝালাম। কত বিপদ হতে পারে। বোঝালাম তোরা ছাড়া মা’কে কে ভালোবাসবে?বোঝালাম মায়ের যন্ত্রণা আর বাড়াস না বাবা। দুহাতে দুটোকে পাকড়ে ঝপাং করে নামলাম উল্টোডাঙা স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে মেলা লেগেছে যেন। কত ফুল। হৃদয়াকৃতির ছবির ফ্রেম,কফি মাগ,টেডি। তুত্তুরীর গল্প বলছিলাম,মেয়েটা বলল,“মাসি মাকে আমরাও কিছু দেব।”কি দিবি বাবা? ছেলেটা বলল,“কিন্ত পুইসা নেই মাসি। ” একটু দূরেই ওদের ঘর। মা অন্ধকার ঘরের দরজার সামনে বসে আছে।  বাচ্ছাদুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম,গোলাপ আর চকোলেটের দরকার কাদের আজ বেশী। একজনকে ফুলটা দিলাম আর একজনকে ক্যাডবেরী।শুধু বললাম ভালো থাকিস বাবা।
বিনা ফুল চকলেটেই বাড়ি ফিরলাম। আমাদের ধনী মহল্লা বাড়ি ঢোকার আগে ফুলের দোকঅনে দাঁড়িয়েছিলাম,৫টাকার গোলাপ ১২-১৫টাকা চাইল। ধুৎ তেরী। ভালোবাসার দিনে বুক ভরা ভালোবাসাই তো যথেষ্ট।
শৌভিকের বর্ণণা আর আমার অট্টহাস্যের ফাঁকে কখন তুত্তুরী গিয়ে নিয়ে এসেছে তার রঙচটা লাল ফোন। যাতে একটা টাকাও আমরা ভরাই না, যাতে তুত্তুরী লোকজনকে ফোন করে বিপাকে না ফেলে। ফোন না যাক, ভয়েস রেকর্ড তো হয়। মেয়ে আমার জন্য মেসেজ রেকর্ড করে রেখেছে,“শোন মা”-কানে দিয়ে শুনি ফিসফিসানি,“আই লাভ ইউ মা। হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস্ ডে”। বুকটা ভরে গেল। আবার কি চাই। ভালোবাসা সত্যিই বাতাসে ভাসে, যত দি তার অনেক বেশী ফিরে আসে।
#Happy_Valentines_Day

অনাির ডাইরি১২ই জানুয়ারী,২০১৮
গণ্ডগোলের সূত্রপাত বেশ কয়েকদিন আগে, তাহলে বিশদেই বলি, বড়দিনের প্রায় এক মাস দীর্ঘ ছুটিতে তুত্তুরীর হোমওয়ার্ক ছিল একটি গহনার বাক্স। অর্থাৎ জুয়েলারি বক্স। এই টুকুনি গেঁড়ি গুলো থোড়াই ওসব বানায়? সব কাজ সামলে সেই মায়েদেরই কোমর বাঁধতে হয়। তা না হয় বাঁধলাম, দীপাবলীতে উপহার পাওয়া ড্রাইফ্রুটের বাক্স দিয়ে দিব্য গহনার বাক্স বানানো যায়, কিন্তু মুশকিল হল বাক্সর গায়ে অলংকরণ করব কি করে? আগের প্রজেক্ট অর্থাৎ ফুলদানি বানাবার সময় কি কুক্ষণে ফেব্রিক কালার আর আঠা কিনেছিলাম! সব রঙ শোভা পাচ্ছে আমাদের সাধের ড্রয়িং রুমের দেওয়ালে, ড্রয়িং রুম ছাড়ুন, গোটা বাড়ি ময় কত কি যে পর্যায়ক্রমে লেখা এবং আঁকা আছে, যেমন দরজাদিয়ে ঢুকে জুতো খুলতে যাবেন, দেওয়ালে জ্বলজ্বল করছে,“মাসি খুব খারাপ। ” মাসি খারাপ তো বটেই, টিভি বন্ধ  করে হোমওয়ার্ক করতে যে বলে তাকে কি করে ভালো বলবেন বলুন তো মশাই?
শোবার ঘরের দেওয়ালে লেখা,“মা আই লাভ ইউ”।  নিজের সৌভাগ্যে চোখে জল এসে যায়, পরদিন কোন গর্হিত অপরাধের জন্য এক ধমক মারি, ফিরে গিয়ে দেখি “মা”এর ওপর ইয়া বড় একটা কাটা চিহ্ন। তারপর দিন আবার হয়তো ফেরার পথে আঙুর কিনে আনলাম, তো সেই কাটা মায়ের ওপর আবার লেখা হল “মা আই লাভ ইউ। ” 
লাভ ইউ/লাভ ইউ নট ছাড়ুন,কত কি যে আঁকা এবং লেখা আমাদের দেওয়াল জুড়ে। যত্র তত্র দশ হাত ওলা মা দুর্গা আঁকা, আম, পদ্মফুল, সূর্য এছাড়াও অজস্র দাগ, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে গোলগোল দাগ কাটে তুত্তুরী, আহা কতটা লম্বা হল দেখতে হবে না বুঝি? এমন কিছু ছবি আঁকে যা দেখে শৌভিকের এবং আমার হৃদ্কম্প হয়। মিষ্টি মিষ্টি কথায় জিজ্ঞেস করি, “এটা কি এঁকেছিস বাবু?” “ আঙুল মা। বুঝতে পারছ না?” পাপী তাপী মন আমাদের আঙুল দেখে যে কি ভেবেছিলাম সে নাহয় উহ্যই থাক। আর একবার একটা ছবি দেখে অফিস থেকে ফিরে দুজনেরই পিলে চমকে গিয়েছিল, এটা কি? পরে জানলাম ওটা হনুমানের ছবি। বাকিটা তার ল্যাজ। পুঁচকে হনুমানের বিশাল ল্যাজের গল্প বোধহয় লঙ্কাকাণ্ডে পড়েছি এবং গল্প শুনিয়েছি। তুত্তুরী সেটাই চিত্রাঙ্কন  করেছে আর কি। আমাদেরই মনে পাপ আছে---
তো যা বলছিলাম আর কি,দেওয়ালে চিত্রাঙ্কন  নিয়ে কিছুদিন ধরেই বাপ এবং মেয়ের দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলছে। আজকাল আবার তুত্তুরী এঁকে মোছা ধরেছে, ফলে দেওয়ালের অবস্থা চিন্তা করতে পারছেন--। তারওপর রোজই তুত্তুরী কিছু না কিছু হারিয়ে আসে। পেন্সিল বক্স খুললে দেখবেন, গোটা দুয়েক এক ইঞ্চি পেন্সিলের টুকরো আর আধখানা নোংরা রাবার, গোটা দুই প্লাস্টিকের স্কেল ছাড়া আর কিস্যু নেই। প্রবল বায়নাক্কার পর, অথবা অযাচিত ভাবেই হয়তো নতুন পেন্সিল বা ইরেজার বা শার্পনার দেওয়া হল, প্রাণের বন্ধুকে দেখাবে বলে, ঠিক বেলা দুটো নাগাদ আমার মায়ের ফোন আসবে অফিসে,“শোন না,ও শার্পনারটা হারিয়ে ফেলেছে বুঝলি। ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। বকিস না যেন।” মেলার মিটিং এর তীব্র ব্যস্ততা, যত বলি আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। মা আর ফোন ছাড়েই না, “শোন না, কাল থেকে এত হোমওয়ার্ক দিস না। এই টুকু বাচ্ছা অত পড়ার চাপ দিস না। ”হতভম্ব হয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ, এই মহিলাই না পড়া পড়া নিয়ে আমার জীবন অতিষ্ঠ  করে তুলেছিল শৈশবে? একটা আধটা পেন্সিল রাবার হারালেই না বাড়িটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হয়ে যেত?
দাঁড়ান দাঁড়ান গল্প আরো আছে, যে মেয়ে বই থেকে কমপ্রিহেনশন পড়তে গিয়ে নাকের জলে চোখের জলে হয় যায়, সে কি না এয়ারটেলের এসএমএস পড়ে,যথোচিত পাঠোদ্ধার করে, নির্দেশাবলী অনুসরণ করে ফোনে দশ টাকার লোন টকটাইম ভরিয়ে ফেলে? সমস্ত ইন্সপেক্টরদের নিয়ে মিটিং করছি, মেয়ের ফোন, কি করে ফোন করলি রে বাপ? তোর ফোনে তো কোন পয়সা নেই। এতবার দাদু, মামমাম(দিদা) আর কাকিমাকে ফোন করে জ্বালাত যে আমরা ঐ ফোনটায় পয়সা ভরানোই ছেড়ে দিয়েছি। শুধু ফোন ঢুকবে, বেরোবে না। ওমা মেয়ে তো দিব্যি ফোন করছে, কি বলতে, না এত হোমওয়ার্ক দিও না তো। ভালো লাগে না। নিজের মত একটু থাকতে দেবে তো নাকি?
আরো আছে, দাঁড়ান। মেলা সংক্রান্ত শত ব্যস্ততার মাঝেও, অনেক রাতে বাড়ি ফেরার পথে প্রায় জোর করে শাটার খুলিয়ে নানা টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে এনে, একরাতের মধ্যে জুয়েলারি বক্স রেডি করে দিলাম, মিস্ বললে তবে না নিয়ে যাবে স্কুলে। মেয়ের আব্দার মিস্ আজই বলেছে নিয়ে যেতে। আমি বিশ্বাস করলাম,শৌভিক নয়। শৌভিক বারবার বলে গেল ও মিথ্যা বলছে, মিস নয়, ও বন্ধুদের দেখাতে নিয়ে যাবে। কার কথা শুনি?তুত্তুরী কেঁদে কেটে দাদু মামমামকে জানিয়ে এমন কাণ্ড বাঁধাল,বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম। বড় ক্যারিব্যাগে করে পাঠিয়ে দিলাম স্কুলে। রাত্রিবেলা বাড়ি ফিরতেই মাসি বলল, মিস এমন কিছু বলেননি, বরং বলেছেন নোটিশ দিলে তবে নিয়ে যেতে। তুত্তুরী আসলে ওর প্রাণের বন্ধু ঈশাণীকে দেখাবে বলে নিয়ে গেছে,ব্যাস শুরু হয়ে গেল শৌভিকের বাক্যবাণ,“বলেছিলাম না,ও ভয়ানক মিথ্যুক!ও মোটেই তোর মত নয়। তোকে একের হাটে কিনে দশের হাটে বেচবে। ওরে সাইকোলজি আমার পাস সাবজেক্ট হলেও আমি খুব ভালো করে পড়েছিলাম। মানবচরিত্র আমি খুব ভালো বিশ্লেষণ করতে পারি। ও অতি ধুরন্ধর। তোর মত গোবরগণেশ নয়। ” আমি যে গোবরগণেশ, সবার সব কথায় বিশ্বাস করি, খুব সহজেই মানুষকে ভালোবেসে ফেলি,এবং সেই ভালোবাসার প্রকাশ না করে থাকতে পারি না তা আমি জানি। তাই বলে কেউ তার সুযোগ নেবে এটা বড়ই হৃদয়বিদারক। শুরু হল অহিংসা অসহযোগ।
বুক ফেটে যাচ্ছিল মেয়ের সাথে কথা না বলতে পেরে, সেই ভোর সাড়ে ছটায় স্কুলে পাঠাবার আগে মেয়েকে চুমু খাই, তারপর সেই রাত আটটা। মাঝে শুধু মেয়ের গায়ের দুধ-দুধ গন্ধটা নাকে লেগে থাকে। আর ঠোঁটে? মেয়ের ফাটা ঠোঁটের ঊষ্ণ চুম্বনের গলিয়ে দেওয়া অনুভূতি । এটা কি কোন বাবার পক্ষে বোঝা সম্ভব ?
তবু চেষ্টা করলাম, মিথ্যে সেই বলে যার কল্পনাশক্তি প্রবল। আমিও বলতাম। পাথর গলেই না। শৌভিকের মতে আমি নির্বোধ চূড়ামণি আর তুত্তুরী অত্যন্ত সুচতুর ভাবে বাবার বিরুদ্ধে আমায় ব্যবহার করছে, দলভারি করার জন্য। কি করি?কি ভাবে সামলাই এই গৃহযুদ্ধ? দুজনেরই ফরিদপুরিয়া গোঁ। আমি হাওড়া-মুর্শিদাবাদ কম্বো, ভালোবাসা আর আবেগ ছাড়া কিছু বুঝিনা। ইশোশানাল ফুল। বাবা মাও যোগ্য সঙ্গত করল, সত্যি বলছি ঘরে দপ্তরে এত চাপ সামলানো অসম্ভব। প্রতি পদক্ষেপে মনে হয় কি অসম্ভব ব্যর্থ আমি। একজন মা এবং একজন মহিলা শ্রমিক হিসাবে-
ঠিক এই সময় আমার প্রাণাধিকা বান্ধবীর মেসেজ, সেও নারী শ্রমিক। তারও একটি মাত্র সন্তান। এবং সেও আগাগোড়া মিথ্যুক। পায়ে কুকুরে আঁচড়ে দিয়েছে, কি অসীম পারদর্শিতার সঙ্গে লুকিয়ে গেছে এই খবর, বাবা মাকে কি অসাধারণ পট্টি পড়িয়েছে ,চেয়ার টানতে গিয়ে পয়ে আঁচড় লেগেছে। ঈশ্বর মঙ্গল করুন “উটো“র সেই বন্ধু ছেলেটির, যার সত্যি কথা শুনে মেলা শেষে প্রায় রাত দশটার সময় আমার বান্ধবী ওষুধের দোকানের ঝাঁপ খুলিয়ে ছেলেকে অ্যান্টি রাবিজ এবং টেটভ্যাক দিতে পেরেছে।
সুকন্যার মেসেজ বুকে বল এনে দিল,নাঃ তুত্তুরী একটু বেশী কল্পনাপ্রবণ বটে তবে খারাপ নয়। পড়াশোনা করুক বা না করুক ক্লাস টুতে উঠেই যাবে। এবার যেটা প্রয়োজন তা হল বাপ†মেয়ের ভাব করিয়ে দেওয়া,আর কে না জানে, পুরুষদের হৃদয়ের রাস্তা কোথা থেকে শুরু হয়, বিশ্বাস করুন শিশুদেরও- নীচের ছবি দুটির একটি হল আমার বানানো গহনার বাক্স আর অপরটি আমার বানানো চকলেট কেক।  প্রেসার কুকারে বানানো। ভিতরে ঠাসা চকোলেট চিপস্।  আসলে হয়েছে কি হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম,সংসারে শান্তি চাই। বর আর মেয়ের ভুল বোঝাবুঝি মেটাবো, এদিকে বাড়িতে কোকো পাউডার নেই। ঘড়ি বলছে রাত নটা। হাউসিং এর মার্কেটে তালা, অগত্যা বোর্ণভিটাই ভরসা। ভুলবেন না এটা হল ক্যাডবেরী বোর্ণভিটা, ফাইনেস্ট চকোলেট। সাথে এক চামচ নেসক্যাফেও দিয়েছি কিন্তু, নাহলে ঐ মাদক গন্ধ্টা ছাড়বে না। বোর্নভিটার ডেলা ডেলা পাওয়ার বুস্টার গুলোই বেক করার পর গলগলো চকো চিপস্ হয়ে গেছে। খেয়ে দেখবেন না কি?
পুনশ্চ ঃ- আমার কিন্তু মাইক্রো নেই, প্রেশারকুকার আর নুনই ভরসা।

অনির ডাইরি ১১ই জানুয়ারী ২০১৮
রাত বাড়ার সাথে সাথেই চেনা শহর কেমন যেন রহস্যময় হয়ে ওঠে। শুনশান কালেক্টরেটে পেশী আস্ফালন করে ঘুরে বেড়ায় একপাল অনাথ সারমেয়।এমনিতেই আমাদের কালেক্টরেটটি বিশাল,লোকমুখে শুনি এটা নাকি হাজি মহম্মদ মহসিন সাহেবের নিবাস ছিল এককালে। এখানকার ঝুল বারন্দা নাকি পৃথিবীর দীর্ঘতম। একদিকে জেলা আদালত, জেলার মূখ্য বিচারকের নিবাস,ডিভিশনাল কমিশনারের দপ্তর অন্যদিকে ডিএম সাহেবের করণ। দিনেমানে বোধহয় হাজার খানেক লোক সমাগম হয়, অথচ রাত নামলেই হানাবাড়ি। বিশাল জনশূণ্য আবছা আলোকিত বারন্দায় গিয়ে দাঁড়ালেই গা ছমছম করে।যতটা না আধিভৌতিক পরিবেশের জন্য তারথেকে অনেক বেশী দায়ী হাড় কাঁপানো গঙ্গার হিমেল হাওয়া।
ফাঁকা লঞ্চে গুটি কয় সওয়ারি,লঞ্চ ঘাট থেকে স্টেশনে যাবার গমগমে নৈহাটি বাজারে যেন শনি লেগেছে। সারি সারি ঝাঁপ বন্ধ দোকানের সামনের আধো অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসে নৈহাটি স্টেশন। আপাততঃ বেশ কিছুক্ষণ  কোন ট্রেন নেই। ফাঁকা বেঞ্চে, ব্যাগ পত্তর আঁকড়ে বসলাম। নৈহাটিতে খুব ছিঁচকে চোরের উৎপাত। অসতর্ক হলেই হাত থেকে ব্যাগপত্র মোবাইল ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়। কাজেই--
মাথায় ঘুরছে মেলার চিন্তা। নিমন্ত্রণ ঠিকঠাক হল তো? আসবেন না জানি, তবুও আমরা এমন ভাবে নিমন্ত্রণ করি যেন ব্যক্তিগত শুভানুষ্ঠান। হোয়াটস্ অ্যাপে জেলা প্রসাশন তথা অন্যান্য দপ্তর এবং লেবার তথা সাবঅর্ডিনেট লেবার সার্ভিসের সকল পরিচিতকে আগেই কার্ডের প্রতিলিপি পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করেছি। এমনকি অবসর প্রাপ্ত শ্রমিকদেরও বাদ দিই নি। হোক না অবসর প্রাপ্ত তাও তো শ্রমিক। কি যে খুশি হন এনারা। এই খুশি টুকুর রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন ওণাদের শুভকামনা হিসাবে।
অনেকেই জবাব দিয়েছেন,ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জনৈক রিটায়ার্ড দাদা দেখলাম লিখেছেন, “ধন্যবাদ। তোমাদের অনুষ্ঠান সর্বতোভাবে সাফল‍্যমণ্ডিত হোক , এই কামনা করি। বিশ্বাস করি , হবেও।শুভেচ্ছা নিও।নতুন (ইং) বছর মঙ্গলময় হোক।” মনটা ভরে গেল, এই না হলে বয়ঃজেষ্ঠ্য। সারাদিনের ক্লেদ,গ্লানি, হতাশা,ক্লান্তির ওপর যেন ওষধি মলমের প্রলেপ। দিলখুশ মেসেজ। বলতে গেলাম,“পারলে আসবেন কিন্তু। ”তার আগেই দেখি ওণার মেসেজ ঢুকল,“যেতে হয়তো পারবো না .....
স্ত্রী তো অসুস্থ দীর্ঘদিন ধরে।”সে কি?জানি না তো। অবশ্য জানবই বা কি করে?মেসেজ পাঠাই বটে,নিয়ম করেই পাঠাই, যে কোন উৎসবে-পরবে,বাঁধা গৎ-“আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সকলকে অমুখ দিবসের শুভেচ্ছা। ” জবাবেও ফরোয়ার্ডেড মেসেজ বা ছবিই পাঠান সকলে, না ও পাঠাতে পারেন কোন জবাব। কদাচিৎ কেউ কেউ ব্যক্তিগত মেসেজ পাঠান। “ভালো থেকো” মার্কা। মন ভরে ওঠে ভালো থাকার সুবাসে। তারপর? আবার সেই থোড় বড়ি এবং খাড়া।

যাই হোক, সেটাই বললাম। কি হয়েছে। সুললিত বাঙলা হরফে জবাব এল,“প্রায় বছরখানেক ধরে ভুগছে , নিউরো হসপিটালে চিকিৎসা চলছে। বার দুই মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে । নানারকম সমস্যা।দিনে, প্রথমদিকে , ১৪/১৫ বার জ্ঞান হারাচ্ছিল।কমে ৮/১০ বার...... ৪/৫ বার...... এখন ২/৩ দিনে ১/২ বার ।কোনও রকম উত্তেজনা ( আনন্দ বা দু:খ ) হলেই বেহুঁশ। মাথায় সামনের দিকে একজায়গায় আর পিছনদিকে এক জায়গায় ড‍্যামেজ হয়েছে। পড়ে যায় খালি,গেছে ও বেশ কয়েকবার। ধরে ফেলি আমরা। ফলে , সবসময় আমি আগলে বসে থাকি , বেরোতে পারি না। ডাক্তার strictly বলে দিয়েছে মাথায় আর চোট কোনও রকমে লাগলে fatal হয়ে যাবে , life risk হতে পারে।বুঝতেই পারছ, আর কেউ নেই , ছেলে তো বেরিয়ে যায় অফিস।”
ইশ্ ইশ্ ইশ্ ছাড়া আঙুল সরল না। বৌদিকে দেখিনি কোনদিন,গল্প শুনেছি,বিশাল হাউসিং এর দুর্গাপুজার সব দায়িত্ব উনি একা হাতে সামলাতেন। আর দাদা চণ্ডীপাঠ করতেন। একবার আমার কাতর অনুরোধে সাড়া দিয়ে উনি চার্চ লেনে আমার চেম্বারে কিছুটা চণ্ডীপাঠ করেছিলেন। কি উদাত্ত জলদগম্ভীর  কন্ঠস্বর। টকটকে ফর্সা রঙ,ঋজু চাবুকের মত মাঝারি চেহারা, আর্যসুলভ খাড়া নাক,চোখবন্ধ করে যখন সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করছিলেন,রীতিমত গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। সেই সৎ ভালোমানুষ দুটিরএকি অবস্থা?উনি ঠিক কারো সমবেদনা বা করুণাগ্রহণের পাত্র নন,তবুও আমার সমবেদনা কি ভাবে যেন খুব ভালো মনেই গ্রহণ করলেন। বললেন, “ জানো, রান্নার লোক নেই দীর্ঘদিন , পাচ্ছি না। ওর বারণ আগুনের সামনে যাওয়া।আমাকেই করতে হয়।ইদানীং ও একটু আধটু জোর করে করছে। আগে তো কোনওদিন করিনি , ভাই।  পারতাম না।ঠেলায় পড়ে শিখে গেছি।” আবার লিখলাম “ইস্ কি অবস্থা। ” আমার শব্দকোষ সাময়িক ভাবে খালি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আদি অনন্তকাল ধরে এই জনহীন নৈহাটি স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে প্রবল ঠান্ডায় আমিও জমে গেছি। উনি লিখে চলেছেন,“ চাইলেও যোগাযোগ রাখতে পারিনা।
২০/২২  টা ওষুধ খাওয়াতে হয়,সারা দিনে। ” 
ঘোষিকা ঘোষণা করে দিল, ট্রেন আসছে। গুটি কয়েক সহযাত্রীও দেখলাম কোথা থেকে এসে হাজির। ফোন বন্ধ করার আগে লিখলাম,“আপনাদের ঈশ্বর কেন এত যাতনা দিচ্ছেন বঝতে পারছি না। প্রার্থনা করি বৌদি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। ” উনি লিখলেন,“ সেটাই প্রার্থনা করো। এমনি তে আমি মোটামুটি ঠিকঠাকই আছি, অন্তত শারীরিক ভাবে। তোমাদের শুভেচ্ছা ভালোবাসা আর ঈশ্বরের আশীর্বাদই এই বৃদ্ধের একমাত্র সম্বল।  যোগাযোগ রেখো,একতরফা ভাবে হলেও। রাগ অভিমান না করে।ভালো থেকো। শুভেচ্ছা আশীর্বাদ নিও।” মনটা কেমন ভরে গেল জানেন। কে বলে পৃথিবী শুধুই আবেগহীন, হিসেবী ব্যক্তিবর্গের চারণভূমি ?মোটেই নয়। মোটেই নয়। আমরাও আছি। এবং বিশ্বাস করুন আমরাই কিন্তু সংখ্যাগুরু, আর যতদিন আমাদের মত আবেগসর্বস্ব মানুষজন রয়েছে,পৃথিবী কিন্তু সবুজই থাকবে।