Tuesday, 15 August 2017

বাবার ডাইরি থেকে

বাবার ডাইরি থেকে #1-১৫ই অগস্ট ১৯৪৭
ঘোষণা তো হয়েছিল এক বছর আগেই। একই দিনে দুইটি দেশ স্বাধীন হবে না। পাকিস্তান স্বাধীন হবে১৪ই আর ঠিক তার পরের দিনই আমরা পেতে চলেছি আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। এরপরই এল সেই কালো দিন, “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে”। তখন আমার কতই বা বয়স, পাঁচ সাড়ে পাঁচ  বড় জোর। তাও বেশ বুঝে গেলাম রায়ট কাকে বলে।
বাড়ির পাশেই তৈরি হল হাওড়া মিলনী ক্লাব। এরকম অনেক ক্লাব তখন রাতারাতি গজিয়ে উঠেছিল হাওড়া শহর জুড়ে। ক্লাবের আড়ালে আসলে প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলা। ক্লাবে রাখা থাকত লাঠি, পেটো। পাড়ার সমর্থ  ছেলেদের প্রতিদিন শরীরচর্চা করা ছিল বাধ্যতামূলক। দাদা, ছোটকাকা, কেলো মামা এরা লাঠি ভাঁজত, ডন বৈঠক করত, আর আমরা হাঁ করে দেখতাম। মহিষাসুরের মত চেহারা ছিল ওদের। পাড়ার বাচ্ছা ছেলে এবং মেয়েদেরও আত্মরক্ষার নানা কৌশল শেখানো হত। সন্টুদা অর্থাৎ সন্তোষ কুমার বোস ছিল আইএনএ ফেরৎ মিলিটারি ম্যান। সন্টুদা আমাদের ড্রিল করাতো। আর ছিল ভীমদা। অ্যানার্কিস্ট মুভমেন্টের সাথে গভীর ভাবে জড়িত ছিল। পরে কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। ভীম দা আমাদের বক্সিং শেখাত। ভজাদা ছিল আইপিটিএর সঙ্গে জড়িত। দারুণ গান গাইতে পারত। আমাদের দেশাত্মবোধক গান শেখাত ভজাদা।
১৯৪৭ এর ১৫ই অগস্ট আসার বহু আগে থেকেই প্রস্তুতি পর্ব শুরু হল। যেমন যেমন গেজেট নোটিফিকেশন বেরোত, বাবা এনে দিত মেজকাকাকে। মেজকাকা ফাইন খাদির কাপড় সেই মাপে কেটে, নির্দিষ্ট গেরুয়া এবং সবুজ রঙে ছুপিয়ে, নিজে হাতে সেলাই করে বানাল তেরঙা। দিনান্তে কাজ সেরে বাড়ি ফিরে, বড় ফ্রেমে সেই তেরঙা পতাকাকে আটকে সুক্ষ্ম নীল রেশমি সুতো দিয়ে স্বহস্তে বানাল অশোকচক্র। অবশ্য মাঝে মাঝে অবসর পেলে মেজো কাকিমাও বসে যেত সূচিকর্মে।
১৪ই অগস্ট সকাল বেলায়, দাদা আর কেলো মামা একটা ঠেলাগাড়ি যোগাড় করে রওনা দিল বালটিকুরির উদ্দেশ্যে। দাশনগর স্টেশন পেরোলেই তখন আলামোহন দাশের ফ্যাক্টরি । আর ফ্যাক্টরির সীমানা ছাড়ালেই ধনী ব্যক্তিদের বৃহৎ বৃহৎ বাগানবাড়ি। সবগুলি বাগান বাড়িই ছিল একই ছাঁচের। আদতে একতলা ছোট একটা সুদৃশ্য বাড়ি আর একটা মর্মরে বাঁধানো বিশাল টলটলে পুকুর। আর এই বাড়ি এবং পুকুরকে ঘিরে ঘণ বাঁশ এবং দেবদারু গাছের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিকল্পিত জঙ্গল। ওখানে শুটিংও হত। কাননদেবী ঐ পুকুর থেকেই স্নান করে উঠতেন, বা ঐ জমিদার বাড়িতেই প্রবিষ্ট  হতেন।
দাদা আর কেলো মামা খুঁজে পেতে সবথেকে লম্বা ঋজু বাঁশ আর প্রচুর দেবদারু পাতা কেটে নিয়ে এল। ঐ বাঁশের গায়ে পাটের দড়ি দিয়ে দেবদারু পাতা বাঁধা হল। অতঃপর যখন  তিনতলার ছাতে নিয়ে গিয়ে জানলার সাথে বাঁধা হল মনে হল এক বিশাল হুইস্পারিং দেওদার গাছ দাঁড়িয়ে আছে। দেবদারু পাতার আড়ালে লুকিয়ে তার টেনে বাঁশের মাথায় একটা বাল্ব লাগানো হল। মেজোকাকা বলত, আন্ডা লাইট। বাল্বের একটু নীচে লাগানো হল মেজোকাকার হাতে বানানো কপিকল। তার মধ্যে দিয়ে মেজোকাকা গলিয়ে দিল খুঁজে পেতে ওয়ার ডিসপোজাল থেকে কিনে আনা প্যারাশুটের দড়ি। যেমন মসৃণ তেমনি হাল্কা ছিল সেই দড়ি। সহজে জট পড়ত না। সেই দড়ি দিয়ে ঝোলানো হল তেরঙা।
ঠিক রাত বারোটায় গমগমিয়ে উঠল আকাশবাণী। দেশবাসী সাক্ষী রইল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জহর লাল নেহেরু দেশবাসীর উদ্দেশ্যে রাখলেন তার ঐতিহাসিক ভাষণ। তারপর, লালাকেল্লা থেকে ধীরে ধীরে নামিয়ে নেওয়া হল ইউনিয়ন জ্যাক আর ধীরে ধীরে উঠতে লাগল আমাদের জাতীয় পতাকা। বাবা ইশারা করল, উঠোনে একসাথে বেজে উঠল একাধিক মঙ্গলশঙ্খ।সেই ধ্বনি গুঞ্জরিত হল দূর দূরান্তে। সব বাড়ি থেকে ভেসে আসতে লাগল শঙ্খধ্বনি।  এতদিন শাঁখ বাজত শুধু শত্রুর আগমন বার্তা জানাতে, শাঁখ বাজলেই পাড়ার সমর্থ পুরুষরা দৌড়ত ক্লাবের উদ্দেশ্যে, লাঠিসোঁটা নিয়ে তৈরি হতে। আর আজ শাঁখ বাজল এই বার্তা নিয়ে যে আমরা স্বাধীন।
পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে সব অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা মাঠে জড় হল। মেয়েদের পরণে সাদা ফ্রক, পায়ে সাদা কেটস্ আর মাথায় গান্ধী টুপি। আর ছেলেদের পরণে সাদা হাফ প্যান্ট আর সাদা হাফ শার্ট। সন্টুদা সবাইকে লাইনে দাঁড় করালো। সূর্যের প্রথম রোশনির সাথে বাবা পতাকা তুলতে লাগল। বেজে উঠল শৈলদার বিউগল আর অজিতদার কেটল্ ড্রাম, ভজাদার অঙ্গুলির তালে তালে আমরা প্রাণ খুলে গাইতে লাগলাম,“ জণগণমন”। পতপতিয়ে উড়তে লাগল আমাদের তেরঙা।
এরপর? পাড়ার সব সম্পন্ন বাড়ি থেকে চাঁদা দিয়ে আয়োজন করেছিল, সব বাচ্ছা ছেলেমেয়ের হাতে তুলে দিল বাটার পেপারে মোড়া দু পিস বাটার ব্রেড, একটা করে সিদ্ধ ডিম,একটা কলা আর কমলালেবু। হ্যাঁ তখন অগস্টে বেশ ঠান্ডাঠান্ডা আমেজ থাকত, কমলালেবুও পাওয়া যেত। এরপর কয়েকটা লরি বোঝাই করে আমাদের নিয়ে দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে হাওড়া শহর পরিদর্শনে বেরোনো হল। জনগণের সে কি উল্লাস। আজ থেকে আমরা স্বাধীন।
সন্ধ্যাবেলা বাবা, মেজোকাকা, ছোটকাকা, দাদা আর কেলোমামা আমায় নিয়ে পায়ে হেঁটে বের হল বেলিলিয়াস রোডের দিকে। এতদিন এই অঞ্চলে আমাদের প্রবেশাধিকার  ছিল না। রায়টের কারণে বেলিলিয়াস স্কুলও বন্ধ ছিল অথবা অন্য কোথাও সরে গিয়েছিল আজ আর মনে নেই। গলি গলি দিয়ে নরসিংহ দত্ত কলেজের সামনে বেরিয়ে, বেলিলিয়াস রোড ভরে ফাঁসি তলার দিকে চলেছি আমরা। এদিকেও খুশির মেজাজ। কি দারুণ আলোর রোশনাই। সব দোকানপাটের সামনে ভারত এবং পাকিস্তানের পতাকা লাগানো। সবাই আজ ফ্রিতে খাবার দিচ্ছে। অনেক পরিচিত হিন্দু দেখলাম, নো বিফ সেকশন থেকে খাচ্ছেও। কেউ কেউ এসে আমাদের হাতে মিষ্টি ধরিয়ে আদর করে চলে গেল। অবাক হয়ে গেলাম, এরা তো বেশ ভালো মানুষ। আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তাহলে? কেন এত হানাহানি, অহেতুক রক্তপাত?
বাবার ডাইরি থেকে #২

"৭০তম স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিচারণ —

নামটার সাথে আমার বয়সের সংখ্যাটা জুড়ে আছে । আমার পরমাত্মীয়া একমাত্র কন্যা আমার পরমগতির দিনক্ষণ স্থিরিকরণের ব্যাপারে অতিসতর্ক । নিয়মিত  (পশ্চিম) বাংলার সেরা দুই ডাক্তাররের কাছে আমার হাজিরা বাঁধা — দুজন কেন? না আমার হেল্থ রিপোর্ট  ক্রশ চেক করতে হবে যে !

যদিও মালটিপল্ অরগ্যান ফেলিওর , আমার মাথা ছাড়া সর্বাঙ্গই ছুয়ে ফেলেছে, তবুও ডাক্তারবাবুরা যখন উচ্ছাসিত হয়ে বলেন, “এই বয়সে এত ভালো স্বাস্থ্য অসম্ভব, আমরা আগে দেখিনি”— তখন আমি তো খুশি হই-ই,  আমার মেয়ের মুখটাও প্রভাত সূর্য্যের রঙে দেদীপ্যমান  হয়ে ওঠে !

প্রাক স্বাধীনতা যুগের আমার প্রাচীনতম  স্মৃতি হল ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরোক্ষ অভিঘাত । বাড়ি থেকে  পায়েচলা দুরত্বে বৈকুন্ঠ চ্যাটার্জী লেনে তেলিবাড়ীর মাঠে একটা জাপানী বোমা পড়েছিল । ফলে হাওড়ার শিল্পাঞ্চলের ব্যাপক বাসিন্দারা দ্রুত শহরছেড়ে সুদুর গ্রামাঞ্চলে  সরে যায়। আমাদের সম্পুর্ণ পরিবারটা কিন্তু সেই ভূতুড়ে  শহরেই ছিলাম! বাবা/কাকাদের  যুক্তি  ছিল — সসৈন্যে নেতাজী যখন শহরে প্রবেশ করবে , তখন তাঁকে বরণ করার জন্য তো কা‘উকে না কা‘উকে থাকতে হবে !
        ছোটকাকা সাইকেলের সামনে বসিয়ে একদিন বোমা পড়ার জায়গাটা আমাকে দেখিয়ে এনেছিল। এখনকার আন্দাজে বিস্ফোরণের ফলে ৬০‘লম্বা ,৬০‘চওড়া, ৬০‘গভীর একটা ডোবা হয়েগিয়েছিল  মাঠটা।
     যুদ্ধকালীন সময়ে আমাদের খেলাছিল পুরানো খবরেরকাগজ থেকে কেটে কেটে ফিতের মত ফালি তৈরী  করে ময়দা আঠা দিয়ে কাঁচের শার্সিগুলোতে বাঘবন্দী খেলার ঘর আঁকা— যাতে করে বোমার শব্দে কাঁচগুলো স্প্লিন্টারের মত ভেঙে ছড়িয়ে না যায় ।
       আর সকাল বিকাল আমাদের জমিতে কাটা দুটি বিশাল সর্পিল ট্রেন্চের ভেতর নেমে ছোটাছুটি করা ছিল বাচ্ছাদের চরম আনন্দের বিষয় ।

যুদ্ধের শুরুতে আক্ষরিক অর্থে শিশুই ছিলাম,তাই সে হিসাবে ৪০এর মন্বন্তর আর ৫০ লক্ষ নিরন্ন বাঙালির মহানগরীর পথেঘাটে মৃত্যুর  ‘আঁখো দেখা হাল’ কিছু বলতে পারবো না । তবে কর্মক্ষেত্র থেকে বাবা-কাকারা বাড়ি ফিরে যেসব আলোচনা করতো তা শুনে   বুঝতে   পারতাম যাতায়াতের রাস্তায় মৃতদেহে স্তুপ পড়ে থাকতো।
কিন্ত সকাল ৮টার মধ্যেই সামরিক প্রশাসন  ‘ডাম্পার“ দিয়ে মৃতদেহগুলি রাস্তা থেকে চেঁচে তুলে জাতিধর্মনির্বিশেষে গণদাহকার্য্য সম্পাদন  করতো। এদের বলাহত গাদার মড়া । এ কাজের জন্য নির্মিত বিশেষ একধরণের চিমনি  হাওড়ার বাঁশতলা ঘাঠ শ্মশানে অনেক দিন ছিল ।
শোনাকথা ৫০লক্ষ মৃতদেহ দাহ করার জন্য ৫বছর  ২৪ঘন্টা চুল্লিগুলো জ্বলেছিল !
এই সময়টা আমাদের ৩০/৩৫জনের সংসারটাকে খুব একটা খাদ্য-কৃচ্ছতা মধ্যদিয়ে যেতে হয়নি । যুদ্ধের শুরুর প্রথমদিকেই একধরনের বেসরকারী  রেশন ব্যবস্থা চালু হয়। বাবা,মেজকাকা ও ছোটকাকা যে যার কর্মস্থল থেকে ‘ফুল রেশন’ পেতেন ।  এছাড়া আমাদের বসন্তরায়তলা (৭৫) আর বালটিকুরির (২৫) মোট  ১০০বিঘা জমিতে উৎপাদিত মোটা চালের ভাগ পেতাম।
ঘেরা বাড়ির পাকা বিশাল উঠানের পাশে সমপরিমাণ কাঁচামাটির বাগানে দুটি বিশাল উনুন  বানানো ছিল । সাত-সকালে ঘরেবাইরের বাগান-জমি থেকে শুকনো ডাল-পালা পাতা  কুড়িয়ে নিয়ে এসে ও দুটিতে আগুন দেওয়া হত। দুটো বিশাল হান্ডায় টইটম্বুর জল আর পরিমান(কম)  মত খেতের মোটা চাল দিয়ে ফ্যান তৈরি   করা হত । একটা বড় মালশায় থাকতো লবণ ।
সকাল ৮থেকে জীবন্ত  নরকঙ্কালেরদল আর্তকরুণ ক্রন্দনে এসে জমাহত আমাদের সদর দরজার সামনে । ঠাকুমার নির্দেশে বয়স-নির্বিশেষে সবাই পেত এক ডাবুহাতা ফ্যান আর যথেচ্ছ লবণ ।
এ কর্মকান্ড চলতো সকাল ৮থেকে দুপুর ১২টা অবধি কারণ বুভূক্ষু ভিখিরিরাও তখন ‘এথিক্স’ মেনে চলতো — গৃহস্থঘরে সকাল ৮টার আগে ভাতের হাঁড়ি নামে না, আর দুপুর ১২টার  পর ভিক্ষা দেওয়া  অনুচিত !

৮০বছর আগে বাঙালি  মহিলার যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ ছিলেন ।  নানা যোগে তাঁরা দলবদ্ধ ভাবে,সূর্য্যোদয়ের আগে গঙ্গাস্নান করে শুদ্ধ(?) হয়ে বাড়ি  ফিরতেন ।  ভোররাত্রে রাস্তায় দলবদ্ধ মহিলাদের পিছনে প্রায়শ বৃটিশ-অ্যামেরিকান-নিগ্রো সেনারা ট্রাক নিয়ে তাড়া করতো। তাঁরা আত্মরক্ষার্থে আসপাশের সরুগলিতে ঢুকে পড়তেন । দু-চার জন ধরাও পড়তো ।
বিবাহবাড়িতে  ফরসা বউএর কোলে কালোছেলে বা কালো বাবার হাতধরে ফরসা মেয়ে দেখলে দাদাশ্রেনীর যুবকরা মুচকি হেঁসে বলতো — “ওয়ার প্রোডাক্ট”।

জমি থেকে সামন্তপ্রভু , কলকারখানা  থেকে পূজিপতির উদ্ভবের কথা আর্থ-সামাজিক  দর্শনে ব্যাক্ষা করা আছে ।  বিশ্বযুদ্ধ  সমাজে ৩য় একশ্রনীর শোষকের জন্মদিল— তারা হল কালোবাজারি । এরাই স্বাধীনতা- উত্তর ভারতের নিয়ামক হয়ে ওঠে ।

পরাধীন  ভারতের শেষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ  ঘটনা
১) নেতাজীর অন্তর্ধান ও আজাদ হিন্দ ফৌজ। ২) গান্ধীজীর ভারত-ছাড়ো আন্দোলন ।
৩) জিন্নার “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”/ডাইরেক্ট অ্যাকশন । 

এসবই একজন শিশুর কানে শোনা বড়দের আলোচনার প্রতিস্মরণ যা ভবিষ্যতে লেখা  ইচ্ছে রইলো !"
(টুকলি করা)

Monday, 7 August 2017

অনির বচন

অনির বচন # ১ ০৭/০৮/০৯
ঠিক যখন আপনি সবথেকে গুরুগম্ভীর মিটিংটিতে বসে বোর হবেন, অথবা উর্ধ্বস্থ কতৃপক্ষ আপনাকে হাত পা নেড়ে বেপোট ঝাড় দিতে উদ্যত হবে, দেখবেন ঠিক তখনই আপনার বন্ধুদের জীবনে সবথেকে মজাদার ঘটনাগুলি ঘটতে থাকবে এবং তারাও অযথা সময় অপচয় না করে তৎক্ষণাৎ তা আপনাকে জানাতে থাকবে। উদ্গত হাই চেপে যদি একটিবার হোয়াটস্অ্যাপ খুলেছেন, তো ঐ যে বলে না “তু শালা কাম সে গ্যায়া। ” না পারবেন হাসতে, না পারবেন হাসি চাপতে। হাসি চাপতে গিয়ে হয় ভয়ানক হেঁচকি  তুলতে বাধ্য হবেন নয়তো প্রবল বেগে নিজেকে চিমটি কেটে রক্তাক্ত করতে উদ্যত হবেন তাও হাসি দমবে না। ফলে মুখটিকে অবিকল প্যাঁচার মত করে বসে থাকবেন এবং ওপরওয়ালা আপনার ঐ চাঁদবদন দেখে বুঝতেই পারবেন,  না তো আপনি ওণার কথা শুনছেন, নাই নিকট ভবিষ্যতে শুনতে ইচ্ছুক। ফলে ঝাড়ের বেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হবে।
♥♥পুনশ্চ ইহা মহিলাদের ক্ষেত্রে একটু বেশী মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়।

Friday, 21 July 2017

অনির ডাইরি

অনির ডাইরি ১১ই অগস্ট ২০১৭
কি কেলো মাইরি। কি যে একটা অ্যাপ এসেছে, বেনামে মনের কথা বলা যায়, আর গোটা ফেবু জুড়ে লোকে ধিনিক ধিনিক নাচতে লেগেছে। না বিশ্বাস করুন, আমি আদপে আঁতেল জ্ঞান বৃদ্ধা নই। বরং এই সব অ্যাপ ট্যাপ নিয়ে আমার যথেষ্ট ঔৎসুক্য আছে। আরে বাবা এগুলো জানতে হয়, খেলতে হয়, না হলে আপনি যথারীতি পিছিয়ে পড়বেন। যথা- ছোঃ আপনি সারাহা (নাকি সারারা) এ নাম লেখাননি? আপনি তাহলে মনুষ্য পদবাচ্যই নন।
যাই হোক, দিন দুয়েক আগে অফিসে মিটিং, পাওয়ার পয়েন্টে ইত্যাদি প্রভৃতি নিয়ে নাকের জলে চোখের জলে হতে হতে এক মুহূর্তের জন্য ফেবু খুলেছিলাম, দেখলাম জনৈক নামজাদা আঁতেল একটি লিঙ্ক দিয়ে বলেছেন, যা খুশি ওণাকে লিখতে পারেন, কে লিখেছেন উনি জানতেও পারবেন না। ব্যাপারটা বেশ মজার না?মজা না সাজা কে মাথা ঘামাবে ভাই, শিরে যেখানে সবসময় সংক্রান্তি নাচছে। ফেবু বন্ধ করে ভূলেও গেলাম সাময়িক ভাবে। বেলা তিনটে নাগাদ টিফিন বাক্স খুলে ভাবলাম ফেবুটাও একটু দেখেনি। ও বাবা, ততোক্ষণে ফেবুতে আগুন লেগে গেছে। সবাই পাইকারি হারে সারারা না সারাহার লিঙ্ক পোস্টাচ্ছে, আর জানতে চাইছে,“বল, বল, বল।” এমনকি শ্রীযুক্ত বিতান দেও পোস্টেছেন। আঃ এ সুযোগ কি ছাড়া যায়?বিতানদার সাথে যত ভাব ততো ঝগড়া। প্রকট না হয়ে এই তো সুবর্ণ সুযোগ।    পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে দুজনেই এত ভালবাসি। আর বিতান দা এই গালমন্দ গুলি ভীষণ কি যেন বলে স্পোর্টিংলি নেয়।  তাই লিঙ্কে গেলাম। কি হল বুঝতে পারলাম না, রেজিস্টার করতে বলল, করে দেখলাম, বিতান দা নয়, অন্য কাউকে মেসেজ পাঠাতে বলছে। মনে মনেই বিতানদাকে গালমন্দ করে সারাহা বন্ধ করলাম। সাধে কি ডেনেস্ দা মেনেস্ বলা হত ওকে। কার ইউজার আইডি শেয়ার করে মুর্গী বানালো কে জানে।
এরপর যতবার ফেবু খুলেছি, আহা কি পুলক যে জেগেছে, এত প্রেম?এত প্রেম লুকানো ছিল এত কাল ধরে পেটরোগা,ডেঙ্গু, আমাশা-কৃমিতে ভোগা বাঙালির হৃদয়ে। কে কাকে কবে কলসির কানা পেটা করেছে বলে আমরা তাকে প্রেম দেব না?দেব, দেব, দেব। অবশ্যই দেব। পরের রগরগে প্রেমবার্তা পড়ে যদি আপনার বায়ু রোগ হয়, তো আপনি উচ্ছন্নে যান মশাই।
প্রেম ছাড়াও দু এক ধরণের বার্তা দেখলাম, নোংরা পাতি খিস্তি মার্কা এবং “বলতো আমি কে” টাইপ।
এরপর শুরু হল আসল যন্ত্রণা যখন যত কেলানে শ্রীকেষ্ট এবং ছিরাধিকা আছে, যারা ঐ সব রগরগে মেসেজ গুলি ফটাফট শেয়ার করতে লাগল এবং পাক্কা গাড়লের মত, “কে?কে তুমি?দেখা দাও। প্রকট হও” মত পোস্ট ছাড়তে শুরু করল। এর সাথে যোগ হল অপর একদলের সারাহা নিপাত যাও, সারাহার ভাঙা হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও মার্কা পোস্ট। হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব?
সবথেকে বড় রগড় হল, মাঝরাতে,যখন আমার এক প্রাণাধিকা স্বাধীনচেতা বন্ধু ফোন করে বলল,“এটা তুই না? এ গোপন গভীর রহস্য তো তুই ছাড়া কেউ জানে না”। বোঝো। যত বলি, না ভাই। আমি নই। বন্ধুর অভিমান ততোই বাড়তে থাকে। শেষে বলল,“তুই তো রেজিস্টার করেছিস দেখলাম---”। বোঝো।  এর নাম গোপনীয়তা? ভাগ্যিস বিতানদাকে গালমন্দ করিনি,নাহলে তো কালই হাই কোর্টের শমন, আর পরশুই তিন বছর জেল আর সাত বার ফাঁসি হত। বাপস্ঃ।

পুনশ্চঃ অপভাষার জন্য মাপ করবেন। আর যদি পড়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান তো অনুগ্রহ করে আমাকে বার্তাপাঠ আনফ্রেণ্ড করে বাধিত করবেন।

অনির ডাইরি ৭ই অগস্ট ২০১৭
আশির দশকের শেষার্ধ। তখন দ্বিতীয় শ্রেণী। স্কুলের নাম তারা সুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবন। সাদা জামা, লাল বেল্ট, সাদা মোজা- সাদা কেডস্ জুতো, মাথায় লাল ফিতে দিয়ে দুটি কলা বিনুনী, আর বুকে একটা সোনালী লাল ব্যাজ, যাতে দুটো বক ওড়ার জন্য ডানা মেলতে শিখছে। সকাল বেলা ঘুম ভাঙিয়ে তৈরি করে দিত মা,  তারপর বাবার হাত ধরে, ঘুম চোখে নেশাগ্রস্তের মত টলতে টলতে স্কুল যাওয়া। হেঁটে যেত লাগত দশ থেকে বারো মিনিট। ঠিক ছটা বাজতে দশ মিনিটে বেরোতে পারলে আমিই প্রথম ক্লাসে ঢুকতাম। অন্ধকার ক্লাশ রুমে জানলা খুলে প্রথম আলো ঢোকানোর অনুভূতি ছিল অনির্বচনীয়। তারিখটা আজ আর মনে নেই, সেদিন কোন বিরোধী পার্টি খুব সম্ভবত কংগ্রেসই ধর্মঘট ডেকে ছিল। তখন ধর্মঘট ডাকাটাই ছিল ফ্যাশন-দুরস্ত। সরকারই বলুন বা বিরোধীপক্ষ সবাই নির্দিষ্ট সময়ান্তর বনধ্ ডাকত এবং বাস্তবিকই জনজীবন স্তব্ধ হয়ে যেত।বনধ্ মানেই ছুটি। মে জুন জুলাই এমনি খরার মাস,  ক্যালেন্ডার খাঁ খাঁ করত লাল কালির অভাবে, ছোট  কাকু হতাশ হয়ে বলত, “এবার কেউ বনধ্ ডাক না বাবা। ” বনধ্ সত্যই ডাকা হত তবে মাইনেপত্র কাটার গপ্প সম্ভবত ছিল না। নাহলে আমাদের মত বহু মধ্যবিত্ত সংসারেই হাঁড়ি চড়ত না হয়তো।
যাই হোক সেদিনও বনধ্ ডেকেছিল। তবে সকাল ছটা বাজতে দশে আবার কিসের বনধ্? দিব্যি মা কান ধরে ঘুম থেকে তুলে তৈরি করে দিল,বাবা ও গল্প বলতে বলতে গলিঘুঁজির ভিতর দিয়ে স্কুলে দিয়ে এল। বেলা গড়াতেই শুরু হল বনধ্। কয়েকটা ছেলে পতাকা আর ডাণ্ডা নিয়ে হাজির হল, দোকানপাটে লাঠি ঠুকে কি ভয়টয় দেখালো, সব ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের তৎকালীন স্কুল সেক্রেটারি স্বয়ং বাসের কাঁচ লক্ষ্য করে ইঁট পাটকেল ছুঁড়তে লাগলেন। ব্যস বনধ্ সফল। এবার আমাদের কি হবে? আমার মত যে গুটি কয় ছাত্রী এবং হাতে গোণা শিক্ষিকা এসেছিলেন, তারা আপাততঃ বন্দী। কারণ বাবা-মা'রা তো গুড়গুড়ি গুলোকে স্কুলে পাঠিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। ছুটির সময় হলে আনতে আসবে, আর যতক্ষণ  না শেষ বাচ্ছাটি স্কুল থেকে বিদায় নিচ্ছে দিদিমণিরাই বা বাড়ি যান কি করে?
বড়দি ছিলেন নীলিমা দি,ভীষণ কড়া। উনি হুকুম দিলেন, সেকশন নির্বিশেষে এক-একটি ক্লাশেয় সব মেয়ে এক একটি ঘরে বসবে, পড়াশোনা করার দরকার নেই, ঘর প্রতি একজন টিচার থাকুন, যিনি গল্প বলে মেয়েদের চুপ করিয়ে রাখবেন। কারণ না হলেই আমরা মাছের বাজার বসাব।
আমাদের ঘরে এলেন তারাদি। মধ্যবয়সী,  শুভ্রকেশ,ছোটখাট, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সাদা শাড়ি,মৃদু অথচ ভয়ানক মিষ্ট গলা। তারা দির গলা শেষ বেঞ্চে অবধি পৌছাত না। তাই উনি পায়চারি করে পড়াতেন। তারাদি গল্প ধরলেন, মুহূর্তে শান্ত সমুদ্রের গর্জন।  গোটা ক্লাশে ছুঁচ পড়লে শব্দ শোনা যাবে। কি সে গল্প?খুব ছোট ছিলাম, ঘটনাটা স্পষ্ট মনে থাকলেও গল্পটা ভুলে গেছি। যতদূর মনে আছে, পাল বংশের অন্তিম পর্বে কোন এক রাজার কথা। যাঁর দুই রাণী ছিল। যথাসময়ে দুই রাণীর দুটি কন্যা সন্তান হয়। যাদের দেখতে ছিল হুবহু  এক,শুধু একজনের চোখের মণি ছিল ভ্রমরকৃষ্ণ আর অপরজনের সমুদ্রনীল। দুই কন্যাই যখন নেহাত শিশু হঠাৎ রাজার অকালপ্রয়াণ ঘটে, রাজবৈদ্য যদিও বলেন রাজা হৃদরোগে মৃত, কিন্তু এক রাণীর সন্দেহ হয়, রাজামশাইকে হত্যা করা হয়েছে। বিষক্রিয়ায় মৃত্যু। কিন্তু সে এমন বিষ অভিজ্ঞ দৃষ্টি ছাড়া তা ধরা অসাধ্য। রাণীর দৃঢ়বদ্ধ ধারণা হয়, তার সতীনই মুখ্য অমাত্যর সাথে যোগসাজসে এই হত্যাসাধন করেছে। এরপর কোপ নামতে চলেছে রাণী এবং তার শিশুকন্যার উপরে। অগত্যা গভীর নিশীথে সদ্যোজাত কন্যাকে বুকে নিয়ে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন রাণী মা।
এরপর? কি হয় জানি না। কারণ আমার নাম ডাকা হয়, এবং জানানো হয়, বাবা আনতে এসেছে। বাবাকে দেখার আনন্দের সাথে মেশে চূড়ান্ত হতাশা, গল্পটা আর  শেষ অবধি শোনা হল না। দৃঢ় ধারণা ছিল বাবা নির্ঘাত জানবে, বাবা জানে না এমন গল্পই থাকতে পারে না।  কিন্তু দেখা গেল বাবা শোনেইনি গল্পটা। বড় হতে অনেক আশা ছিল শরদ্বিন্দু বাবুর ওপর। তিনিও নিরাশ করলেন। নারায়ণ সান্যাল ও আশা দিতে পারলেন কই। অনেক খুঁজেছি জানেন। আমার চেনা পরিচিত, যারাই বাংলা সাহিত্য গুলে খেয়েছেন, সকলকে জিজ্ঞাসা করেছি, এমনকি গুগল ও এ গুগলির জবাব দিতে পারেনি। কি হয়েছিল? কে লিখেছিলেন গল্পটা? তবে কি এটা নিছক তারাদির মস্তিষ্কপ্রসূত? এর জবাবের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে জানি না। মাঝে মাঝেই শত ব্যস্ততা অলসতার ফাঁকে চোখে ভেসে ওঠে সেই ক্লাসরুম, তারা দি আর সেই দুই কন্যার কথা, যাদের একজনের চোখ কৃষ্ণ অপর জনের নীল। কি হয়েছিল তাদের সাথে?পিতার হত্যাকারীকে কি যথোপযুক্ত  শাস্তি দিতে পেরেছিল?নাকি নিজেরাই বিলীন হয়ে যায় কলের গর্ভে?কাল নিরবধি--- যদি কেউ জানেন,অনুগ্রহ করে আমায় একটু জানাবেন?

অনির ডাইরি ৫ই অগস্ট ২০১৭
“আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন
আপনি,তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী”  আসন্ন দুর্গা পুজোর আনন্দ বোধহয় এর থেকে ভালো ভাবে বয়ান করা দুঃসাধ্য । ঘণ কালো মেঘে ডাকা আকাশ, ঝমঝমে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে অফিস-ইস্কুল,জমা জল, ডেঙ্গু-জ্বর সব কিছুর মাঝে হঠাৎ যখন এক ঝলক স্বচ্ছ নীল আকাশ আর একফালি সোনা রোদ এসে স্পর্শ করে, ক্লান্ত, চূড়ান্ত  ল্যাদখোর মনও ক্ষণিকের জন্য খুশিতে টলটলিয়ে ওঠে। পুজোর আসার আনন্দ বরাবর শুরুই হয় পুজোর কেনাকাটা দিয়ে। একমাত্র আমার জ্যাঠাইমাকেই দেখতাম জুন-জুলাইয়ের মধ্যে সব কিনে কেটে ভাগ বাটোয়ারা করে দিত। পুজোর প্রথম জামাটা আমার বরাবরই জ্যাঠাইমার থেকে পাওয়া।
বড় পরিবারে মানুষ হবার প্রথম সুফল হল, পুজোয় পাওয়া অসংখ্য জামা। তা বেশ অনেক গুলি তো হতোই। তখন এতো মল কোথায়? পুজোর বাজার মানেই নিউ মার্কেট। রবিবার ছাড়া বাবা-মার সময় হত না।  ১৫ই অগস্টের পর রবিবারেও খোলা থাকত নিউ মার্কেট। মোটামুটি বাবাদের বোনাস ও ঐ সময়েরই আগে পরে হত। রবিবার দিন তড়িঘড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে, বাসে করে সপরিবারে যাওয়া হত নিউ মার্কেট।

মিনি বাস হলে মেট্রো সিনেমার সামনে নামাত, আর বড় বাস হলে প্রেস ক্লাবের সামনে। প্রেস ক্লাবের সামনে নেমে বাবার হাত ধরে মনোহর দাস তড়াগের ওপর দিয়ে হেঁটে ওপারে জহর লাল নেহেরু রোডে পড়া। কি লোভী অথচ ভীতু ভীতু চোখে তাকাতে তাকাতে যেতাম, পাক্কা ভিজে বেড়াল হয়ে- ভাবতেই হাসি পায়। মনোহর দাস তরাগের গয়েই বসে যেত হকাররা ছোটখাট পসরা নিয়ে।চৌরঙ্গী ততোক্ষণে জনসমুদ্র। পিলপিল করত লোকে। কত চেনা লোকের সাথে যে দেখা হত। মাঝে মাঝে  স্কুলেরই কোন বন্ধুর সাথে দেখা হলে মনে হত আয়না দেখছি, তারাও বাবাদের হাত ধরে জুলজুল করে তাকাতে তাকাতে যেত, যথারীতি মায়েরা পিছন পিছন আসত। দেখা হলে হাসি চাপা দায় হত।
লিন্ডসে দিয়ে শুরু হত। আগে জুতো। সেই যে কথিত আছে না পুজোয় চাই নতুন জুতো। শ্রীলেদার্সে ঢোকে কার সাধ্যি। কি লম্বা যে লাইন পড়ত বাপরে বাপ। অগত্যা খাদিমই ভরসা। জুতোর পর জামা। পুরোনো নতুন নিউ মার্কেট পায়ে হেঁটে ঘোরার আনন্দ লিখতে বসে এই মুহূর্তেও অনুভব করছি। প্রতিটি দোকানের বাইরে ভিতরে হ্যাঙারে ঝোলানো কতশত জামা। সবাই আসছে, দেখছে, ঘাঁটছে, চলে যাচ্ছে, কেউ কেউ আবার কিনছেও। তবে যত ভিড় করিডরে, তার কণা মাত্র ভিড় ও দোকান গুলিতে থাকত না।
পাঁচটার কমে বাবা কোনদিন জামা কিনে দিত না। জামা,জুতোর ব্যাগে কাহিল হয়ে নিউ মার্কেট ত্যাগ করার পর কেনা হত, চুলের ক্লিপ, হেয়ার ব্যাণ্ড, ঝুটো দুল, ব্যাগ, কখনও কখনও কাপড় আঁটা ক্লিপও। যেন পাড়ার দোকানে ওসব পাওয়া যায় না। টুকিটাকি  কেনাকাটা চলতেই থাকত যতক্ষণ  না বাবা হুঙ্কার ছাড়ত। এরপর?রালিজের ধোসা আর কুলফি ছাড়া থোড়াই পুজোর মার্কেটিং শেষ হত মশাই।
তারপর অনেক অনেক বছর কেটে গেল। গঙ্গা দিয়ে অনেক অনেক জল গড়িয়ে সাগরে মিশে সামুদ্রিক জলস্তর অনেক অনেক উঁচু কে দিল, পৃথিবী বেশ কয়েক ডিগ্রী গরম হয়ে গেল, বাবামায়েরা বুড়ো হয়ে গেল আর আমাদের শৈশবও কোথায় যেন হারিয়ে গেল। নিউ মার্কেট হারালো তার জৌলুস। নিউ মার্কেটের জামা শুনলে লোকজন নাক সিঁটকাতে লাগল।  আমাদের মত নিখাদ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও শপিং মলে প্রবেশাধিকার পেল। দামী কিন্তু কেনা যায়। দেখতেও বেশ অনন্য। মুছে যেতে লাগল নিউ মার্কেট আর পুজোর অবিচ্ছেদ্য সংযোগ। হারিয়ে গেল সপরিবারে পুজোর বাজার। বিয়ের পর দেখলাম, পৃথিবীর অলসতম নাস্তিক ব্যক্তিটির সাথেই ঈশ্বর আমার গাঁটছড়া বেঁধেছেন। যার মধ্যে পুজো নিয়ে বিন্দুমাত্র উন্মাদনা নেই। শপিং শুনলে আঁতকে ওঠে। “ঐ ভিড় ঠেলে মারামারি করে কেনাকাটা করার কি দরকার? এত আছে তো আর জামাকাপড় কেনারই বা কি দরকার? এবার পুজোয় কেনাকাটা করার আগে বরং একটা বাড়ির ব্যবস্থা কর। রাখবি কোথায়?” ধুস্। অগত্যা বন্ধুবান্ধবই ভরসা। সঞ্চিতা সবসময় রাজি সঙ্গ দিতে, কিন্তু কিছুতেই সময় মেলে না। আর সুকন্যার সাথে সময় তো মেলেই সাথে সাথে মেলে কুঁড়েমিও। দুজনেই সদ্য পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় ফিরেছি। জামাকাপড়ের  কি সাংঘাতিক বেহাল দশা তা আমরা ছাড়া শুধু ঈশ্বরই জানেন। তবু রোজ আমাদের বার্তালাপ বাঁধা থাকত একই ছন্দে,“ যাবে তো? হ্যাঁ যাব।  তাহলে চল? আজ থাক। ” দেখতে দেখতে বিশ্বকর্মা এসে চলে গেলেন, মায়েদের গালমন্দের দাপটে গুরু এবং লঘুজনদের জিনিস গুলি যাও বা কেনা হল, সু বা আমার আর কিছুই কেনা হয়ে উঠল না। দেবু তখন মালদায়। কি কাজে কলকাতা এসেছে, একে ব্যাচমেট তায় পুরোনো পশ্চিম মেদিনীপুর কানেকশন, একসাথে তিনজনে লাঞ্চে গেছি, খাবো কি, দেবু বউকে পুজোয় কি এবং কি কিনে দিয়েছে সেই গপ্পই শেষ হয় না। মাঝপথে দম নিতে থেমে দেবু বলল,“ তোদের বরেরা কি দিল?”  সু গম্ভীর মুখে বলল,“কচু” এবং আমিও ততোধিক গম্ভীর ভাবেই বললাম,“পোড়া। ”দেবু হাঁ হয়ে বলল,“চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাচ্ছিস দুজনে? চল। চল। আজই কিনবি চল। ” কি কিনব, সেই নিয়ে লম্বা চওড়া থিসিস লিখলাম দুজনে, সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলাম না। ট্যাক্সিতে উঠেও যখন ঐক্যমত হতে পারলাম না, দেবু বিরক্ত হয়ে বলল,“ওরে বাপ, তোরা শাড়িই কিনবি চল। আমি না থাকলে শালা তোদের যে কি হবে?” সত্যই তাই। দেবু কান ধরে না নিয়ে গেলে হয়তো মায়েদের থেকে ধার করা শাড়িতেই পুজো কাটাতাম আমরা।
আরো জল গড়িয়ে গেল গঙ্গা দিয়ে। সু আবার ফিরে গেল মেদিনীপুর।দেবু নেমে গেল দুর্গাপুর। পুজো বয়ে আনতে লাগল একরাশ বিষণ্ণতা।একে তো মাইনে পত্র, পেকমিশন,জিএসটি নিয়ে  মনখারাপ, সর্বোপরি এই দুঃসহ একাতীত্ব। একাই কি তবে? ধুৎ আজ মনস্থির  করেই নিলাম, একা তো একাই। সারা বছর তো অনলাইন শপিং চলে, জগজ্জননীর আগমনে আমি কিছুতেই অনলাইনে ডিসকাউন্টে কেনা বাসি পচা জামাকাপড় পড়ব না। পুজোয় যদি মারামারি গুঁতোগুঁতি, দামাদামি করে কেনাকাটাই না করতে পারলাম তাহলে আর করলাম কি।
অনির ডাইরি ২৩শে জুলাই ২০১৭
বর্ষা নামলেই আমাদের ক্যাথারসিস হয়। সব্বার দেওয়াল দেখুন,আজ শুধু বর্ষা নিয়েই সরগরম। এমনকি আমার বর ও সাতসকালে কবির সুমনের কয়েক লাইন পোস্টিয়েছে। যদিও অন্য সকলের পোস্টসূচক অনুভূতির থেকে শৌভিকের পোস্টের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। 
বর্ষা আমার বরাবরই প্রিয়। বাঙালী, মধ্যবিত্ত অথচ বর্ষা আপনার মনে রোমান্টিক অনুভূতির স্পর্শ আনবে না, এ আবার হয় নাকি? তবে আজকাল কেমন যেন মনে হয় এই অনুভূতিগুলো বয়স ভেদে ভিন্ন ধরনের হয়। যেমন শৈশবে, বর্ষা মানেই ছিল নিষিদ্ধ আনন্দ। বর্ষা মানেই উঠোনে জমা জল, আর সেই জলে ভাসানো কাগজের নৌকা। মা আর কাকিমার শুধু অফিস বেরোনোর অপেক্ষা, অতঃপর ঠাকুমাএবং পিসিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট প্রদর্শন করে শুরু হয়ে যেত তিন ভাইবোনের উল্লাস এবং হুল্লোড়বাজি। তখন আশির দশক। ডিসি কারেন্ট। সামান্য ঝড় হলেই তার ছিঁড়ে যেত। সন্ধ্যা থেকে হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসানোর বৃথা চেষ্টা মা’রা অচীরেই ত্যাগ করত। টিপটিপ বা ঝমঝমে বৃষ্টিতে নীচের দালানে কমিয়ে রাখা হ্যারিকেনের নিভু নিভু আলোয় জমিয়ে হাড়হিম করা ভূতের গল্প। কোথায় লাগে হেমেন্দ্র কুমার রায়। ছাত দিয়ে জল পড়া ছিল নিয়মিত ব্যাপার। দোতলার ঘর গুলো প্রায় ভেসে যেত। বাবা তখন হ্যারিকেন, ছাতা, লোহার কাঠি আর আমাদের নিয়ে যেত ছাতের নর্দমার মুখ খোঁচাতে। মারামারি লেগে যেত, কে ছত্রধারক হবে আর কে হ্যারিকেন বাহক।
শুরু হল নব্বইয়ের দশক।বর্ষা মানেই রেইনি ডে বা ফাঁকা ফাঁকা ক্লাস রুম। দিদিমণি না আসতে পারায় ফাঁকা পিরিয়ডে চুটিয়ে গপ্প, মাঝে মাঝে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে প্রিয়বন্ধুর হাত ধরে দেখা ঘণ কালো বাদরের কান্না। বর্ষা তখনও হৃদয়ে রোমান্সের ছোঁয়া লাগাতে পারেনি। ছোঁয়া লাগল নবম শ্রেণীতে। সেই যে “আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি--। ”
দোতলার উত্তর পশ্চিম দিকের ঘরটায় ছিল চারটে মানুষ প্রমাণ জানলা,পুরাণো দিনের বাড়ি, কোন জানলাতেই সান শেড ছিল না। ঝড় না উঠলে বাইরের দিকের কাঠের  খড়খড়ি বন্ধ করা হত না। ভিতরের তিন ভাঁজ কাঁচপাল্লা বন্ধ করেই কাজ চালানো হত। এরকম বৃষ্টির দিনে, নিঝুম দুপুরে,  টিপটিপ আওয়াজ শুনতে শুনতে ঠাকুমার বিয়ের বিশাল খাটে শুয়ে, আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে কাঁচ পাল্লার ভিতর দিয়ে আকাশ দেখা ছিল কি যে অসম্ভব রোমান্টিক ব্যাপার। কতদূর পর্যন্ত যে আকাশ দেখা যেত, ভাবলেই বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যথা করে।  মাথার ওপর বিশাল ডিসি পাখার ঘরঘর, জানলার কাঁচে ছিটপিট ছিটপিট জলের আল্পনা, মাঝে মাঝে একটা ভিজে চুপচুপে কাক বা পায়রা এসে বসত, কাঠপাল্লার ওপর, গম্ভীর ভাবে ভিতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, ছটপটিয়ে জল ঝেড়ে  আবার উড়ে যেত। সত্যি বলছি সময় থমকে আছে আজোও  ঐ মুহূর্তে----

আর এখন বর্ষা, এক অন্য অনুভূতি জাগায়, ইচ্ছে করে, প্রবল ইচ্ছে করে ঠাকুমার বিয়ের ঐ বিশাল খাটের মত কোন খাটে আমার আপাততঃ সবথেকে প্রিয় চার সখীর সাথে অগোছালো গড়াগড়ি বা সোজা কথায় ল্যাদ খাবার। একটু গল্প,  আবার একটু মোবাইল ঘাঁটা, একটু ট্যাবে বই  পড়া, একচোট হাসাহাসি, মাঝে মাঝে বিড়িখোর( আসলে মূল্যবান সিগারেট) গুলোর বিড়ি ফুঁকে আসা, অথবা খাটে বসেই বিড়ি ফোঁকা একটা ভাঙা কাপে ছাই ফেলা,অন্যমনস্কভাবে জানলায় জলের আল্পনা দেখতে দেখতে বাইরের ঝুটো সফিস্টিকেশনকে খুলে ফেলে আসল আমি’র বেরিয়ে আসা----

অনির ডাইরি ২২শে জুলাই ২০১৭
পুরুলিয়ার শিশুটির জন্য সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত, হবে নাই বা কেন?এরকম কিছু হলে প্রথমেই নিজের প্রিয়জনদের জন্যই দুঃশ্চিন্তা হয়, তাই না? সবাই আতঙ্কিত, সবাই ক্ষুব্ধ তা তাঁদের পোস্ট দেখেই বোঝা যায়।তড়িঘড়ি সবাই পোস্ট করেছেন, একজনের দেখা মাত্রই অন্যজন আরো করুণ অথবা আরো বিস্ফোরক পোস্ট দিচ্ছেন। কখনও কখনও কারো পোস্ট দেখে অবশ্য মনে হয়েছে, এটাই ঐ যে বলে না ইন থিং। এনিয়ে একটা পোস্ট না দিলে, ছোঃ আপনি মশাই সামাজিক ভাবে অসংবেদনশীল।

একজন স্বঘোষিত নারীবাদী হিসেবে ব্যাপারটা আমার বেশ কৌতুকের মনে হয়। এর আগেও আমরা এই নিয়ে বহু চর্চা করেছি, বহু অগ্নিগর্ভ পোস্ট লেখা হয়েছে এবং দিনান্তে আমরা পুনরায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, যে, এই ধরনের পাশবিক প্রবৃত্তি তো পুরুষদের থাকবেই। মেয়েদেরই উচিত সাবধান হওয়া। সেই যে পিঙ্ক সিনেমায় স্কিৎজফ্রেনিক উকিলবাবু নোট করছিলেন, মেয়েদের কি কি করা উচিত নয়, মনে আছে? না থাকলে একবার কষ্ট করে দেখেই ফেলুন সিনেমাটা।

রেগে যাচ্ছেন তো?নারীবাদী মানেই সেই পুরুষদের দোষারোপ  করার মানসিক  ব্যারাম যুক্ত মানসিক  রুগী। যারা সবাইকেই ধর্ষক বলে মনে করে নির্ঘাত এইসব বলে জ্ঞান দিচ্ছেন। কি করব বলুন। আপনি যেভাবে ব্যাপারটা দেখেন, যে ভাবে সোশাল মিডিয়ায় বিপ্লব আনেন, তারপর সব ভুলে আবার অন্য ঘটনা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন আমি তা পারি না।

এতজন শিশুটিকে নিয়ে এত লেখালিখি যারা করেন,  তাদের মধ্যে কতজন ভিড় বাসে যখন কোন মহিলা সোচ্চারে কারো অশালীন আচরণের প্রতিবাদ করেন, তাকে সমর্থন জানান? কেউ জানান কি? না মশাই আমার এতবছর বাসট্রামে ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কেবল একবার এক বৃদ্ধ কেবল এক মহিলার সমর্থনে আওয়াজ তুলে ছিলেন। তারপর তাকে যে ভাষায় বীর পুঙ্গবেরা সম্ভাষণ জানিয়ে ছিল, তা আর লিখছি না। পরিণত বয়স্ক মহিলারা যেখানে চিৎকার  করে সেখানে শিশুগুলির কি অবস্থা হয় অনুমান করুন। ভাবলে হাড় হিম হয়ে যাবে। মেয়েগুলো যেই আট দশ বছরের হবে শুরু হয় এই আক্রমণ। এরকম একজন মহিলা খুঁজে বার করুন তো যার এই অভিজ্ঞতা নেই। বিশ্বাস করুন মেয়েরা প্রথম প্রেম ভুলে যায় কয়েক মাস বা বছরে কিন্তু  শৈশবের প্রথম আক্রমণ জীবনেও ভোলে না। মনে হয়, নোংরা এক খাপলা পাঁক গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হল, যা শত সহস্রবার ধুলেও যাবে না। কোন এককালে এক পরিচিত নব্য উকিল বলেছিল,“মেয়েদের একা একা বেশী বাড়ি থেকে বেরোন উচিত নয়। রাস্তাঘাটে তোমাদের সাথে যা হয়, চাকরী করার কথা তোমরা ভাবো কি করে?” উনিও দেখলাম এই ঘটনা নিয়ে এক জ্বালাময়ী পোস্ট দিয়েছেন।

আচ্ছা এটা ছাড়ুন, অফিস কাছারিতে যখন কোন মহিলা সহকর্মী পুরুষ কর্মচারীর বিরুদ্ধে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ আনেন কতজন তাকে সমর্থন করেন? আমি রীতিমতো গর্বিত সেই সব মেয়েদের জন্য যারা সামাজিক লজ্জা সংকোচের ভেক ছুঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ টুকু করার সাহস দেখায়। তাদের সমর্থন করা ছাড়ুন তাদের নিয়ে হাসাহাসি, অশ্লীল ঠাট্টা ইয়ারকিতে ছয়লাপ হয় প্রথম চোটে। এরকম বহু ইন্ডাসট্রিয়াল ডিসপিউট আসে আমাদের কাছে, যেখানে মেয়েটি প্রতিবাদ করা মাত্র তাকে চাকুরী থেকে বিতাড়ন করা হয়।
আর একটা কথা, ধর্ষণের ঠিক কি রকম বিচার আপনি আশা করেন? দিল্লীর নির্ভয়া বা পুরুলিয়ার বাচ্ছাটির ক্ষেত্রে ফাঁসি আর অন্যান্য  ক্ষেত্রে?? ফাঁসি বা জেল? নাকি নিছক সালেশী? যেদিন পুরুলিয়ার শিশুটি মারা গেল ঠিক সেদিনই আনন্দবাজারের ৩নং পৃষ্ঠায় একটা খবর ছিল। কাঁথির ধাউরিয়াবাড় গ্রামের খবর। দুই বোনকে, যাদের একজন নাবালিকা দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ করে আসছিল এক বৃদ্ধ। জানাজানি হলে বৃদ্ধ ঐ ভিটেয় আত্মাহুতি দেবে এই ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখতে বাধ্য করা হয় মেয়েদুটিকে। সম্প্রতি নাবালিকাটি গর্ভবতী  হয়ে পড়ায় ব্যাপারটি সবার গোচরে আসে। অতঃপর? পুলিশ, থানা, কোর্ট, সোশাল মিডিয়া, জ্বালাময়ী পোস্টে ফাঁসির দাবী, কি তাই তো? না মশাই। কিছুই হয়নি। হয়েছে সালিশি সভা। বললাম না কাঁথি, হরিয়ানা নয়, আপনি বলছেন খাপ পঞ্চায়েত?  বিচারে বৃদ্ধকে ২লক্ষ ২০হাজার টাকা জরিমানা  করা হয়েছে। দুই বোনের ক্ষতিপূরণ ১লক্ষ টাকা করে, ১৫হাজার টাকা গর্ভপাতের জন্য আর পাঁচ হাজার টাকার মোচ্চব হবে। ও হ্যাঁ মেয়ের বাবাকেও জরিমানা করা হয়েছে,  মেয়েদের সামলে রাখতে না পারার জন্য। আর আপনার জ্বালময়ী ন্যাকা পোস্টে ৯২টা লাইক আর৫৩টা কমেন্ট।  ঘেন্না ধরে গেল মশাই।
অনির ডাইরি ২১শে জুলাই ২০১৭
সেটাও ছিল ২১শে জুলাই। কলকাতা অচল করার দাবী জানালো এক অল্পবয়সী নেত্রী। লক্ষ্য রাইটার্স। কেন? কি বৃত্তান্ত? আজ থোড়াই মনে আছে। সব তথ্য যদিও নিছক আঙুল নাড়লেই পেয়ে যাব, কিন্তু থাক। ইচ্ছা করছে না। ইতিহাস থাকুক বইয়ের পাতায়, আর উইকিপিডিয়ার আনাচেকানাচে ছড়িয়ে। আমি শুধু অনির ডাইরি লিখতে পারি।
বাবা এবং ছোটকাকু দুজনেই নকশাল ছিল। সুপরিকল্পিত  ভাবে বাড়ি ঘিরে ফেলে ভাঙচুর চালিয়ে ছিল বিপক্ষ পরবর্তী কালে যারা চৌত্রিশ বছর সিংহাসন দখল করে রাখতে সক্ষম হয়। সেদিনের ঘটনাবলী যতটুুকু শুনেছি  তা মনে করে হৃদয়কে অকারণ ভারাক্রান্ত করতে চাই না। শুধু এটুকু বলি যে আসল পরিকল্পনা ছিল পিটিয়ে মারার, ঘটনাটা যতদূর আমি বুঝেছি এমন ভাবে সাজানো হয়েছিল যেন, পুলিশ এবং সিআরপি যৌথভাবে  বাবা এবং ছোটকাকুর খোঁজে আমাদের বাড়িতে তত্ত্বতালাশ চালাতে আসবে, সাথে সাথে জমা হবে শ দুই আড়াই চ্যাংড়া যাদের কিছুবছর আগেও আমরা হার্মাদ বলে উল্লেখ করতাম। তারাই তাক বুঝে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মারবে দুই ভাইকে। প্রায় সপ্তাহ কয়েক ধরে পাড়ার বিভিন্ন  লাল রঙ করা বাড়িতে জমা হচ্ছিল এই হার্মাদের দল। খবর ছিল বাবাদের কাছেও তাও ধরা পড়ে যায়, খুব কাছের কিছু লোকের বিশ্বাসঘাতকতায়। বাবাকে পিটিয়ে আধমরা করেই দিয়েছিল,  পুরো পারেনি শুধু এক পাঞ্জাবি সিআরপি অফিসারের জন্য। যে এত চক্রান্তের কিছুই জানত না। আসামীকে জনগণ পেটাচ্ছে, বাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে অথচ রাজ্য পুলিশের লোক গুলো ঠুঁটো জগন্নাথদেব, ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। অর্ধমৃত বাবাকে কাঁধে ফেলে, মাথাটা বুকে চেপে, যাতে কেউ মাথায় না মারতে পারে,চাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল  পাড়ার বাইরে দাঁড় করানো জিপে।
যাই হোক। এই সব ন্যায্য কারণেই ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আমাদের বাড়ির প্রতিটা লোকের ছিল অসীম ঘৃণা। কিন্তু ঐ দুর্ভেদ্য দুর্গে ফাটল ধরাবে কে? বাবার মুখে শুনেছি দাদু মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন,“ শত্রুকে কোনদিন ক্ষমা কোর না। আর কিছু যদি নাও পারো, প্রতিরাতে শোবার আগে একবার অন্তত ওদের অমঙ্গল কামনা করতে থাকো। ”

গড ফাদারে সেই যে ডন কর্লিয়নি বলে গেছেন, “প্রতিশোধ বাসি হলে মিষ্টি হয়!“যথা সময় মঞ্চে প্রবেশ এই অল্প বয়সী জঙ্গী নেত্রীর। গোটা চাটুজ্জে বাড়ি মুগ্ধ হয়ে গেল ওনাকে দেখে। বলছি আশির শেষ আর নব্বই দশকের গোড়ার কথা। আমি রাজনীতির “র” ও বুঝি না, অনুগ্রহ করে আমার গায়ে কোন দলের রঙ লাগাবার চেষ্টা করবেন না। আমি শুধু লিখে চলেছি অনির কথা, তার নানা প্রত্যক্ষ পরোক্ষ অভিজ্ঞতার কথা।

সেদিন নেত্রী বললেন “চলো রাইটার্স”। বিভিন্ন দিক থেকে ওণার গুণমুগ্ধরা এসে জড় হতে লাগল কলকাতায়। টি বোর্ডের উল্টোদিকে রাধাবাজার পোস্টাফিসের উপরে ছিল বাবার অফিস। তিনতলার জানলা থেকে বাবারা দেখছিল কাতারে কাতারে লোক আসছে হাওড়া ব্রীজ অচল করে। আটকালো পুলিশ। না মশাই শুধু উর্দি পড়া সুটেড বুটেড পুলিশ না, হাওয়াই চটি বা খালি পায়ে উর্দি পড়া ঝুটো পুলিশও ছিল সেদলে।

ক্যানিং স্ট্রীট থেকে টি বোর্ড অবরুদ্ধ করে শুরু হল বেপোট মার। প্রথম চোটেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল জনতা। ছুটল যে যেদিকে পারে অলিগলি দিয়ে। পিছনে লাঠি উচিয়ে আসল এবং নকল পুলিশ । জনতাও সুবোধ নয়। ঐ ভয়ানক মার জনতার ধৈর্যচ্যুতি ঘটালো।  পাল্টা লাঠি ,ইঁট , সোডার বোতল ছুটে আসতে লাগল গলি গলি থেকে।আমার জামাইবাবু ছিলেন হাওড়া থেকে আসা দলটিতে। দু চার ঘা উনিও খেলেন।

নেত্রী সম্ভবতঃ ছিলেন এসপ্ল্যানেড সংলগ্ন কোথাও। খবর পেয়ে ছুটে এলেন অকুস্থলে। টিবোর্ডের পাশের বাড়িটার সামনে অস্থায়ী একটা স্টেজ বাঁধা হয়েছিল। তিনি উঠে মাইক কেড়ে নিয়ে স্বভাব বশতঃ চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “আপনারা শান্ত হন। অকারণ হিংসা ত্যাগ করুন। ” হয়তো বুঝেছিলেন আসল এবং নকল পুলিশ কি করতে বা বাঁধাতে চাইছে। 

এরপরের ঘটনা বলতে বসে বাবা আজো আক্ষেপ করে। কেন যে তখন মোবাইল ছিল না। থাকলে অসংখ্য ছবি তুলে রাখতে পারত।মঞ্চে লাফিয়ে উঠল একদল হাওয়াই চটি পড়া পুলিশের দল-- তারপর শুধু মার আর মার। নেত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে বেধড়ক মার খেলেন অপর এক নেতা এবং নেত্রীর দেহরক্ষী। পুলিশ হয়ে পুলিশের রাতে রক্তাক্ত হল। আর নেত্রী? অত মার খেয়ে, সাদা শাড়ি রক্তাক্ত হওয়া সত্ত্বেও নড়ানো গেল না ওনাকে। পালালেন না মঞ্চ ছেড়ে। হার্মাদদের নজর পড়ল ওপরের খোলা জানালায়। আধলা ইঁট দমাদ্দম উড়ে আসতে আগল জানলা গলে সাথে অশ্রাব্য গালিগালাজ। কয়েকজন দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল ওপরে----

পরদিন আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় ছিল সেই বিভৎস দৃশ্য। ছবির পর ছবি শুধু ওনার মার খাওয়া। মার খেতে খেতে পড়ে যাওয়া এবং পড়ে গিয়েও মার খাবার। লাল হয়ে যাওয়া সেই কাগজটা বহুদিন রাখা ছিল আমাদের বাড়িতে। লাল লম্বা রোয়াকে দাঁড়িয়ে জেঠু, বাবা এবং ছোট কাকু সহমত হয়েছিল, কবে, কখন কি ভাবে কেউ জানে না কিন্তু মৃত্যুঘন্টা বেজে গেছে। আমরা তিন গুড়গুড়ে খুড়তুতো  জেঠতুতো ভাইবোন হাঁ করে শুনছিলাম।

সত্যি সত্যি সেই মৃত্যুঘন্টার দর্শন পেয়েছিলাম জানেন, সময়টা ২০০৯। ২১শে জুলাই মানেই সেই সময় ব্রিগেডে সমাবেশ। জ্বালাময়ী ভাষণ।  ভয়াবহ যানযট। নিত্যযাত্রীদের ভোগান্তি। আমি এএলসি খড়্গপুর। শৌভিক প্রবেশনার আলিপুর। সদ্য বিয়ে হয়েছে কিন্তু আলাদা আলাদা থাকতে বাধ্য হই পেশাগত কারণে। কি যেন বলতো শৌভিক উইক ডেজ্ ব্যাচেলর উইকএন্ড ম্যারেড তাই।
সেদিন ও দাশনগর থেকে মেদিনীপুর লোকালে উঠে, নবপরিণীত  বরকে ফোন করলাম। রোজকার রুটিন ছিল সেটাই। শৌভিক ধরল না। ভাবলাম চান করতে গেছে হয়তো, পরে করবে। প্রায় উলুবেড়িয়ার কাছে, হঠাৎ ফোন। “কাল রাত থেকে খুব জ্বর। তুই কি আসতে পারবি?”এটা কি ধরনের প্রশ্ন হল? আজ ২১শে জুলাই ঘড়ির কাঁটা নটার ঘর ছুঁইছুই। যদি নামিও উল্টো দিকের ট্রেনে চাপতে পারব? সে যে কি থিকথিকে ভিড় বলে বোঝাতে অপারগ। কিন্তু এত বড় মুখ করে ডাকছে। না গিয়ে কি পারি?শৌভিক যদিও ততোক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে পইপই নিষেধ করেই চলেছে। একদম গাড়লের মত কাজ যেন না করি। লক্ষী মেয়ের মত যেন অফিস যাই। তখনও পরিবর্তন দূরের স্বপ্ন মাত্র। ক্ষমতাসীন দল যদি জানতে পারে ২১শে জুলাই এএলসি অফিস করেনি,ঝামেলা হতে ও পারে। ভালবাসা আবার কবে এত সদুপদেশ শোনে?মুখে বললাম আচ্ছা। নেমে পড়লাম উলুবেড়িয়ায়। গোঁতাগুতি করে ট্রেনে উঠে নামলাম হাওড়া স্টেশনে। ঘড়িতে বেলা দশটা। অতঃকিম?এয়ারপোর্ট পৌছব কি করে?যেকটি বাস আছে, সারি সারি মৃত শহরের হর্ম্যরাজির  মত ঘুমন্ত। কয়েকজন উঠে বসে তো আছে, কিন্তু নড়েও না চড়েও না। আমিও উঠলাম। একঘন্টায় কয়েকগজ এগোল বটে বাস। তারপর জানিয়ে দিল আর যাবে না।
তখনও হাওড়া ব্রীজ অনেকটা। ইতিমধ্যে শুরু হল বৃষ্টি। সেকি বৃষ্টি তাকে আটকায় কেসিপালের সাধ্য কি? ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছাড়িয়ে উর্ধবশ্বাসে দৌড়চ্ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শৌভিকের অমৃতবাণী। কেন নামলি?কেন হাওড়া স্টেশন থেকে উল্টোদিকের বাস ধরে বাড়ি ফিরে গেলি না? কেন একঘন্টা ভোন্দুর মত বাসে বসে রইলি? কতদূর পৌছলি? বাপরে বাপ। এত হিসেবি হলে না তো প্রেম হয়, নাই অ্যাডভেঞ্চার। 
দুই কাঁধে দুটো ঝোলা আর হাতে ছাতা নিয়ে আধভেজা হয়ে হাঁটতে লাগলাম অগুনতি মানুষের ভিড়ে। দিব্যি এগোচ্ছিল ভিড়টা, আচমকা হাওড়া ব্রীজে উঠে থমকে গেল সব। যেন আচমকা নদীর বুকে ঘুর্ণি । একে ওকে গোঁত্তা মেরে এগিয়ে দেখি, হাওড়া ব্রীজের মাঝ বরাবর এক বিশাল ঘন্টা। ধাতব কিনা বুঝলাম না। ধাতব হলে তো বিশাল ভারি হবে। একটা চাকা লাগানো গাড়ির ওপর বসানো সামনে লেখা “মৃত্যু ঘন্টা। ” গাটা শিরশির করে উঠল--- কি যেন বলে? ফর হুম দা বেল টোলস্? তার জবাব ছিল শুধু মহাকালের গর্ভে।