Saturday, 21 April 2018

অনির সাপ্তাহিক ডাইরি, এপ্রিল, ২০১৮

অনির সাপ্তাহিক ডাইরি ১৬-২১শে এপ্রিল, ২০১৮
এবারের সাপ্তাহিক ডাইরি আমাদের মাসিকে নিয়ে।মাসি মানে মায়ের বোন নয় কিন্তু, তেনারা সকলেই সুশিক্ষিত সুচাকুরে, স্বাধীনচেতা, অত্যন্ত প্রগতিশীল মেহনতি নারী। চুপি চুপি বলে রাখি, এই অধমের নারীবাদী হবার মূল অনুপ্রেরণা, কোথাও না কোথাও আমার মা এবং তাঁর তিন বোন।যাই হোক, এই মাসি হল, আমাদের কাজের মাসি।সেই যে, সীতা ভ্রমে যাকে অপহরণ করতে বসেছিল ভিক্ষুক রূপী রাবণ (আশা করি এই বহুল প্রচারিত জোকটি, আপনাদেরও পরিচিত), সেই মাসি। ধরে নেওয়া যাক মাসির নাম- নমিতা।
সমস্ত কাজের মাসিদের যেসব গুণাবলী থেকে থাকে, আমাদের নমিতা মাসিও তার ব্যতিক্রম নয়। যেমন ধরুন ৩১শে ডিসেম্বর মধ্যরাত্রের ঘণ্টাধ্বনি মিলিয়ে যাবার আগেই, মাসির দাবী সনদ এসে পৌঁছায়,”বওদি, মাইনেটুকুন বাড়াতে হবে কিন্তু”। যেমন ধরুন প্রতিটি মেজে যাওয়া বাসনে মাসি হস্তাক্ষর রেখে যায়,আতশকাঁচ ছাড়াও দেখতে পাবেন, হয় এঁটো লেগে আছে, নয়তো সাবান।বলতে গেলেই অস্বীকার, আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে, গা মুচড়ে বলবে, “ বওদি, তুমিই খালি বল।“ শুধু কি তাই, মাসির কাজের সময় যদি শ্যেন দৃষ্টিতে নজর না রাখা হয়, তাহলে হয়তো মাসি, একটা ঘর ঝাঁটই দেয় না, বা জল না পাল্টে এক পুঁচকে বালতির জলে গোটা বাড়ি কাদা তকতকে করে মুছে দিয়ে পালায়। কাঁহাতক খিটিরখিটির করা যায়, আর তাছাড়া, নিরপেক্ষ ভাবে বলুন তো, কোন ওপরওয়ালা তার অধস্তন কর্মচারীকে নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকে? সুতরাং আমরা বহুদিন হাল ছেড়ে দিয়েছি, মাসিও মনের আনন্দে উত্তরোত্তর ফাঁকি মেরে যায়। তবে হ্যাঁ, মাসির নামে অসৎ হবার বদনাম, শত্রুও দিতে পারবে না, আর একটা বড় গুণ হল, মাসি ছুটি নেবার আগে জানিয়ে দেয়, এবং ঠিক যেদিন ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়, পৃথিবী উল্টে না গেলে, সেইদিনই মাসির প্রত্যাবর্তন ঘটে।
মাসির বাড়ি বনগাঁ, আপাতত এখানেই কোথাও বাড়ি ভাড়া করে থাকে, এক পশলা বৃষ্টিতেই মাসির ঘরে একহাঁটু জল জমে যায়। মাসে চারটে আবশ্যিক ছুটি ছাড়াও মাসি জলজমার ছুটি পায়। দিতেই হয়। মাসি বিধবা,একাই থাকে।আগে রান্নার কাজ করত, রোজগারও ভালোই হত, কিন্তু বর্তমানে শ্বেতীর প্রাবল্য বড়ই বেড়ে যাওয়ায়, আমাদের এই প্রগতিশীল ন্যুভেরিশ মহল্লায় মাসি আর রান্নার কাজ পায় না। অগত্যা ঘরমোছা-বাসনমাজা। তিনটি কন্যা, সকলেই মাসির মতে সুপাত্রস্থ।তাদের দায়ে-অদায়ে মাসি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়য়, অথচ বিগত চার বছরে, মাসির বিপদে কখনও কারোর টিকিও দেখিনি।একবার ভয়াবহ ফুড পয়জনিং-এ বেশ কিছুদিন ভোগার পর, দুর্বল শরীরে কাজে যোগ দিয়ে, কাঁদতে কাঁদতে মাসি বলেছিল, “কি করব বওদি, কাজ না কইরলে খাব কি? মুড়ি খেয়ে কাটিয়েছি বওদি চারদিন। আমার বড় মেয়ে পাশেই থাকে।এই কয়দিনে এক থালা ভাতও দিতি পারেনি জানো। রেঁধে আনতি গেছিল, ওর বর এক নাথি মেরে নর্দমায় ফেলে দিইছে।“প্রসঙ্গত মাসির বড় মেয়ে পাঁচ বাড়ি রান্না করে সংসার প্রতিপালন করে। বছর ত্রিশ পয়ত্রিশ বয়স, মাসির মতই সুরূপা, বেশ সুন্দরীই বলা চলে। আর জামাই রিক্সা টানে, তারপর চুল্লু খায়। মেয়েটির তুলনায় বেশ বয়স্ক দেখতে। বউ তার স্বীয় উপার্জন থেকে বাপের বাড়িতে কিছু দিতে গেলেই, নেশাগ্রস্ত পুরুষ সিংহ জেগে ওঠে। প্রায়ই মার খায় মেয়েটি, তবু পড়ে থাকে, “মেয়েজাত” পুরুষ অভিভাবক ছাড়া চলে নাকি?
যাই হোক, বছর খানেক আগের ঘটনা, কি কারণে সেদিন অফিস যাইনি।মাসি, এসেছে বাসন মাজতে, আচমকা মাসির ফোন বেজে উঠল, ফোন ধরে, মাসির সে কি চিৎকার, আর কান্না।আমরা দৌড়ে গেলাম, কি ব্যাপার? জুতো রাখার জায়গায় মাসি ধপ করে বসে পড়ে বুক চাপড়ে চাপড়ে কাঁদছে, “কি সব্বোনাশ হল বওদি আমার,”। যা শুনলাম, সাময়িক ভাবে আমারও গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল, মাসির মেজোজামাই বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে। উন্মত্ত হয়ে, জামাকাপড় খুলে গোটা বাড়িতে আস্ফালন করে বেড়াচ্ছে। নতুন কেনা কালার টিভি, ফ্রীজ, কাঁচের আলমারি, বাসনকোসন সব ভেঙে চুরমার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বউকে বেদম পিটিয়ে, বউয়ের কোল থেকে বছর ছয়েকের আতঙ্কিত শিশুকন্যাকে কেড়ে নিয়ে তুলে আছাড় মেরেছে।ঐ ভাঙচুরের মধ্যেই বাচ্ছাটা বমি এবং হিসি করে গোঙাচ্ছে, আর তার মা, পালিয়ে একটা ঘরের দরজা বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে ফিসফিস করে তার মাকে ফোন করছে।
শুনে প্রথমেই বললাম, আগে পাড়া প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজন কারো নম্বর থাকলে তাকে ফোন করে বলো ওদের উদ্ধার করতে, আর তুমি এখুনি যাও, মেয়ে আর নাতনীকে নিয়ে এস। আসার আগে, পুলিশে ডাইরি করিয়ে এসো। বড় জামাইয়ের নামেও এর আগে বহুবার থানায় জানাতে বলেছি, প্রতিবার মাসি বলে, “জামাইমানুস বওদি। অত দোষ ধইরতে নেই।তাইড়ে দিলে, বাচ্ছাকাচ্ছা নিই মেয়ে আমার যাবে কুথা? এই দেকো না, আমার বর ও তো, দা দিয়ে মারি আমার সামনের দাঁত গুলা ভেইনে দিইছিল, তাও তো তার শেষ নিশ্বাস অবধি তাইর সেবা আমিই করলাম বওদি।“ এবারে তেমন কোন জ্ঞান দেবার চেষ্টা করল না। দ্রুত হাতে মাসির ফোন ঘেঁটে, অনুরোধ মোতাবেক জনৈক প্রভাতের নাম্বার বার করে ফোনে ধরে দিলাম। শুনলাম, প্রভাত হল মেয়েটির ভাশুর। সে আশ্বাস দিল, সে দেখছে। মাসি চোখ মুছে, ফিরে গেল, এত রাতে মেয়ের বাড়ি যাওয়া অসম্ভব নাকি, সেই বনগাঁর ভিতর দিকে কোন আধা গ্রাম, তাই কাল সকালেই মাসি যাবে।
ছুটি এবং কিছু নগদ দিয়ে যাকে আগের রাতে বিদায় করলাম, পরদিন দেখি সে কাজে হাজির। যাওনি? মাসি বাসন মাজতে মাজতে বিষাদ মাখা কেজো সুরে বলল, “কি কওরবো বলো বওদি, আমার কি কম জ্বালা? পভাত জেতি নিষেধ কইরল যে।“ কে প্রভাত? ও মেয়ের ভাশুর? তা তার এত সাহস হয় কি করে? আর তুমিই বা তার কথা শুনে গেলে না কেন? মেয়ে আর বাচ্ছাটাকে যদি পাগলটা খুন করে?” কি কওরবো বল বওদি, পভাতের কাছে আমার অনেক টাকার দেনা আছি, বুঝেছো। সেবার বন্যায় আমাদের দ্যাশের বাড়ি ধবসি গেল, তারপর বরের চিকিচ্ছা, মেইয়েদের বিয়ে, খেপে খেপে প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার মত ধার এখনও শোধা বাকি। পভাত টাকা দিছিল এই শর্তে, যে ওর পাগল ভাইয়ের সাথে আমার বড় মেয়ের বিইয়ে দিতি হইবে।“ মানে? তুমি আগে থেকে জানতে পাগল? “ হ্যাঁ গো। এমনই ভালো ছেলে, বিএ- এমএ পাশ। অঙ্কের ছাত্রর পড়ায়। তবে মাথা বেগড়ি গেলেই এমন করে। পভাত তো নিজেও বড় অপিসার। বেরামপুরে থাকে।“ মানে? বহরমপুর থেকে সে বলল, সে দেখছে, বনগাঁয় কিভাবে সব ম্যানেজ করবে, আর তুমি গেলে না? “ হ্যাঁ বওদি, কাল সারা রাত শুধু কেইন্দেছি। আমার বড় মেয়েটা ঠিকই করছিল, যে পালিয়ে গিয়ে রিক্সাওলাকে বিয়ে করল। তখন পভাত বলল, তাহলে মেজোটার সাথে দিয়ে দাও। মেয়ে আমার বিয়ে করতে চায়নি বওদি। জামাইকে তো দেখতেও কুচ্ছিত।বুড়ো হাবড়া, সব চুল পেকি গেছে। এট্টাও দাঁত নেই। মেয়েটার আমার সবে ২৪ পুরোবে।“
তবে আবার কি? ফিরিয়ে নিয়ে এস। দেনার দায়ে, যে পাপ করেছ, প্রায়শ্চিত্ত কর। মাসির সেই এক কথা, আনলে খাবে কি? ভালো করে বোঝালাম,গতরে খেটে খাবে, তোমার মত। তোমার মাটির এক কামরার ঘরে ভাগাভাগি করে থাকবে, নিরাপদ তো থাকবে অন্তত। মাসি নিমরাজি হয়ে গেল, দিন চারেক বাদে একগাল হেসে ফিরে এল।“পভাত সব ঠিক করে দিয়েছে বওদি। নতুন টিভি, আলমারি কিনি দিইয়েছে,ওদের সংসার তো পভাতই টানে।“ আর পাগলাটা? “ও এখন ঠিক আছে।“ মেয়েকে আনলে না? “মেয়ে আসতে চাইল না বওদি। বলল, এরা আমার জীবন বরবাদ কইরছে, এত সহজে ছেড়ে দেব নাকি? পভাতকে বলেছে আমাকে বিয়ে করতে হবে তোমাকে।“ বাঃ। মধুরেন সমাপয়েতঃ। তা তোমার পভাত কি বলেছে? জবাব পেলাম, প্রভাত বলেছে, ভেবে পরে জানাবে। আপাতত, ভাইকে সামলে, লক্ষ্মী মেয়ের মত ঘরকন্যা করতে। কিন্তু প্রভাত তো ঐ বুড়োটার দাদা, অনেক বড় না, তোমার মেয়ের থেকে? মাসি, দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “পুরুষমানসের আবার বয়স আর চরিত্তির।“
কিছুদিন পর শুনলাম প্রভাত নাকি ভেবে চিন্তে জানিয়েছে, এই মুহূর্তে বিয়ে করতে অপারগ।আরো ভাই আছে, তাদের সংসারও প্রভাতকেই টানতে হয়, কাজেই- তবে সামনেই অবসর নেবার দিন আসছে, তখন ভেবে দেখবে। আপাতত কন্যা পাগলের সাথেই ঘরকন্যা করুক।
মাস ছয়েক আগে শুনলাম, মেয়েটি আসন্নপ্রসবা, মাসির লম্বা ছুটি চাই। শালীনতার সীমা অতিক্রম না করেই জানতে চাইলাম, এটা বৈবাহিক ধর্ষণের পরিণাম নয়তো? মাসি এমন হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যে বেশ বুঝলাম বৈবাহিক ধর্ষণ শব্দবন্ধটি মাসির একেবারেই অপরিচিত। চারটি রসকদম্ব নিয়ে ফিরে এল মাসি, নাতি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মাসি আবার ছুটির দরখাস্ত পেশ করল, নাতির মুখে ভাত। প্রভাত, বিশাল ধূমধাম করে অন্নপ্রাশন করছে ভাইপোর, সারা গ্রাম নিমন্ত্রিত। সোনার চেন দিয়ে মুখ দেখেছে, মাসি কি দেবে তাই নিয়ে মাসি ভয়ানক উদ্বিগ্ন ছিল, আংটি, জামা ইত্যাদি কেনার টাকাও প্রভাতই দিয়েছে।সম্ভবত ধার, মাসি নিজেও জানে না এখনও, সময়মত বলবে প্রভাত। দিলাম ছুটি, সবাই দিয়েছে। কাজ সেরে মাসি চলে যাচ্ছে, দরজা বন্ধ করতে গিয়ে শুনলাম মাসির ফোন বাজছে, মাসি ফোন ধরে উল্লসিত স্বরে বলছে, “কি গো পভাত? তোমার ছেলি কি কইরছে অ্যাঁ?খেলছে? হে হে হে......” ।

Thursday, 15 March 2018

আবোল তাবোল১৫/০৩/১৮


খুব ইচ্ছে করে, একদিন এমনি,রোজকার মত নাকে মুখে গুঁজে, দৌড়তে দৌড়তে ভিড় বাসে উঠে, ছুটতে ছুটতে জনা দুয়েক লোককে গোঁত্তা মেরে উল্টোডাঙা ফুট ব্রীজে উঠব- তারপর নামবে প্রকাণ্ড আলস্য। বিশাল হাই তুলে, সেঁটিয়ে দাঁড়াব রেলিং  এর সাথে। পিছনে ছুটে আসা,গোঁত্তা মারতে উদ্যত নিত্যযাত্রীটিকে ইশারায় বলব,“যা না ভাই। যা। এগিয়ে যা। ” আমার আজ আর জাস্ট যেতে ইচ্ছা করছে না। ফুটব্রীজের ওপর থেকে হাঁ করে দেখব, ধুলোমাখা মহানগরের ব্যস্ত জনজীবন। কেমন দৌড়চ্ছে সবাই দেখ-। শুধু দৌড়েই যাচ্ছে, আমার আজ কোথাও যাবার নেই, আমার আজ কিচ্ছু করার নেই। গুটগুট করে নেমে একটা ফাঁকা বাস ধরে,সোজ্-জা বাড়ি। চেনা কলিং বেলের আওয়াজে,তুত্তুরী যখন দরজা খুলবে- চিৎকার করে বলব“সারপ্রাইজ”। আজ শুধু মা আর মেয়ের দিন। বন্ধ কর-কলিংবেল আর মোবাইল ফোনের প্যাঁ পোঁ।

ভীষণ ইচ্ছে করে একদিন,নৈহাটী স্টেশনে নেমে আর লঞ্চ ঘাটের দিকে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ব না। বরং উল্টোদিকে দৌড়ে আবার উঠে পড়ব, শিয়ালদহ মুখী ফিরতি ট্রেনে। ভালো দেখে জানলার ধারে বসে, এক ঠোঙা খোলা শুদ্ধ বাদাম ভাজা কুটকুট করে খাব, আর তাজ্জব হয়ে দেখব অফিস টাইমের ব্যস্ততা। অত্যন্ত শ্লথগতিতে দৌড়াবে মস্তিষ্কের ঘোড়াগুলো- এতসব ছুটছে কোথায়?

খুব ইচ্ছে করে,একদিন দৌড়তে দৌড়তে লঞ্চঘাটে পৌঁছাব,কিন্তু লঞ্চে উঠব না। উন্মুক্ত জেটির ওপর খোলা আকাশের নীচে রৌদ্রস্নান করব, সামনে দিয়ে নূপুর পরে টুকটুক করে বয়ে যাবে ভরা জোয়ারের নদী। নদীর তো কোন ব্যস্ততা নেই। তাহলে সে যাচ্ছে কোথায়?দিনান্তে সবাই ঘরে ফেরে,তুই কেন ফিরিস না নদী? আহা তোর জন্য বুঝি কেউ উন্মুখ হয়ে নেই?অথবা আছে,তুই জানিস না। ফিরে যা নদী। একবার অন্তত ফিরে গিয়েই দেখ না-

খুব ইচ্ছে করে,একদিন,সাড়ে এগারোটায় ঢুকে সাড়ে বারোটায় জবাব পাঠাবার আব্দার নিয়ে আসা ইমেলের জবাবে , একটা প্রকাণ্ড জিভ কাটা, এক চোখ বন্ধ ইমোজী পাঠাতে। অ্যাল্
 
খুব ইচ্ছে করে,একদিন, চেয়ারটাকে পিছনে হেলিয়ে, টেবলের ওপর জোড়া পা তুলে চিৎকার করে গাইতে,“ আমি আজ হেড অফিসে পাঠাব না ফ্যাক্স------”।
একটাই ভয় যদি জুজু ফোন তোলে---

Tuesday, 27 February 2018


থাকি!আজও আশায় আশায় থাকি।
রাখি!শুধুই তোমার তরেই,রাতদুপুরে জানলা খুলে রাখি।
ফাঁকি! ভাবের ঘরে ম-স্-ত বড় ফাঁকি। 
বাকি?তোমার হিসাব মিলল কবেই, আমার যে সবই বাকি।

মন কেন যে শুধুই খোঁজে বিগড়ে যাবার বাহানা-
মন খারাপের সেই পলে যে শুধুই তোমার ঠিকানা।

Thursday, 22 February 2018

শৌভিক বাণী

“এবার মুখর করে দাও হে তোমার নীরব মোদী’রে”- শৌভিক বাণী অদ্য প্রাতে-

Thursday, 8 February 2018

"আই লাভ ইউ"-

- হ্যালো!
- হ্যাপি প্রোপজ ডে।
- (হাসি চেপে, ক্লান্ত স্বরে) এটা আবার কোথা থেকে শিখলে?
- আরেঃ সকাল থেকে দেখছি এফবি’তে।
- উফঃ তোমাকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়াটাই ঝকমারি হয়েছে দেখছি।
- সে তুই যাই বলিস, প্রোপজ মানে তো ঐ আই লাভ ইউ বলা, আমাকে জীবনে কেবল একজন পুরুষই আজ অবধি আই লাভ ইউ বলেছে, আর সেটা হল তুই।
- (হাসি চেপে) হুম!
- সত্যি বলছি, ছোট থেকে আমার কত শখ ছিল, যে কেউ বলবে-। কলেজ থেকে ফেরার সময় মাথা নিচু করেও হন্যে হয়ে খুঁজতাম, কেউ তো বলুক-। অন্য সব বান্ধবীদেরই কেউ না কেউ বললও আমায় কেউ কোনদিন বলল না জানিস। একে কালো, তায় বিশাল মোটা, তায় আবার মাথায় গুড়গুড় করছি। কার দায় কেঁদেছে আমায় ভালবাসতে?
- আঃ। আবার শুরু করলে? তোমাকে যথেষ্ট সুন্দর দেখতে মা-
- সেতো শুধু তুই বলেছিস বাবু, আর কেউ কোনদিন বলেনি।জ্যাঠাইমা- ঠাকুমা- কাকিমা সবাই মা-বাবাকে কথা শোনাত, ভয় দেখাত, কালো মেয়ের বিয়ে দিতে অনেক টাকা বর পণ দিতে হবে।
- ঐ জন্য আমি তোমার বাপের বাড়ির কাউকে দেখতে পারি না।
- পারার কথাও না। তোর মেয়ে বন্ধুগুলোর মত যদি আমার মনের জোর আর বাড়ির সাপোর্ট থাকত, তাহলে আমিও বলতাম, “মারো ঝাড়ু অমন বিয়ের মুখে।“ এরা যেদিন দেখতে গেল, বলল পছন্দ, তোর বাবাকে দেখে আমি কেমন বিগলিত হয়ে গেলাম। আহাঃ এই লোকটা! এই লোকটা বলবে, আই লাভ ইউ।
- ( হাসি আর চাপা গেল না) বাবা? বাবা বলবে? ওফ মা! তুমি পারোও বটে-
- কেন রে? বউ হয়ে বরের মুখে আই লাভ ইউ শুনতে চাওয়াটা কি অন্যায় আব্দার নাকি? তোর বাবার মুখেই তো শুনতে চেয়েছি,পাশের গ্যারাজের আনসার কাকুর মুখে তো নয়?
- হো- হো-হো। মা, ইউ আর টু ফানি।
- সেটাই তো বলবে বাপু। মাকেই তো জোকার বলবে- মা তো ক্লাউন। বিয়ের পর কটা মিষ্টি কথা বলেছে বল তো? কটা সিনেমা নিয়ে গেছে? হানিমুন গেছি কোথায়? না পুরী।সঙ্গে কে?শাশুড়ি, ভাশুর- জা। সেখানে গিয়েও রাঁধো- বাড়ো। এক সাথে সৈকতে বসে চারটে বাদাম ভাজাও খেতে পারিনি। সব জায়গায় তোর জেঠি, ঠাকুমা—কাবাবে হাড় হয়ে উপস্থিত।
- হুম।
- সত্যি কথা বলছি বাবু, তোর বাবারও যে আমাকে খুব একটা পছন্দ ছিল তা নয়।সারাদিন ব্যাঙ্কের কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফিরে, বই মুখে বসে পড়ত, আমি গিয়ে বসলে- দুটো কথা বলতে গেলে কি বিরক্তি।
- বাবা ঐ রকমই।
- আমিও তাই ভাবতাম রে বাবু। তারপর একদিন সত্যিটা জানতে পারলাম।
- কি সত্যি?
- তোর বাবার একজন প্রেমিকা ছিল। তোর বাবা সব আই লাভ ইউ তাকেই বলে বসেছে। আমার ভাগে কাঁচকলা- লবডঙ্কা।
- আঃ মা। সে বিয়ের আগে অমন প্রেমিকা সকলেরই থাকে। তুলতুলির আগেও তো আমার জীবনে রিঙ্কি ছিল—
- হ্যাঁ বাবা থাকে। তাকে কেউ হিসেবে ধরে না। কিন্তু ইনি বিয়ের আগেও ছিলেন-পরেও। ওনার স্বামী তোর বাবার ব্যাঙ্কেই কাজ করতেন, মারা যাবার পর উনি চাকরী পান। সেই সময় থেকেই দুজনের মাখোমাখো সম্পর্ক। মহিলারও একটা ছেলে ছিল, তাই উনি তোর বাবাকে বিয়ে করতে রাজি হননি।
- কি যা তা বলছ মা?আজ কেনই বা এইসব কথা বলছ?
- তোদের বাড়ির লোক সব জানত। ছেলের ঘাড় থেকে মহিলাকে নামাতেই আমার সাথে জবরদস্তি বিয়ে দেওয়া। বিয়ের পরও দুজনের সম্পর্ক অবিকৃত থেকে যায়।কি বোকা ছিলাম আমি। বুঝতেই পারিনি—খালি ভাবতাম লোকটা আমায় ভালো তো বাসে শুধু বলতে লজ্জা পায়।
- মাঃ।
-  আমি যখন জানতে পারি,  তোর বয়স পাঁচ। প্রচুর ঝগড়া করলাম, প্রচুর কাঁদলাম, তারপর বললাম, হয় আমি নয় ও। তোর বাবা নির্বিকার মুখে বলল, “ও থাকবে।তুমি দ্যাখো।“
- মা এসব কি?
- হ্যাঁ বাবা। তোর মনে আছে? একদিন তোতে আমাতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম, অনেকক্ষণ গড়ের মাঠে বসে রইলাম, আমি কাঁদছি আর তুই খেলছিস। কি আনন্দ তোর। মাঝে মাঝেই এসে আমায় জড়িয়ে ধরছিস।তোকে ছেড়ে মরার কথা ভাবতেও পারলাম না। ভাবলাম তোকে নিয়েই রেলে গলা দেব। টিকিট কেটে স্টেশনেও গেলাম, একটার পর একটা ট্রেন এল- সামনে দিয়ে চলেও গেল। রোদের তাত, সারাদিনের খালি পেট, তুই আমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলি, একবার করে রেললাইনের দিকে তাকাচ্ছিলাম, একবার করে তোর মুখের দিকে। পারলাম না জানিস। বড় ভীতু তোর মা, বাবা। মরতেও পারল না। বেশ বুঝলাম যাবার কোন জায়গা নেই, মাথা নিচু করে ফিরে গেলাম তোর বাবার কাছে।
- মা এসব কথা আমাকে কেন কোনদিন বলোনি-
- বলিনি বাবা, বলে কি হত? ভালোই তো ছিলাম তোতে –আমাতে। তোর বাবাকে সচেতন ভাবেই কেটে ফেলে দিয়েছিলাম- শুধু দায়িত্ব- কর্তব্যের কেজো সম্পর্কটুকু বাদে। তোকে নিয়ে বাঁচতে শিখলাম— তুই হয়ে উঠলি আমার সবথেকে বড় বন্ধু। তুই ই শেখালি নিজের শর্তে বাঁচতে, তোর কথাতেই হোম ডেলিভারির কাজ শুরু করলাম। তুই’ই বললি আমায়, “আই লাভ ইউ।“
- আই লাভ ইউ মা।
- তবে কেন বাবা, এই অসহায়, কালো মোটা বুড়িটাকে ছেড়ে মরতে যাচ্ছিস বাবা?
- মা! তুমি কি করে?
- আমি জানি বাবা, ডিভোর্সের পর আজ তোর প্রথম বিবাহবার্ষিকী। জানি তোর মন খুব খারাপ। বিশ্বাস কর, আমারও। সেই যে রিঙ্কি যখন তোর মন ভেঙেছিল, কত অভিশাপ দিয়েছিলাম রিঙ্কিকে মনে পড়ে?ভাগ্যিস ও শোনেনি। আজকাল যখন বাজারে দেখা হয়, আর পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে বলে, “কেমন আছো কাকিমা?” এত লজ্জা করে কি বলব।
- সে সব কিছু নয় মা। আমি ঠিক আছি।
- না বাবা। তুই ঠিক নেই। সকাল বেলা যখন তোর আর তুলতুলির বিয়ের ছবি গুলো আবার দিলি তখন থেকেই ভয় পাচ্ছিলাম। আর একটু আগের স্ট্যাটাসটা—
- মাঃ
- কেন বাবা? কেন? তুলতুলি অন্য কাউকে ভালোবেসেছে, তোকে ছেড়ে অন্য কারো হাত ধরেছে এটাই বড় হয়ে গেল বাবা? আর এই বুড়ি যে সারাজীবন তোকেই ভালোবেসে গেল- তার বুঝি কোন দাম নেই?
- মা আমি কিছু বুঝতে পারছি না। নিজেকে বড় ছিবড়ে মনে হচ্ছে। বেঁচে থাকার কোন কারণই খুঁজে পাচ্ছি না মা। নিজেকে ফেলিওর মনে হচ্ছে-
- আমি যে তোকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না বাবা। আমি যে তোর সাথে মরতেও পারব না বাবা। তোর মা টা যে বড় ভীতু বাবা। এই বুড়িটার জন্যই না হয়, একটু চেষ্টা কর না বাবা? কেউ তোকে একদিন পছন্দ করত, আজ আর করে না, তার মানে কি তুই ফ্যালনা হয়ে গেলি বাবা? এতদিন ধরে যে নিজের পরিচয় বানালি, এত বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী সব কি রাতারাতি অর্থহীন হয়ে যেতে পারে? এটা শুধু একটা খারাপ সময়, শনির দশা বলতে পারিস। কেটে যাবে। খুব তাড়াতাড়ি কেটে যাবে। আর যদি নাও কাটে, তুই অভ্যস্ত হয়ে পড়বি। যেমন আমি তোর বাবার সাথে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সময় সব ঘা সারিয়ে দেয় বাবা।
- বলছ মা?
- হ্যাঁ বাবা। যেমন পরীক্ষা এলেই ভয়ে তোর জ্বর আসত, আর পেট কনকন করত। তারপর আমার বুলি শুনে, সব জ্বর- পেট ব্যথা ঝেড়ে ফেলে পরীক্ষা দিতে যেতিস, আর রেজাল্ট বেরোলে এক গাল হেসে বলতিস, “ভাগ্যিস তোমার কথা শুনেছিলাম মা”, তেমনি  এবার ওঠ। উঠে দুটো সিদ্ধ ভাত বসা, গরম গরম দুটো ভাত পেটে পড়লেই সব মৃত্যু বিলাসিতা জানলা গলে পালাবে।কালই গিয়ে কটা দিন ছুটির দরখাস্ত দে, আমার কাছে এসে দুটো দিন থাকত বাপু।
- আই লাভ ইউ মা।
-  কি যেন বলিস তোরা, (একটু লজ্জা লজ্জা গলায়) আই লাভ ইউ টু বাবু।

বইমেলার কবিতা


দেখা হয়ে গেল বইমেলাতে। সেই বহু পরিচিত, দেখেও না দেখা নাক উঁচু ভাব করে চলে যাচ্ছিল। বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। আচ্ছা আমিই না হয় আগে নত হলাম। নির্ঘাত ভাবল কি গায়ে পড়া মেয়ে রে বাবা।  জিজ্ঞেস করলাম,“তুমি এখানে?” থমকে গেল, পলকের জন্য মুখ থেকে খসে পড়ল বিজ্ঞের মুখোশ।হতভম্বের মত বলল,“কেন আমি বই পড়ি না?” বললাম,“ না মানে ঐ যে কি সব ট্যাব,কিণ্ডল- পিডিএফ ঐ সব পড় বোধহয়।  তাই-”। কোন জবাব দিল না। চোখের দৃষ্টিতে মৃদু ধমক যে দিল বেশ বুঝলাম।চলে যাবে কি এখুনি? আবার অচেনা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল হৃদয়। মন চিৎকার করে উঠল, আরও কিছুক্ষণ না হয় রইলে কাছে--। শুনতে যে পেল না সেও বুঝলাম। মুখ বন্ধ ছিল যে।
আজ আর কিছুতেই কথার স্রোতকে থামতে দিতে চাই না। তাই বললাম,“ তোমার সেই ডাস্ট এলার্জি?সেরে গেছে বুঝি?” জবাবে ভ্রু কুঁচকে বলল,“কমোনি তো দেখছি এক ছটাকও। ” মোটা বলল বুঝি, রাগ হল না তো?হৃদয়ের বেদনা যেন কিছুটা উপশম হল, বললাম,“নাঃ কমিনি। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বরং বেড়েই গেছি। ” হাল্কা হাসির রোদ খেলে গেল কি দাড়িগোঁফের জঙ্গলে? সুযোগ বুঝে বললাম,“একটা সেল্ফি?” বলল,“সেল্ফাইটিস্ টাও বেড়েছে দেখছি।” বলতে পারলাম না,“কয়েদ করে রাখতে চাই এই মুহূর্তটাকে। যেমন রেখেছি তোমার সঙ্গে কাটানো আরো অজস্র মুহূর্ত।" বলতে পারলাম না, একদলা কষ্ট কোথা থেকে এসে চেপে ধরল বুক আর গলা। ছলছলে চোখকে অন্যদিকে ঘোরালাম, ধরা পড়তে চাই না। কিছুতেই না। সূর্য কি পশ্চিমে ঢলে পড়ল খানিকটা? এখনও একটাও বই কেনা হয়নি। তার হাত ও খালি। এবার যেতে হয় এবং যেতে দিতেও হবে। মন বলল,“ভালো থেকো। ” আর সে? সে বলল,“চলো তোমার ছবিটা তুলে নি”। হাসলাম দুজনেই। ক্যামেরার সামনে হাসতে হয় তো। শাটার বন্ধের সাথে সাথেই কি নেমে আসবে নিশ্ছিদ্র  অমানিশা?না কি সব নিয়ম ভেঙেচুরে দুমড়ে মুচড়ে উল্টোদিকে দৌড়বে পৃথিবী?

Saturday, 13 January 2018

অনাির ডাইরি

অনির ডাইরি, ১১ই এপ্রিল,২০১৮
এলেখা তাঁদের জন্য নয়,যাঁরা প্রতিনিয়ত আলস্য ভরে পোস্ট দেন, “আমি নারীবাদী নই। আমি সাম্য বাদী। ওসব নারীবাদ হল আসলে ‘নারী বদ’। বদ মেয়েদের স্বেচ্ছাচারিতা। ” এলেখা বাকি আণুবীক্ষণিক পাঠকের জন্য। নিয়ম করে কন্যাভ্রুণ হত্যার খবর যাদের কপালে ভাঁজ ফেলে, পার্কস্ট্রীট থেকে দিল্লী হয়ে, বারাসাত থেকে বদায়ুঁন হয়ে কামদুনী ঘুরে যারা উন্নাও এর অন্ধকারে হারিয়ে যান,গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছা করে,অথচ কি বলবেন বুঝতে পারেন না।  এ লেখা শুধুই তাদের জন্য। 
দুহাজারের প্রথম দশকের প্রথমার্ধ, কেবল্ টিভির সদ্য অনুপ্রবেশ ঘটেছে আমাদের তিনজনের সাতরঙা সংসারে। কেবল্ মানেই সারাদিন খবর, কেবল্ মানে পৃথিবীর সবখেলার লাইভ ফিড, কেবল্ মানেই সোনি, Zee, স্টারপ্লাস, সর্বোপরি কেবল্ মানে এইচবিও। ছুতোনাতা পেলেই, ঘর অন্ধকার করে টিভি খুলে বসে যাওয়া। কত সিনেমা যে মাঝখান থেকে দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই।

এইচবিওতেই তাদের সঙ্গে পরিচয়, মিনার্ভা, প্যাট্রিয়া, ডিডি এবং মারিয়া মিরাব্যাল। চার বোন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের এক পুঁচকে দেশ ডোমিনিকান রিপাবলিকের বাসিন্দা। শহরতলী নয় আদতে গ্রাম “ওহো ডি আগুয়া”,সেখানেই মিরাব্যালদের বিশাল খামারবাড়ি। প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে কেটেছে তাদের শৈশব। কৈশোরের দরজায় কড়া নাড়তে না নাড়তেই নিস্তরঙ্গ খামারে ঝড় তুলল মিনার্ভা। বড়ই কটু তথা স্পষ্টভাষীনি সে, মেয়ে বলে কি লেখাপড়া শিখব না নাকি? বাবার বড় আদরের মির্নার্ভা বড় জেদী, গোঁ ধরে বসে রইল, অবশেষে রাজি হয়ে গেলেন প্রৌঢ় এনরিক। মিনার্ভা, ডিডি আর মারিয়া পাঁচ বছরের জন্য ভর্তি হল দামী আবাসিক স্কুলে।ভুঁইফোঁড় নাটুকে মিনার্ভা সেখানেও সর্দারনী, সেবার স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সম্মানীয় অথিতি, মাননীয় রাফায়েল ট্রুহিজো। ১৯৩০ এর দশক থেকে ৬০ এর দশক পর্যন্ত ডোমিনিকান রিপাবলিকে একচ্ছত্র একনায়ক। তৎকালীন চার্চ থেকে ইন্টেলিজেন্সিয়া, ভূস্বামী থেকে গণমাধ্যম -সমস্তই ছিল ওণার পোষা সারমেয়তুল্য। ট্রুহিজোর দীর্ঘ শাসনের একটাই মন্ত্র ছিল,বিরোধীশূণ্যতা। প্রতিবাদী কণ্ঠ শুধু চেপে দেওয়া নয়, ঘ্যাচাং ফু।
তো এ হেন ট্রুহিজোর বড়ই মনে ধরল নাটুকে স্পষ্টভাষী ন্যাকামি বিবর্জিত মিনার্ভাকে। মিনার্ভার ডার্ক চকলেট রঙা ত্বক, উস্কোখুস্কো একরাশ চুল, ঋজু মেরুদণ্ড বড়ই চিত্তাকর্ষক। মিনার্ভার মনে তখন অন্য স্বপ্ন। স্কুল থেকে বেরিয়ে মোটেই সু-কন্যার মত বিয়ের পিঁড়িতে বসতে আগ্রহী নয় মিনার্ভা। তার স্বপ্ন ওকালতি। আইন পড়তে চায় মিনার্ভা। কিন্তু দেশের আইনে মেয়েদের আইন পড়া নিষেধ। অনুমতি দিতে পারেন কেবল ট্রুহিজো। মিরাব্যাল পরিবারকে চমকে দিয়ে আচমকা একদিন এক নিমন্ত্রণ পত্র এসে হাজির। নিমন্ত্রণকর্তা ট্রুহিজো স্বয়ং। এনরিক মিরাব্যাল কাঁপতে কাঁপতে স্ত্রী এবং চার কন্যা সহ পৌঁছলেন ট্রুহিজোর প্রাসাদে। বিশাল বল রুম, অসংখ্য নৃত্যরত জুটি,মিনার্ভার সাথে নাচতে নামলেন বৃদ্ধ ট্রুহিজো স্বয়ং। নাচতে নাচতে ফিসফিস করে নিজের মনের ইচ্ছা ট্রুহিজোকে জানিয়ে আইন পড়ার অনুমতি চাইল মিনার্ভা। জবাব এল “না। ” শুধু তাই নয়, সামান্য অসভ্যতাও করে ফেললেন সর্বশক্তিধর ট্রুহিজো। ফলাফল কল্পনারও অতীত, এইটুকু চাষীর মেয়ে মিনার্ভা সাঁটিয়ে কষাল এক চড়। অতঃপর? যাকে বলে “পিনড্রপ সাইলেন্স”। মিরাব্যাল পরিবার দৌড়ে এল মিনার্ভার পাশে। যাইহোক মিটিয়ে নিলেন ট্রুহিজো, কোথাও ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। নিরাপদে বাঘের ডেরা থেকে বেরিয়ে এল মিরাব্যালেরা।
বাড়ি ফিরে মিনার্ভার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তার মা। আহাঃ অত বড়া আদমি, নাহয় একটু ইয়ে করেছে, তাই বলে প্রকাশ্যে গায়ে চড়? দেখো এর পরিণাম কি দাঁড়ায়?(চেনা চেনা লাগছে কি?)
পরের দিনই এনরিক মিরাব্যালকে তুলে নিয়ে গেল ট্রুহিজোর পুলিশ। চার বোন আর বৃদ্ধা মা দৌড়ে বেড়ায় এই জেল থেকে সেই থানা, কেউ জানে না বৃদ্ধ কোথায়। খাতায় কলমে তাকে কেউ গ্রেপ্তার করেনি! ট্রুহিজোর প্রাসাদে আবার গিয়ে হাজির মিনার্ভা। বাবাকে ফিরিয়ে দিন। ক্রুর হেসে ট্রুহিজো বলল, দিতেই পারি, বদলে থেকে যাও আমার যৌনদাসী হিসাবে। শিকারকে জালে আটকে নির্মল হেসে ট্রুহিজো বললেন,“এসো পাশা খেলি। আমি জিতলে তো জানোই-আর তুমি জিতলে? তোমায় আমি নিরাপদে যেতে দেব। মুক্তি পাবে তোমার বাবা। চলো তোমাকে আইন পড়ার অনুমতিও দেব। ” হল খেলা। বিজয়ী মিনার্ভা। বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ তেরাত্রি পোহালো না। অকথ্য অত্যাচারে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এনরিকের শরীর এবং মন। শেষ নিশ্বাসটুকু শুধু আটকে রেখেছিলেন প্রিয়জনেদের সান্নিধ্যের আর্ত প্রতীক্ষায়।
পিতাকে কবর দেবার মাঝেই পুলিশের হাতে আইন পড়ার অনুমতি পাঠালো ট্রুহিজো। অন্য নারী হলে হয়তো এত বড় অপমানে ভেঙে পড়ত। মিনার্ভা অন্য ধাতুতে তৈরি। ট্রুহিজোর প্রতি তীব্র ঘৃণার আগুনে বাতাস দিয়ে  ল স্কুলে ভর্তি হল মিনার্ভা। অচীরেই ট্রুহিজো বিরোধী প্রতিবাদী রাজনীতির মুখ হয়ে দাঁড়াল মিনার্ভা মিরাব্যাল। যাকে স্থানীয় ভাষায় অনুগামী তথা অনুরাগীরা বলত, ম্যারিপোযা। স্প্যানিশ ভাষায় প্রজাপতি।
এই ডোমিনিকান প্রজাপতিকে শেষ পর্যন্ত যদিও ডিগ্রীটা দেয়নি ট্রুহিজো, অন্তিম অধিবেশনে,সর্বসমক্ষে মিনার্ভার ডিগ্রীটা ছিঁড়ে ফেলে দেন তিনি,মেয়েমানুষ বলে কথা, পড়ার অনুমতি দিয়েছি,ডিগ্রী দেবার তো কথা ছিল না।
এরপর শুরু হয়,ট্রুহিজো বনাম প্রজাপতিদের দীর্ঘ অসম লড়াই। একদল সশস্ত্র তথা ধনী অন্যদল নির্ধন তথা নির্বল। এরই মাঝে বিয়ে হয় প্রজাপতিদের, সমমার্গের বিদ্রোহীদেরই বিবাহ করে মিরাব্যাল বোনেরা। সন্তানসন্ততি হয়। সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে পালা করে জেলে যাওয়া। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে জেলে ঢোকানো হয় মিনার্ভা, তার বোন এবং তাদের স্বামীদের। মিনার্ভার চরিত্রে মাতাল করা অভিনয় করেছিলেন সালমা হায়েক।

একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে,জেলে আছে মিনার্ভা, স্বামী তথা সদ্যোজাত সন্তানকে ছেড়ে থাকার বেদনায় দ্রবীভূত। মিনার্ভার সেই মানসিক শক্তি আজ শুধু গল্পকথা। ছোট ছোট করে কাটা চুলে উকুনের বাস,নোংরা আলখাল্লার ওপর দিয়ে থেকে ঘসঘস্ করে গা চুলকাচ্ছে মিনার্ভা, শারীরিক মানসিক অত্যাচারে মানসিক রোগীতে পরিণত হতে আর বেশী দেরী নেই, এমন সময়, সেলের ঘুপচি জানলা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন, দূরে কে যেন কচি হাতে কাগজ জুড়ে বানিয়েছে এক কাঁচা প্রজাপতি, পতপত করে পাখা মেলে উড়ছে নীল আকাশে। ফিরে এস ম্যারিপোযা, ফিরে এস প্রজাপতি।

এর বেশ কিছু বছর বাদে হঠাৎই একদিন মিনার্ভার বাড়ি উপস্থিত হলেন ট্রুহিজো। কেমন আছো মিনার্ভা? নাকি প্রজাপতি বলে ডাকব তোমায়? সেই মুহূর্তে মিনার্ভার পাগল পাগল দশা। দীর্ঘদিন ধরে বর,একবোন এবং ভগ্নীপতিদের খোঁজ নেই। লড়াই করার শক্তি নিঃশেষিত। মিনার্ভা অনুরোধ করল, ওদের ছেড়ে দিন। ট্রুহিজো একগাল হেসে বলল, অবশ্যই, এবার তোমার সব দুখের রাতি পোহালো।তোমায় মুক্তি দিলাম যাও।
তিন মিরাব্যাল বোনকে অনুমতি দেওয়া হল, জেলে গিয়ে নিজেদের বর এবং বন্দিনী ছোট বোনের সাথে সাক্ষাৎ করার। সাক্ষাৎ করে হৃষ্ট চিত্তে বাড়ি ফিরছিল তিনবোন,আচমকা রাস্তার ওপর ঘিরে ধরল একপাল লোক। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল জঙ্গলে- তারপর? পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল তিন তিনটে প্রজাপতিকে। দিনটি ছিল ২৫শে মে ১৯৬০।
শোনা যায় প্রজাপতিদের মৃত্যুর পর বেশীদিন বাঁচেনি ট্রুহিজোর একনায়কত্ব। দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবের কাছে পরাস্ত হয় ট্রুহিজো। মিনার্ভার মৃত্যুর সাত মাসের মাথায় উন্মত্ত জনতা ঘিরে ধরে কুকুরের মত গুলি করে মারে ট্রুহিজোকে।
২৫শে নভেম্বর যেদিন পিটিয়ে মারা হয়েছিল তিন বিদ্রোহী “নারী বদ”কে,সেই দিনটিকে রাষ্ট্রসংঘ পালন করে, “ডে ফর এলিমিনেশন অব ভায়োলেন্স এগেন্স্ট উইমেন”। উন্নাও এর সাথে তো ডোমিনিকান রিপাবলিকের তো কোন মিল নেই,তবু কাগজ খুললেই কেন বারবার প্রজাপতিদের কথা মনে পড়ছে বলুন তো? কেন মন চাইছে, আর একটি বার,  ফিরে আসুন ম্যারিপোযা

অনির ডাইরি ৪ঠা এপ্রিল, ২০১৮
কার মুখ দেখে  যে সেদিন বেরিয়েছিলাম, দৌড়তে দৌড়তে বিধাননগর স্টেশনে পৌঁছে দেখি, চোখের সামনে দিয়ে কল্যাণী লোকাল বেরিয়ে গেল। ভারতীয় রেলের কাছে এহেন  নিয়মানুবর্তিতা এক্কেবারেই কাম্য নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট দশ পরে যেখানে ট্রেনের আগমন বার্তা ঘোষিত হওয়াই দস্তুর, সেখানে এভাবে এপ্রিল বোকা বানানোর কোন মানে হয়? 
অথচ দেখুন পরের ট্রেনটির কাছে এই ব্যতিক্রমী নিয়মানুবর্তিতা আশা করে, কি সুন্দর ঠকে গেলাম। তিনি যথারীতি স্বমহিমায় ১৫মিনিট লেটে ঢুকলেন। শুধু কি তাই? গোদের ওপর বিষফোঁড়া মার্কা পিত্তি জ্বালিয়ে, গুটি কয় ষ্টেশন দৌড়েই দাঁড়িয়ে পড়লেন। দাঁড়ালেন তো দাঁড়িয়েই রইলেন, যাকে বলে নট নড়ন চড়ন, নট কিচ্ছু। ঘটিগরমের মত মুচমুচে হাতেগরম গুজবের মাঝেই গমগমিয়ে উঠল, ঘোষকের কেজো স্বর, “সোদপুর স্টেশনে অবরোধের জন্য আপ এবং ডাউনের সমস্ত গাড়ি চলাচল আপাতত বন্ধ।“
অবরোধে ট্রেনে আটকে পড়ার অভিজ্ঞতা আমার নতুন নয়। জীবনের প্রথম অবরোধে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা আমৃত্যু ভুলব না। হাওড়া খড়গপুর লাইনে, ক্ষীরাই আর হাউর নামক দুই ষ্টেশনের মাঝে আটকে ছিলাম আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। ভরা গ্রীষ্ম। সকাল ৮টা ১৩ এর মেদিনীপুর লোকাল,পাঁশকুড়া স্টেশনে অধিকাংশ যাত্রী নামিয়ে তুলনামূলক ফাঁকা হয়ে, সবে ক্ষীরাই পেরিয়েছে, দুপাশে জনমানব বর্জিত এক্কেবারে মাতাল করা ঘন সবুজ ধান ক্ষেত, বিশাল বিশাল নারকেল আর অশ্বত্থ গাছের সারি, টলটলে নয়ানজুলী, দূরে ধান ক্ষেতে চুমু খাওয়া ঝকঝকে গ্রীষ্মের নীলাকাশ আর “তাহারই মাঝখানে” আমাদের থমকে যাওয়া ট্রেন।
সমস্ত কবি কবি ভাব মুহূর্তে উধাও, চৈত্রের দাবদাহ কি বস্তু হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। জানলা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে এল আগুনে পবন, চাঁদিফাটা রোদে পলকে লোহার তৈরি লেডিজ কামরা পরিণত হল তপ্ত তন্দুরে। ঘণ্টা খানেক আটকে থাকার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল ফ্যানগুলো। এই ভাবে আরো দেড়-দুই ঘণ্টা টিকে থাকা আমাদের মত নিত্যযাত্রীদের পক্ষেই ছিল মোটামুটি ছোটখাটো নরকবাসের সমতুল, তাহলে কল্পনা করুন বাচ্ছা আর বয়স্কাদের অবস্থা সেদিন কি হয়েছিল।ক্রন্দনরত অভুক্ত তৃষ্ণার্ত বাচ্ছা কোলে মায়েদের ডুকরে ডুকরে কান্না অনেকদিন ভুলতে পারিনি।একটা হকার নেই, গোটা কামরায় একফোঁটা খাবার জল নেই- আজও মনে আছে, বিএসএনএলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়তি কাকিমা দরজার কাছে গিয়ে চিৎকার করে সামনের কামরার পুরুষ যাত্রীদের কাছে খাবার এবং জল চাইছিলেন অসুস্থ সহযাত্রীদের জন্য আর নির্বিচারে গালি বর্ষণ করছিলেন অবরোধকারীদের উদ্দেশ্যে, “মর, মর, মর হারামজাদারা ওলাউঠো হয়ে মর,অবরোধ করার শখ যেন তোদের জম্মের মত ঘুচে যায়”।
যাই হোক ফিরে আসি ৪ তারিখের নৈহাটি লোকালে, ঘাপটি মেরে বসেছিলাম। পরিস্থিতি অতোটাও খারাপ নয় এযাত্রায়। এক বয়স্ক মাসীমা যদিও যে ভাষায় অবরোধকারীদের গালমন্দ করছিলেন, খড়গপুরের নিয়তি কাকিমার কথা মনে পড়ে গেল। অজান্তেই বোধহয় ওষ্ঠে হাসির রেখা খেলে গিয়েছিল, উল্টোদিকের সহযাত্রীনীও দেখলাম হেসে উঠলেন। কি ব্যাপার? ঘোষকের মিহি কন্ঠ আবার সরব হয়েছে, “অনুগ্রহ করে শুনবেন, আমরা এখনও সোদপুর ষ্টেশনের সাথে যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি। ট্রেন কখন ছাড়বে এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।“ সিরিয়াসলি? সোয়া ঘণ্টায় অবরোধ ওঠা দূরের কথা, বলে কি সোদপুরের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না? পাশের মাসীমা আরো উচ্চকিত স্বরে খিস্তি মারতে লাগলেন,”কেন রে হতচ্ছাড়ারা? তোদের মোবাইল নেই? যোগাযোগ করতে পারছ না? ইয়ার্কি? আরে আমি এই বেতো পায়ে হেঁটে কুড়ি মিনিটে সোদপুর পৌঁছে যাব, আর  তোরা এখনও যোগাযোগ করতে পারলিনা? মার না। মেরে হঠিয়ে দে...।“ কি ভাবে মারতে হবে, কোথায় কোথায় ডাণ্ডা মারলেই আপদ অবরোধকারীরা পলকে ঠান্ডা হয়ে যাবে, নিপুন ভাবে তার বর্ণনা করছিলেন মাসীমা, হাসি চাপা দায়। উল্টো দিকের সৌম্যদর্শনা সহযাত্রীটি পেশায় অধ্যাপিকা। সেভাবে পরিচয় না থাকলেও মুখ চেনা।বয়সে আমাদের থেকে একটু বড়ই হবেন। একেবারেই পরিচর্যাহীন দোহারা চেহারা। টুকটাক গল্প করছিলাম দুজনে,ঘড়ির কাঁটা পাক্কা মধ্যাহ্ন অতিক্রম করার পর ট্রেন ছাড়ল। উনি হতাশ স্বরে বললেন, “কাল আর আসতে ইচ্ছে করবে বলো?” বললাম, আসবেন না। জবাবে উনি বললেন, প্রিন্সিপালটা এক নম্বরের হারামির হাতবাক্স। তার বউ বছর কয়েক আগে, কার সাথে ভেগে যাওয়ার পর থেকে, হেডু নাকি মহিলাদের সহ্য করতে পারেন না। ছুটি চাইলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠেন। আশ্চর্য হলাম না, দীর্ঘ ডেইলি প্যাসেঞ্জারির অভিজ্ঞতা থেকে জানি, যাবতীয় শিক্ষিকা বা অধ্যাপিকাদের যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সবথেকে বড় হারামি কে? জবাব পাবেন, তাঁদের স্কুল বা কলেজের হেডু। বুঝলাম ইনিও তার ব্যতিক্রম নন। তবু আলোচনাকে লঘূ করার জন্যই বললাম, বলবেন ইয়ে মানে পেট ব্যথা করছে, এইটা বললে, মেয়েরা সাধারণত ছুটি পেয়েই যায়, এবং ওপরওয়ালা পুরুষ হলে আর কোন প্রশ্নও করেন না।
উনি একগাল হেসে বললেন, “আমার ওসব বহুদিন অপারেশন করে বাদ দেওয়া হয়েছে। কাজেই ইয়ে বললে, আমার নিস্তার নেই।“ এই জবাব আশা করিনি, তাই চুপ করে রইলাম। উনি আনমনে বললেন, “তাছাড়া ডিভোর্সের ব্যাপার ছিল, তাই এমনি বেশ কিছু ছুটি নিতে হয়েছে। বাড়ি পাল্টালাম, আবার ছুটি নিলাম, কত আর দেবে বলো না?” ডিভোর্স? বাসা বদল? শুনে আর সামলাতে পারলাম না, কেন? জানি অনধিকার প্রবেশ তবু প্রশ্ন করেই ফেললাম, কেন? জরায়ু বাদ যাবার জন্য? উনি হাসলেন। মাপ চাইতে যাব, তার আগেই উনি বললেন, “হ্যাঁ। আবার কি?সমাজের চোখে, একটা মেয়ের জরায়ু বাদ যাওয়া মানে তার নারীত্বের অবসান। বিশেষ করে, সেই নারী যদি বাঁজা হয়।“ খট করে কানে লাগল কথা গুলো। আমার নারীবাদী স্বভাব প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল, উনি আনমনা হয়ে বললেন, “আমি এসব মানি না। দিব্যি ছিলাম, দুজনে। কেউই বাচ্ছা চাইনি। এই নিয়ে আমাদের কোন দুঃখবোধও ছিল না। কিন্তু জরায়ু বাদ যাবার পর কি নাটক, কি নাটক! শাশুড়ি, ননদের কান্নাকাটি। কেন আমার মত একজন অসম্পূর্ণ নারী ওদের ছেলের জীবন বরবাদ করছি। বর বলল, একটা বাচ্ছা দত্তক নি চল। তাতেও শাশুড়ী মায়ের আপত্তি, বংশের রক্ত চাই। অজানা অজাত, কুজাতের বাচ্ছাকে উনি বাড়িতে ঢুকতেও দেবেন না। ভাবো? ননদ বলল, ‘তুই চলে যা। দাদাকে ডিভোর্স দে, তোর লজ্জা করে না, দাদার তো কোন দোষ নেই। ওর তো সন্তানের মুখ দেখার অধিকার আছে। দাদা আবার বিয়ে করুক। ওকে কিসের জন্য ফাঁসিয়ে রেখেছিস? টাকার জন্য?’ আরেঃ তোর দাদার টাকায় আমি ইয়ে করি। আমার বেতনের পয়সাই আমি শেষ করে উঠতে পারি না, তো বরের পয়সা ধুয়ে কি জল খাব? মরুক গে। কলেজে এসে একদিন নাটক করে গেল, কান্নাকাটি, শেষে বিরক্ত হয়ে বরকে বললাম, চলো, ডিভোর্স করি।“ জানলা দিয়ে ছুটে এল এক ঝলক গরম হাওয়া। কি বলি বুঝতে না পেরে, নীরব রইলাম। উনি রুমালে মুখটা মুছলেন, তারপর ক্লান্ত স্বরে শুরু করলেন, “বরটাও ছিল তেমনি, কিছুতেই ছাড়বে না। কান্নাকাটি,কত নাটক, বাপরে বাপ। পুরুষ মানুষ কাঁদলে আমার ভীষণ রাগ হয়। কাঁদবি কেন? পরিস্থিতির মোকাবিলা কর। সরে এলাম। ডিভোর্সের নোটিশ পাঠালাম জেদ করেই। মাস খানেক বাবার বাড়িতে ছিলাম, তারপর এক কামরার ফ্ল্যাট কিনে উঠে এসেছি সদ্য। বছর ঘুরতে চলল, বরটা এখনও একটা বিয়ে করে উঠতে পারল না। অপদার্থ। মেয়েও মনে হয় আমাকেই খুঁজতে হবে, নাহলে ওর ধান্ধা আমি জানি, মা মরলেই, আমার গলায় ঝুলে পড়বে।“
নৈহাটিতে যখন নামলাম ঘড়ির কাঁটা পৌনে একটার ঘরে,ঐ প্রসঙ্গ বাদে অন্য গল্প করছিলাম আমরা, উনি তরল গলায় বললেন, “ভালো মেয়ে থাকলে বোল তো, বরের বিয়ে দেব।“ উদ্গত হাসি চেপে বললাম, “জতুগৃহ পড়েছো? “
(সাপ্তাহিক ডাইরি পর্ব ২)

অনির ডাইরি ২রা এপ্রিল ২০১৮
এবার থেকে ঠিক করেছি অনির সাপ্তাহিক  ডাইরি লিখব। কি করি? সারা সপ্তাহটা কেমন যেন হুস্ করে উড়ে যায় এক পলকে। আগে তবু
ফেরার পথে নৈহাটী লোকালে বসে একটু আধটু লেখালিখি করতাম,এখন সে গুড়ে বালি। একে তো নির্মিয়মান ব্যাণ্ডেল-হালিশহর রেললাইনের দৌলতে মেন লাইনের ট্রেনগুলিতে ভয়ানক গণ্ডোগোল চলছে,তারওপর কথায় কথায় অবরোধ এলাইনের নিত্যঘটনা। সর্বোপরি লেডিজ কম্পার্টমেন্টে গুটিকয় বন্ধুবান্ধব জুটেছে, যাদের কেউ আমারই মত উচ্চ বা মধ্যমানের সরকারী আধিকারিক, কেউ বা অধ্যাপিকা, কেউ এনজিওতে কর্মরতা তো কেউ কোন ছোট বা বড় সাহেবের আর্দালী। কেউ ব্যাঙ্কে কাজ করেন তো কেউ সন্ধ্যাবেলা সল্টলেকের নার্সিংহোমগুলিতে আয়ার ডিউটি করতে যান। সন্ধ্যার নৈহাটী লোকালের লেডিজ কম্পার্টমেন্ট জুড়ে শুধুই “যৌথ খামার”। বন্ধুত্ব  পদমর্যাদা দেখে হয় থোড়াই।
আড্ডা গপ্প তো চুটিয়ে হয়, তার সাথে সাথে চলে চাকুমচুকুম। কেউ গরম মুখ পোড়ানো লালচে অল্প গোল সিঙারা নিয়ে আসে, তো কেউ পঞ্চাননের কালাকাঁদ। হুগলী সমাজকল্যাণ দপ্তরের মূখ্য আধিকারিক কাজলদি তো একদিন একহাঁড়ি পান্তুয়া নিয়ে হাজির। কে যেন দিয়েছিল ম্যাডামকে ভালবেসে, আমরাও অতীব ভালবেসে পরম পরিতৃপ্তি সহকারে তার সদ্ ব্যবহার করলাম। দুঃখ শুধু একটাই আমার লিট্টি মাসি যে কোথায় অজ্ঞাতবাসে গেছে, বহুদিন তাকে দেখিনি। মিস ইউ লিট্টি মাসি।
তারবদলে এক মুড়ি মেসোকে খুঁজে পেয়েছি। নৈহাটী স্টেশনেই মুড়ি মাখেন। সত্যি বলছি মা কালীর দিব্যি, এমন অনবদ্য মুড়ি মাখা আমি বহুযুগ খাইনি।  ফুলো ফুলো বেলফুলের মত মুড়ির গায়ে উদার হস্তে ঢেলে দেন ঘানিভাঙা সর্ষের তেল। চোখের সামনে কচকচ করে কুচিয়ে নিয়ে ছড়িয়ে দেন টাটকা পেঁয়াজ, কয়েক কুচি আদা আর কাঁচা লঙ্কা। তাতে মেশে গোটা পনেরো মুচমুচে খোসা ছাড়ানো চীনা বাদাম, দু এক চামচ চানাচুর আর অল্প ঝুড়ি। সবশেষে মেশে মেসোর নিজের হাতে তৈরি মশলা। সে মশলার গন্ধেই জিভে জল এসে যায়। অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে স্টীলের চামচ দিয়ে ঘটঘট করে বেশ খানিকক্ষণ মিশিয়ে কাগজের ঠোঙায় ভরে, মেসো যখন হাতে ধরিয়ে দেয়,মুড়িগুলোর গায়ে কালচে মশলা ততোক্ষণে মাখামাখি। ঝাঁঝালো সর্ষের তেলের সুবাসের সাথে মশলার সুঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার। মুখে দিলেই, “উফ্ মার ডালা। আল্লাহ মার ডালা।”
ও হ্যাঁ, মেসোর বাদাম মাখাও কিন্তু অতুলনীয়। একই ভাবে কুচি কুচি পেঁয়াজ,আদা, কাঁচালঙ্কা,কাঁচাতেল আর মেসোর হাতের মশলা দিয়ে ঘটঘট করে মিশিয়ে পুঁচকে পুঁচকে  ঠোঙায় ভরে দেয়। ট্রেন দৌড়য়, সাথে সাথে দৌড়য় সময়, জানলার বাইরে গাঢ় হতে থাকে রাত, জানলা দিয়ে হুহু করে ঢুকে আসে পাগল হাওয়া। ক্লান্ত মহিলা কামরায় উড়ে বেড়ায় হরেকরকম কিস্যা। কখনও কোথাও হাসির হল্লা ওঠে,তো কোথাও চাপা দীর্ঘশ্বাস। এভাবেই শেষ হয়ে যায় একএকটা কর্মব্যস্ত দিন। আজরাতের মত যুদ্ধবিরতি, কাল আবার   সেই গতানুগতিক জীবনসংগ্রাম। প্রতিমুহূর্ত সে শানাচ্ছে নতুন অস্ত্র।  আমাদের পরাস্ত করতে বড়ই ব্যগ্র, কিন্তু আমরাও তো অমৃতের কন্যা। হার মানব থোড়াই।

অনির ডাইরি ১৩ই মার্চ, ২০১৮
মনটা বেশ খারাপ ছিল, এত অসহায় লাগছিল বলার নয়। বন্ধ কারখানার দুই বৃদ্ধ শ্রমিক চূড়ান্ত হতাশ ভঙ্গীতে যখন বলল,“ছেড়ে দেন ম্যাডাম। এইসব কেস ফেস করে কি হবে? আপনি বলবেন টাকা পয়সা মিটিয়ে দাও, শুনবে কে? মালিক তো দিব্যি গায়ে হাওয়া  লাগিয়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।” ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম,“আমি আপনাদের সর্বত সাহায্য করতে প্রস্তুত, আইন আপনাদের পক্ষে, নিজের ন্যায্য পাওনাটুকুর জন্য সামান্য প্রতিবাদটুকুও করবেন না?” দরজা ঠেলে বেরিয়ে যেতে যেতে ফিসফিস করে বৃদ্ধ বলে গেল,“ওরা বড়লোক, ওরা ঠিকই বেঁচে যাবে। গরীবের কেউ নেই ম্যাডাম-”।

মন খারাপ করে বাড়ি ফিরছি, রাস্তা পেরোতে যাব,শৌভিকের ফোন,“হয় আমি বাড়িতে থাকব,নয়তো এ”।  এ মানে অবশ্যই তুত্তুরী। পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে তুত্তুরীর আর সময় কাটছে না, অলস মস্তিষ্ক যেন কার বাসা? রোজ বাড়ি ঢুকলেই, নতুন নতুন এবং চমকপ্রদ দুষ্টুমির মোকাবিলা করতে হয়। বুঝলাম তেমনি কিছু। আতঙ্কিত স্বরে জানতে চাইলাম, লম্বা ফিরিস্তি- শৌভিকের শখের খেজুরে গুড়, এই মরশুমের অন্তিম এবং উৎকৃষ্টতম গুড়-দাম ১৮০টাকা কেজি, তুত্তুরী এক কৌটো মহার্ঘ  গুড় কুকুরের বাচ্ছাদের খাইয়েছে।চারতলার বারন্দা থেকে ডেলা ডেলা গুড় ছুঁড়ে দিয়েছে,আর তুত্তুরীর “কুতুয়া” গুলো যাদের নাম পর্যায়ক্রমে লেলো, ভুলো, কেলো,নেলো (গায়ের রঙ অনুসারে) তারা লাফিয়ে লাফিয়ে খেয়েছে। শুধু তাই নয়, ফ্রীজে কেমন করে না না আকৃতির বরফ জমানো যায় তা পরীক্ষা করার জন্য নানা পাত্রে করে তুত্তুরী ফ্রীজে জল রেখেছে,যার একটি আমার ফ্যান্সি স্লিং ব্যাগ। গোটা ফ্ল্যাটের মেঝে জল থইথই--সর্বোপরি যখন বলা হয়েছে,কুকুরকে গুড় খাওয়ালে পেটে ক্রিমি হয় এবং তারা মরে যায়- কেলো, লেলো,নেলো মরে যাবে এই শোকে তুত্তুরী হাঁ হাঁ করে কেঁদে বাড়ি মাথায় করছে।
বুঝলাম অবস্থা বেগতিক, এই মুহূর্তে বাড়ি ঢুকলেই দুপক্ষের সালিশি করতে হবে।এই অবসন্ন মানসিক অবস্থায় তা বড়ই বেদনাদায়ক। ভাবলাম এই মওকায় পার্লার থেকে ঘুরে আসি। ইদানিং ওরা রাত নটা অবধি খুলে রাখছে। সুরজিৎ এর আজকাল প্রচণ্ড ডিমান্ড। গিয়ে দেখি, সুরজিৎ গম্ভীর মুখে,এক বিশাল দেহী , ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ব্যক্তির অবিকল তালের মত মাথায় অত্যন্ত সযত্নে  কোন প্যাক লাগাচ্ছে। লাগিয়ে কি হবে জানি না, কারণ সত্যি বলছি মাইরি, ওণার মাথার চুলের থেকে আমার বরের দাড়ির দৈর্ঘ্য বেশী।

সুরজিৎ  মুখ তুলে বলল, “বাড়ি যাও। এপ্রিলের মাঝামাঝি আসতে বলেছিলাম না। ” দূর ব্যাটা তোর স্পা কে চায়? মাথা ভর্তি গজগজ করছে পাকা চুল। কোন ভাবেই খোঁপা-বিনুনি  বা স্কার্ফ দিয়ে আর ঢাকা যাচ্ছে না।  শৌভিক বার পাঁচেক বিস্মিত (পড়ুন উল্লসিত) স্বরে বলে ফেলেছে,“তুই কি বুড়ি রে!” কাদের অাবার এক্সপার্ট ওপিনিয়নও দিয়ে ফেলেছে,“লোকের পাকা চুল খুঁজতে হয়,অনিন্দিতার বেলায়- হেঁ হেঁ কাঁচা চুল খুঁজতে হবে। ” কেমন গাত্রদাহ হয়। ন-দশ বছরের পুরাতন বর, খুব ভালো করে জানে আমাদের বংশে অল্পবয়সে চুল পাকে। বিয়ের আগে থেকেই বেশ কিছু পাকা চুল ছিল, তখনও বলত,“ তুই কি বুড়ি রে-”।
যাই হোক বললাম সুরজিৎকে। উল্টে ধমকেই দিল, “ফোন করে আসোনি কেন?যদি আমি না থাকতাম?” বলেই ফেললাম আচ্ছা বাপ ঘাট হয়েছে। একগাল হেসে শ্যাম্পু করতে বলল। শ্যাম্পু সাধারণত যে মেয়েটি করে দেয়, তার নাম ধরে নেওয়া যাক মীনা। ও ভালো কিছু পারে না বা সুযোগ দেওয়া হয় না। টুকটাক শ্যাম্পু করে দেওয়া,পেডিকিওর,ম্যানিকিওর এইসবই করে। অবসরে ফ্লোর ঝাঁট দেয়, কাটা চুল ফেলে। আগের বার যখন মীনা শ্যাম্পু করাচ্ছিল, ওর মুখের বেশ অনেকটা অংশ জুড়ে কালশিটের দাগ ছিল। জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, লোডশেডিং এ দেখতে পায়নি বন্ধ দরজায় ধাক্কা খেয়েছে। অবিশ্বাস করিনি। আমার ঐ রকম প্রায়ই হয়। এতবেশী ঠোক্কর খাই, সারা গায়েই প্রায় নীল কালো জেব্রা ক্রশিং। মুখটাই যা বেঁচে যায়। কাল মীনা শ্যাম্পু করাচ্ছিল, আমার মাথার ওপর ওর মুখ, তাকিয়ে দেখি,মুখ শুকনো,চোখ ছলছলে,নাক টানছে আর গালে কালশিটে,কপালে খানিকটা ফুলে ঢোল। এবারের দাগটাকে ধাক্কা খাবার দাগ বলে চালানো অসম্ভব। ধাক্কায় চার-পাঁচটা অঙুলের দাগ বসে না। ঠোঁটও কাটে না। নিজে থেকে না বললে প্রশ্ন করা অসমীচীন। তবু নিজেকে সামলাতে পারলাম না। হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা চেপে ধরলাম। এই টুকুরই যা দরকার ছিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা। বাকিদের নজর এড়িয়ে ফিসফিস করে কান্না ভেজা গলায় বলল,“ অর বরদাস্ত না কর পাই, দিদি। ” সেই এক গল্প- স্কুল পালিয়ে প্রেম- প্রথম চোটে সুখের সংসার। ভালবাসা ছাড়া আর আছে কি? বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একে একে দুই একে তিন হওয়া। মেয়ে হওয়াতে শ্বশুরবাড়ির আদর এক ফুঁয়ে উড়ে গেল।বিরক্ত বরের দিনরাত ঘ্যানঘ্যান, বংশে বাতি কে দেবে?মীনা সাধ্যমত বোঝাবার চেষ্টা করে, আজকালকার দিনে ছেলে মেয়ে সব সমান। ফাটল বাড়তে থাকে, ঝগড়াঝাঁটি, সুযোগ পেলেই গায়ে হাত তোলা। ঘর থেকে শিশুকন্যা সহ বার করে দেওয়া। মামুলী গৃহবধু, যাবে কোথায়?মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি উঠবে, খাওয়াবে কে? ভাবতে ভাবতেই দ্বিতীয় সন্তানের আগমনের সম্ভাবনা। বরের চেতাবনি, “আবকি বার লেড়কা হি চাইয়ে। ” যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই লেড়কি হয়। ঝগড়া অশান্তি ছাড়ুন,সংসারে টাকাপয়সা দেওয়া বন্ধ করে দিল মীনার বর। বজ্জাত অঔরৎ,জন্ম দিয়েছিস যখন, এবার ঠেলা বোঝ। ফলে গৃহবধুর অবগুণ্ঠন খুলে ফেলে মীনাকেই বেরোতে হল রুজিরুটির ধান্ধায়। পার্লারে কাজ জোটালো। এবার শুনতে হল,বদচলন অঔরৎ। গতর দেখিয়ে টাকা কামাস। আগের বারের কালশিটেটা ছিল, ঐ উপলক্ষেই।
ঐ কালশিটের দাগ মেলাবার আগেই মীনা তার দুই কন্যা সহ বাপের বাড়ি উঠে এল। খুব যে আন্তরিক অভ্যর্থনা পেল তা নয়, তবে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দিনকয়েক হল বাপের বাড়ির পাশের বস্তিতে একটা কুটুরি ভাড়া নিয়েছে। মেয়েদের নিয়ে একাই থাকে। রবিবার দিন মেয়েদুটো পাশের মাঠে খেলছিল,হঠাৎ বাবা এসে দুই মেয়েকে জবরদস্তি নিয়ে চলে যায়। মীনার মা আটকাতে গিয়েছিল,তাকেও রেয়াৎ  করেনি জামাই বাবাজীবন। উদ্দেশ্য ছিল, মেয়েদুটোকে নিয়ে বিহারে পালাবার। ভাগ্যক্রমে মীনা পার্লার থেকে কিছুক্ষণের ছুটি নিয়ে মেয়েগুলোকে দেখতে গিয়েছিল ঠিক ঐ সময়। পার্লার ফাঁকা থাকলে ওকে  ওরা ওমন একটু আধটু ছেড়ে দেয়। দুটো কচি বাচ্ছার মা।
টেনে মেয়েদুটোকে ট্যাক্সিতে তুলে কাটবে,মীনার সাথে মোলাকাৎ। ট্যাক্সির দরজা ধরে ঝুলে পড়ে মীনা প্রবল চিৎকার করতে থাকে। সাঁঝের মুখ, রাস্তাঘাটে  তেমন লোক ছিল না। মীনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য যতটা নির্মম ভাবে মারা যায়,মারতে কসুর করেনি লোকটা। কপালের এক খামচা চুল ছিঁড়ে নিয়েছে। হাতে দমাদম ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। পেটে লাথি মেরেছে। কিন্তু মা আর সন্তানদের আলাদা করতে পারেনি। মীনা আর তার মেয়েদের কান্নাকাটির আওয়াজে লোক জড় হতে সময় লাগেনি। তারপর মীনা প্রথমে পায়ের চপ্পল খুলে পিটিয়েছে,পরে টানতে টানতে থানায় নিয়ে গেছে।
সুরজিৎ তার টাকলা ক্লায়েন্টকে ফেলে চলে এসে বলল,“বহুৎ বাহাদুর মেয়ে আমাদের মীনা,ম্যাডাম। উদোম কেলিয়েছে বরটাকে। বলেছে আবার যদি থোবড়া দেখিয়েছিস তো আরো কেলাব।  ”মীনা ফোঁস করে বলল,“না তো কি?পড়ে মার খাব?সে তো কম খাইনি ম্যাডাম?খেতে খেতে দেখলাম, নিজের জন্যে নিজে আওয়াজ না উঠালে কেউ বাঁচাবে না। ” সত্যি বলছি দিলখুশ হয়ে গেল। দুপুরের অবসন্নতা,ক্লান্তি এক ফুঁয়ে সাফ। এই না হলে জীবন,কখনও মেঘে ঢাকা, কখনও আলো মাখা- আপনাকে শুধু একটু কষ্ট করে চলতে হবে-

অনির ডাইরি ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮
শহর জুড়ে আজ প্রেমের মরশুম। আলোতে মাখামাখি আমাদের ড্রয়িং রুম। যার দেওয়াল জুড়ে তুত্তুরীর বানানো নানা ছবি,বানান(যার অধিকাংশই ভুলভাল),কমলা ফেব্রিক কালারে হাতের ছাপ, সোনালী গ্লিটারে ময়ূর আঁকা(দেখে উটপাখি মনে হলে আমি দায়ী নই)। হোক না তবু তো ইয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে। তারওপর আবার ছুটির দিন- আহাঃ সোনায় সোহাগা। গরম কৃষ্ণ কফির কাপটা বরের সামনে নামিয়ে পরম সোহাগ মাখা আধো আধো স্বরে বললাম,“তুমি আমাকে উইশ করবে না?” উইশ শুনে আমার বরের মুখের হাল কি হল সে আর লিখছি না। সকালের টাইমস্ অব ইণ্ডিয়া থেকে কোন রকমে চোখ তুলে  নাক উঁচু করে বলল,“হ্যাপি শিবরাত্রি। ” দিল পুরো মুডের পিণ্ডি চটকে, তবু যতটা সম্ভব তরল করে বললাম,“না। না। ওটা না।” বর গম্ভীর মুখে মারি চিবুতে চিবুতে বলল,“আমি শিবরাত্রি ছাড়া আর কিছু মানি না। তুই শিবরাত্রি করিসনি। তোকে দূর করে দেব। ”কি অমৃত সম্ভাষণ মাইরি। আজন্ম নাস্তিক, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিন্দুমাত্র  অভাবিত আমার বর নাকি শিবরাত্রি ছাড়া আর কিছু মানে না। আর আজকের দিনে বউকে দূর করে দেবার চিন্তা কোন বাঙালী পুরুষের মনে হচ্ছে না?সদ্য বিবাহিতদের জানি না, তবে আমাদের মত পুরোণো পাপীগুলো ফেবু আর হোয়াটস্ অ্যাপ ভরিয়ে দিয়েছে ঘ্যাণঘ্যাণ করে। “আজকের দিনে বউকে চমকে দিন। গার্লফ্রেণ্ডের সাথে বউয়ের আলাপ করিয়ে দিন”,“বউ মানে বড় উৎপাত” মার্কা পচাগলা রদ্দি জোকস্ পাঠিয়ে পাঠিয়ে। এক ব্যাচমেট তথা অভিন্নহৃদয় বন্ধুকে তো সক্কালবেলায় উদোম ঝাড়লাম। এতই যখন উৎপাত তোরা বিয়ে করেছিলি কেন?বউকে ছেড়ে একটা বর খোঁজ, বুঝতে পারবি কতধানে কত চাল। মূর্তিমান আপদ এক একখানা।
যাইহোক ফিরে আসি আমাদের আলোকজ্জ্বল ড্রয়িং রুমে। বরকে করজোড়ে নমস্কার করলাম,দরকার নেই বাপু তোমার ভালোবাসায়,দয়া করে বাজার গিয়ে আমায় উদ্ধার করো। বাবার তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও জবরদস্তি তু্ত্তুরীও সঙ্গে গেল। ওদের ক্যাথলিক স্কুলেও আজ সারপ্রাইজ, শিবরাত্রির ছুটি। ঘড়ির কাঁটা আধ পাকও ঘোরেনি বাবা-মেয়ে ফিরে এল প্রবল ঝগড়া করতে করতে। শৌভিক যথারীতি,“অসভ্য গোভূতটাকে আমি আর কোথাও নিয়ে যাব না। ওষুধের দোকানে গিয়ে এমন বকেছে, বাপরে বাপ- 'ও ঐ ভায়োলেট ওষুধটা কিনছ। ওটা তো থাইরোনর্ম। থাইরয়েডের ওষুধ। মা খায়”।  হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। শৌভিক চিৎকার করেই চলেছে,“আরো শোন। বলল ‘বাবা,ঐ দেখ ঐ যে শিশির মধ্যে যে লজেন্স গুলো আছে, ওর নাম কফলেট। ওগুলো কিন্তু টফি নয়। কাশি হলে খায়। ’ ওর বকবকানির চোটে শঙ্কর বলল,‘বাপরে এ তো এখুনি ডাক্তার হয়ে গেছে। ওষুধ তো দিতেই পারবে। শুধু ডিগ্রীটা যা নেওয়া বাকি।’ ” হাসতে হাসতে বেদম দশা। তুত্তুরী গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে,শৌভিকবলেই যাচ্ছে,“শুধু তাই নয়, বাপ্পার সঙ্গে যা বকেছে, বাপরে বাপ।”বাপ্পা হল আমাদের চিকেন ওলা।  বাবা যখন কাঁচা আনাজ কিনছিল, তুত্তুরী বাবার হাত ছাড়িয়ে বাপ্পার কাছে গিয়ে বলেছে,“ একটা মুরগি কাটো তো। আমি দেখব। আমার অনেকদিনের শখ। কচকচ করে কেটে ফুলো। কিন্তু আমি মুর্গিটা কিনব না। তুমি তো এমনিই কাটতে, আমার সামনেই না হয় একটা কাটো। ”
তুত্তুরী অভিমানে ফুলছিল। বাবাকে অনেক অনুনয় বিনয় করেছে,একটা ফুল কিনে দাও। মাকে দেবো। আজ ভ্যালেন্টাইন ডে। বাবা যথারীতি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। উফ্ এই ফুল কেনা নিয়ে কাল কি নাটক। দিব্যি ডেপুটেশন খাচ্ছি, আচমকা তুত্তুরীর মাসির ফোন। ভয়ে আঁতকে উঠলাম। কি হল রে বাবা? ঝানু তথা বৃদ্ধ ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকে বললাম,থামুন। আগে দেখি বাড়িতে কি হল। ফোন ধরতে মাসির কাতর স্বর কানে এলো,“বোনি একটু বোঝাও। কি কাঁদছে। বাপরে বাপ। ফুলে ফুলে কাঁদছে। দম আটকে বমি করে ফেলবে। ”কেন কাঁদছে কেন? না ইস্কুল থেকে ফেরার সময় তুত্তুরী কাতর অনুরোধ করেছে,  মাসি একটা ফুল পেড়ে দাও। কাল ভ্যালেন্টাইনস্ ডে। আমি মাকে দেব। আমাদের আবাসনে  ফুলের বান ডেকেছে কিন্তু সিকিউরিটার আতঙ্কে মাসি গাছে হাত দেয়নি।
ডেপুটেশন দিতে আসা জঙ্গী তথা বৃদ্ধ নেতা নেত্রীদের বসিয়ে মেয়েকে বোঝালাম।ওণারাও মাথা নেড়ে নানা কথা বলে সাহায্য করলেন।  মাঝখান থেকে গেল বেচারাদের ডেপুটেশনের পিণ্ডি চটকে।
ফেরার পথে নৈহাটী স্টেশনের সামনে দেখি ঢেলে ফুল বিকোচ্ছে। টকটকে চকচকে গোলাপের জওয়ানিতে পিছলে যাচ্ছে চোখ।মেয়ের জন্য বুকটা টনটনিয়ে উঠল। আহাঃ।  অল্পবয়সীদের ভিড়ে মাঝে টুক করে ঢুকে পড়লাম। ফুলওয়ালাকে ফিসফিসিয়ে বললাম,“ভাই মেয়ের জন্য কিনব। সবথেকে বড়টা দাও। আর ঐ সব জঞ্জাল মাঝে মস্ ফার্ণ জরি একদম না।” সাদার ওপর চিকন গোলাপী বর্ডার দেওয়া গোলাপের দাম বলে ৩০টাকা। বললাম ভাগ্। পাতি লাল গোলাপ ৫টাকা দিয়ে কিনে প্লাস্টিকে মুড়ে সযত্নে ব্যাগে ভরলাম। আর একটা গোটা কুড়ি টাকার চকলেট। গরিব শ্রমিক মা, ভালোবাসার দিনে আর কি দেবে- ভালোবাসা ছাড়া?
ট্রেন বেশ ফাঁকা। অন্যমনস্ক ছিলাম হঠাৎ দেখি দুটি গেঁড়ি গেঁড়ি বাচ্ছা চলন্ত ট্রেনের দরজার সামনে টাইটানিক মার্কা পোজ দিচ্ছে। টেনে এনে বসালাম। এই তোদের মা কই?নিরুত্তাপ এবং নিরুত্তর। দুটোর গায়ে রঙ চটা সুতির জামা, পা খালি এবং ধুলি মলিন। কোন ব্যাগ ট্যাগও নেই। সর্বনাশ। পালিয়েছিস নাকি অ্যাঁ?বাড়ি কোথায়? কিছুই বলে না। খালি মিচকে মিচকে হাসি। এদুটোকে ছেড়ে তো আমি নামতেও পারব না। যা দিনকাল। কে ধরে নিয়ে যাবে। কি করবে, মায়ের মন শঙ্কায় কেঁপে ওঠে। বাবা বাছা করে অনেক বোঝাবার পর বলল, বিধাননগর বস্তিতে থাকে। মা লোকের বাড়ি বাসন মাজে। স্কুলে ভর্তি তো হয়েছে তেমন যায় না। মায়ের সময় কোথায়। বাবা নেই। মানে আছে কিন্তু আরেকটা বিয়ে করেছে। ইদানিং মা সন্ধ্যার দিকে পাশের ফেলাট বাড়িতে নতুন রান্নার কাজ পেয়েছে। মা বেরোতেই ওরাও বেরিয়ে পড়েছে। অনেক বোঝালাম। কত বিপদ হতে পারে। বোঝালাম তোরা ছাড়া মা’কে কে ভালোবাসবে?বোঝালাম মায়ের যন্ত্রণা আর বাড়াস না বাবা। দুহাতে দুটোকে পাকড়ে ঝপাং করে নামলাম উল্টোডাঙা স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে মেলা লেগেছে যেন। কত ফুল। হৃদয়াকৃতির ছবির ফ্রেম,কফি মাগ,টেডি। তুত্তুরীর গল্প বলছিলাম,মেয়েটা বলল,“মাসি মাকে আমরাও কিছু দেব।”কি দিবি বাবা? ছেলেটা বলল,“কিন্ত পুইসা নেই মাসি। ” একটু দূরেই ওদের ঘর। মা অন্ধকার ঘরের দরজার সামনে বসে আছে।  বাচ্ছাদুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম,গোলাপ আর চকোলেটের দরকার কাদের আজ বেশী। একজনকে ফুলটা দিলাম আর একজনকে ক্যাডবেরী।শুধু বললাম ভালো থাকিস বাবা।
বিনা ফুল চকলেটেই বাড়ি ফিরলাম। আমাদের ধনী মহল্লা বাড়ি ঢোকার আগে ফুলের দোকঅনে দাঁড়িয়েছিলাম,৫টাকার গোলাপ ১২-১৫টাকা চাইল। ধুৎ তেরী। ভালোবাসার দিনে বুক ভরা ভালোবাসাই তো যথেষ্ট।
শৌভিকের বর্ণণা আর আমার অট্টহাস্যের ফাঁকে কখন তুত্তুরী গিয়ে নিয়ে এসেছে তার রঙচটা লাল ফোন। যাতে একটা টাকাও আমরা ভরাই না, যাতে তুত্তুরী লোকজনকে ফোন করে বিপাকে না ফেলে। ফোন না যাক, ভয়েস রেকর্ড তো হয়। মেয়ে আমার জন্য মেসেজ রেকর্ড করে রেখেছে,“শোন মা”-কানে দিয়ে শুনি ফিসফিসানি,“আই লাভ ইউ মা। হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস্ ডে”। বুকটা ভরে গেল। আবার কি চাই। ভালোবাসা সত্যিই বাতাসে ভাসে, যত দি তার অনেক বেশী ফিরে আসে।
#Happy_Valentines_Day

অনাির ডাইরি১২ই জানুয়ারী,২০১৮
গণ্ডগোলের সূত্রপাত বেশ কয়েকদিন আগে, তাহলে বিশদেই বলি, বড়দিনের প্রায় এক মাস দীর্ঘ ছুটিতে তুত্তুরীর হোমওয়ার্ক ছিল একটি গহনার বাক্স। অর্থাৎ জুয়েলারি বক্স। এই টুকুনি গেঁড়ি গুলো থোড়াই ওসব বানায়? সব কাজ সামলে সেই মায়েদেরই কোমর বাঁধতে হয়। তা না হয় বাঁধলাম, দীপাবলীতে উপহার পাওয়া ড্রাইফ্রুটের বাক্স দিয়ে দিব্য গহনার বাক্স বানানো যায়, কিন্তু মুশকিল হল বাক্সর গায়ে অলংকরণ করব কি করে? আগের প্রজেক্ট অর্থাৎ ফুলদানি বানাবার সময় কি কুক্ষণে ফেব্রিক কালার আর আঠা কিনেছিলাম! সব রঙ শোভা পাচ্ছে আমাদের সাধের ড্রয়িং রুমের দেওয়ালে, ড্রয়িং রুম ছাড়ুন, গোটা বাড়ি ময় কত কি যে পর্যায়ক্রমে লেখা এবং আঁকা আছে, যেমন দরজাদিয়ে ঢুকে জুতো খুলতে যাবেন, দেওয়ালে জ্বলজ্বল করছে,“মাসি খুব খারাপ। ” মাসি খারাপ তো বটেই, টিভি বন্ধ  করে হোমওয়ার্ক করতে যে বলে তাকে কি করে ভালো বলবেন বলুন তো মশাই?
শোবার ঘরের দেওয়ালে লেখা,“মা আই লাভ ইউ”।  নিজের সৌভাগ্যে চোখে জল এসে যায়, পরদিন কোন গর্হিত অপরাধের জন্য এক ধমক মারি, ফিরে গিয়ে দেখি “মা”এর ওপর ইয়া বড় একটা কাটা চিহ্ন। তারপর দিন আবার হয়তো ফেরার পথে আঙুর কিনে আনলাম, তো সেই কাটা মায়ের ওপর আবার লেখা হল “মা আই লাভ ইউ। ” 
লাভ ইউ/লাভ ইউ নট ছাড়ুন,কত কি যে আঁকা এবং লেখা আমাদের দেওয়াল জুড়ে। যত্র তত্র দশ হাত ওলা মা দুর্গা আঁকা, আম, পদ্মফুল, সূর্য এছাড়াও অজস্র দাগ, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে গোলগোল দাগ কাটে তুত্তুরী, আহা কতটা লম্বা হল দেখতে হবে না বুঝি? এমন কিছু ছবি আঁকে যা দেখে শৌভিকের এবং আমার হৃদ্কম্প হয়। মিষ্টি মিষ্টি কথায় জিজ্ঞেস করি, “এটা কি এঁকেছিস বাবু?” “ আঙুল মা। বুঝতে পারছ না?” পাপী তাপী মন আমাদের আঙুল দেখে যে কি ভেবেছিলাম সে নাহয় উহ্যই থাক। আর একবার একটা ছবি দেখে অফিস থেকে ফিরে দুজনেরই পিলে চমকে গিয়েছিল, এটা কি? পরে জানলাম ওটা হনুমানের ছবি। বাকিটা তার ল্যাজ। পুঁচকে হনুমানের বিশাল ল্যাজের গল্প বোধহয় লঙ্কাকাণ্ডে পড়েছি এবং গল্প শুনিয়েছি। তুত্তুরী সেটাই চিত্রাঙ্কন  করেছে আর কি। আমাদেরই মনে পাপ আছে---
তো যা বলছিলাম আর কি,দেওয়ালে চিত্রাঙ্কন  নিয়ে কিছুদিন ধরেই বাপ এবং মেয়ের দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলছে। আজকাল আবার তুত্তুরী এঁকে মোছা ধরেছে, ফলে দেওয়ালের অবস্থা চিন্তা করতে পারছেন--। তারওপর রোজই তুত্তুরী কিছু না কিছু হারিয়ে আসে। পেন্সিল বক্স খুললে দেখবেন, গোটা দুয়েক এক ইঞ্চি পেন্সিলের টুকরো আর আধখানা নোংরা রাবার, গোটা দুই প্লাস্টিকের স্কেল ছাড়া আর কিস্যু নেই। প্রবল বায়নাক্কার পর, অথবা অযাচিত ভাবেই হয়তো নতুন পেন্সিল বা ইরেজার বা শার্পনার দেওয়া হল, প্রাণের বন্ধুকে দেখাবে বলে, ঠিক বেলা দুটো নাগাদ আমার মায়ের ফোন আসবে অফিসে,“শোন না,ও শার্পনারটা হারিয়ে ফেলেছে বুঝলি। ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। বকিস না যেন।” মেলার মিটিং এর তীব্র ব্যস্ততা, যত বলি আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। মা আর ফোন ছাড়েই না, “শোন না, কাল থেকে এত হোমওয়ার্ক দিস না। এই টুকু বাচ্ছা অত পড়ার চাপ দিস না। ”হতভম্ব হয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ, এই মহিলাই না পড়া পড়া নিয়ে আমার জীবন অতিষ্ঠ  করে তুলেছিল শৈশবে? একটা আধটা পেন্সিল রাবার হারালেই না বাড়িটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হয়ে যেত?
দাঁড়ান দাঁড়ান গল্প আরো আছে, যে মেয়ে বই থেকে কমপ্রিহেনশন পড়তে গিয়ে নাকের জলে চোখের জলে হয় যায়, সে কি না এয়ারটেলের এসএমএস পড়ে,যথোচিত পাঠোদ্ধার করে, নির্দেশাবলী অনুসরণ করে ফোনে দশ টাকার লোন টকটাইম ভরিয়ে ফেলে? সমস্ত ইন্সপেক্টরদের নিয়ে মিটিং করছি, মেয়ের ফোন, কি করে ফোন করলি রে বাপ? তোর ফোনে তো কোন পয়সা নেই। এতবার দাদু, মামমাম(দিদা) আর কাকিমাকে ফোন করে জ্বালাত যে আমরা ঐ ফোনটায় পয়সা ভরানোই ছেড়ে দিয়েছি। শুধু ফোন ঢুকবে, বেরোবে না। ওমা মেয়ে তো দিব্যি ফোন করছে, কি বলতে, না এত হোমওয়ার্ক দিও না তো। ভালো লাগে না। নিজের মত একটু থাকতে দেবে তো নাকি?
আরো আছে, দাঁড়ান। মেলা সংক্রান্ত শত ব্যস্ততার মাঝেও, অনেক রাতে বাড়ি ফেরার পথে প্রায় জোর করে শাটার খুলিয়ে নানা টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে এনে, একরাতের মধ্যে জুয়েলারি বক্স রেডি করে দিলাম, মিস্ বললে তবে না নিয়ে যাবে স্কুলে। মেয়ের আব্দার মিস্ আজই বলেছে নিয়ে যেতে। আমি বিশ্বাস করলাম,শৌভিক নয়। শৌভিক বারবার বলে গেল ও মিথ্যা বলছে, মিস নয়, ও বন্ধুদের দেখাতে নিয়ে যাবে। কার কথা শুনি?তুত্তুরী কেঁদে কেটে দাদু মামমামকে জানিয়ে এমন কাণ্ড বাঁধাল,বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম। বড় ক্যারিব্যাগে করে পাঠিয়ে দিলাম স্কুলে। রাত্রিবেলা বাড়ি ফিরতেই মাসি বলল, মিস এমন কিছু বলেননি, বরং বলেছেন নোটিশ দিলে তবে নিয়ে যেতে। তুত্তুরী আসলে ওর প্রাণের বন্ধু ঈশাণীকে দেখাবে বলে নিয়ে গেছে,ব্যাস শুরু হয়ে গেল শৌভিকের বাক্যবাণ,“বলেছিলাম না,ও ভয়ানক মিথ্যুক!ও মোটেই তোর মত নয়। তোকে একের হাটে কিনে দশের হাটে বেচবে। ওরে সাইকোলজি আমার পাস সাবজেক্ট হলেও আমি খুব ভালো করে পড়েছিলাম। মানবচরিত্র আমি খুব ভালো বিশ্লেষণ করতে পারি। ও অতি ধুরন্ধর। তোর মত গোবরগণেশ নয়। ” আমি যে গোবরগণেশ, সবার সব কথায় বিশ্বাস করি, খুব সহজেই মানুষকে ভালোবেসে ফেলি,এবং সেই ভালোবাসার প্রকাশ না করে থাকতে পারি না তা আমি জানি। তাই বলে কেউ তার সুযোগ নেবে এটা বড়ই হৃদয়বিদারক। শুরু হল অহিংসা অসহযোগ।
বুক ফেটে যাচ্ছিল মেয়ের সাথে কথা না বলতে পেরে, সেই ভোর সাড়ে ছটায় স্কুলে পাঠাবার আগে মেয়েকে চুমু খাই, তারপর সেই রাত আটটা। মাঝে শুধু মেয়ের গায়ের দুধ-দুধ গন্ধটা নাকে লেগে থাকে। আর ঠোঁটে? মেয়ের ফাটা ঠোঁটের ঊষ্ণ চুম্বনের গলিয়ে দেওয়া অনুভূতি । এটা কি কোন বাবার পক্ষে বোঝা সম্ভব ?
তবু চেষ্টা করলাম, মিথ্যে সেই বলে যার কল্পনাশক্তি প্রবল। আমিও বলতাম। পাথর গলেই না। শৌভিকের মতে আমি নির্বোধ চূড়ামণি আর তুত্তুরী অত্যন্ত সুচতুর ভাবে বাবার বিরুদ্ধে আমায় ব্যবহার করছে, দলভারি করার জন্য। কি করি?কি ভাবে সামলাই এই গৃহযুদ্ধ? দুজনেরই ফরিদপুরিয়া গোঁ। আমি হাওড়া-মুর্শিদাবাদ কম্বো, ভালোবাসা আর আবেগ ছাড়া কিছু বুঝিনা। ইশোশানাল ফুল। বাবা মাও যোগ্য সঙ্গত করল, সত্যি বলছি ঘরে দপ্তরে এত চাপ সামলানো অসম্ভব। প্রতি পদক্ষেপে মনে হয় কি অসম্ভব ব্যর্থ আমি। একজন মা এবং একজন মহিলা শ্রমিক হিসাবে-
ঠিক এই সময় আমার প্রাণাধিকা বান্ধবীর মেসেজ, সেও নারী শ্রমিক। তারও একটি মাত্র সন্তান। এবং সেও আগাগোড়া মিথ্যুক। পায়ে কুকুরে আঁচড়ে দিয়েছে, কি অসীম পারদর্শিতার সঙ্গে লুকিয়ে গেছে এই খবর, বাবা মাকে কি অসাধারণ পট্টি পড়িয়েছে ,চেয়ার টানতে গিয়ে পয়ে আঁচড় লেগেছে। ঈশ্বর মঙ্গল করুন “উটো“র সেই বন্ধু ছেলেটির, যার সত্যি কথা শুনে মেলা শেষে প্রায় রাত দশটার সময় আমার বান্ধবী ওষুধের দোকানের ঝাঁপ খুলিয়ে ছেলেকে অ্যান্টি রাবিজ এবং টেটভ্যাক দিতে পেরেছে।
সুকন্যার মেসেজ বুকে বল এনে দিল,নাঃ তুত্তুরী একটু বেশী কল্পনাপ্রবণ বটে তবে খারাপ নয়। পড়াশোনা করুক বা না করুক ক্লাস টুতে উঠেই যাবে। এবার যেটা প্রয়োজন তা হল বাপ†মেয়ের ভাব করিয়ে দেওয়া,আর কে না জানে, পুরুষদের হৃদয়ের রাস্তা কোথা থেকে শুরু হয়, বিশ্বাস করুন শিশুদেরও- নীচের ছবি দুটির একটি হল আমার বানানো গহনার বাক্স আর অপরটি আমার বানানো চকলেট কেক।  প্রেসার কুকারে বানানো। ভিতরে ঠাসা চকোলেট চিপস্।  আসলে হয়েছে কি হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলাম,সংসারে শান্তি চাই। বর আর মেয়ের ভুল বোঝাবুঝি মেটাবো, এদিকে বাড়িতে কোকো পাউডার নেই। ঘড়ি বলছে রাত নটা। হাউসিং এর মার্কেটে তালা, অগত্যা বোর্ণভিটাই ভরসা। ভুলবেন না এটা হল ক্যাডবেরী বোর্ণভিটা, ফাইনেস্ট চকোলেট। সাথে এক চামচ নেসক্যাফেও দিয়েছি কিন্তু, নাহলে ঐ মাদক গন্ধ্টা ছাড়বে না। বোর্নভিটার ডেলা ডেলা পাওয়ার বুস্টার গুলোই বেক করার পর গলগলো চকো চিপস্ হয়ে গেছে। খেয়ে দেখবেন না কি?
পুনশ্চ ঃ- আমার কিন্তু মাইক্রো নেই, প্রেশারকুকার আর নুনই ভরসা।

অনির ডাইরি ১১ই জানুয়ারী ২০১৮
রাত বাড়ার সাথে সাথেই চেনা শহর কেমন যেন রহস্যময় হয়ে ওঠে। শুনশান কালেক্টরেটে পেশী আস্ফালন করে ঘুরে বেড়ায় একপাল অনাথ সারমেয়।এমনিতেই আমাদের কালেক্টরেটটি বিশাল,লোকমুখে শুনি এটা নাকি হাজি মহম্মদ মহসিন সাহেবের নিবাস ছিল এককালে। এখানকার ঝুল বারন্দা নাকি পৃথিবীর দীর্ঘতম। একদিকে জেলা আদালত, জেলার মূখ্য বিচারকের নিবাস,ডিভিশনাল কমিশনারের দপ্তর অন্যদিকে ডিএম সাহেবের করণ। দিনেমানে বোধহয় হাজার খানেক লোক সমাগম হয়, অথচ রাত নামলেই হানাবাড়ি। বিশাল জনশূণ্য আবছা আলোকিত বারন্দায় গিয়ে দাঁড়ালেই গা ছমছম করে।যতটা না আধিভৌতিক পরিবেশের জন্য তারথেকে অনেক বেশী দায়ী হাড় কাঁপানো গঙ্গার হিমেল হাওয়া।
ফাঁকা লঞ্চে গুটি কয় সওয়ারি,লঞ্চ ঘাট থেকে স্টেশনে যাবার গমগমে নৈহাটি বাজারে যেন শনি লেগেছে। সারি সারি ঝাঁপ বন্ধ দোকানের সামনের আধো অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসে নৈহাটি স্টেশন। আপাততঃ বেশ কিছুক্ষণ  কোন ট্রেন নেই। ফাঁকা বেঞ্চে, ব্যাগ পত্তর আঁকড়ে বসলাম। নৈহাটিতে খুব ছিঁচকে চোরের উৎপাত। অসতর্ক হলেই হাত থেকে ব্যাগপত্র মোবাইল ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়। কাজেই--
মাথায় ঘুরছে মেলার চিন্তা। নিমন্ত্রণ ঠিকঠাক হল তো? আসবেন না জানি, তবুও আমরা এমন ভাবে নিমন্ত্রণ করি যেন ব্যক্তিগত শুভানুষ্ঠান। হোয়াটস্ অ্যাপে জেলা প্রসাশন তথা অন্যান্য দপ্তর এবং লেবার তথা সাবঅর্ডিনেট লেবার সার্ভিসের সকল পরিচিতকে আগেই কার্ডের প্রতিলিপি পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করেছি। এমনকি অবসর প্রাপ্ত শ্রমিকদেরও বাদ দিই নি। হোক না অবসর প্রাপ্ত তাও তো শ্রমিক। কি যে খুশি হন এনারা। এই খুশি টুকুর রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন ওণাদের শুভকামনা হিসাবে।
অনেকেই জবাব দিয়েছেন,ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জনৈক রিটায়ার্ড দাদা দেখলাম লিখেছেন, “ধন্যবাদ। তোমাদের অনুষ্ঠান সর্বতোভাবে সাফল‍্যমণ্ডিত হোক , এই কামনা করি। বিশ্বাস করি , হবেও।শুভেচ্ছা নিও।নতুন (ইং) বছর মঙ্গলময় হোক।” মনটা ভরে গেল, এই না হলে বয়ঃজেষ্ঠ্য। সারাদিনের ক্লেদ,গ্লানি, হতাশা,ক্লান্তির ওপর যেন ওষধি মলমের প্রলেপ। দিলখুশ মেসেজ। বলতে গেলাম,“পারলে আসবেন কিন্তু। ”তার আগেই দেখি ওণার মেসেজ ঢুকল,“যেতে হয়তো পারবো না .....
স্ত্রী তো অসুস্থ দীর্ঘদিন ধরে।”সে কি?জানি না তো। অবশ্য জানবই বা কি করে?মেসেজ পাঠাই বটে,নিয়ম করেই পাঠাই, যে কোন উৎসবে-পরবে,বাঁধা গৎ-“আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সকলকে অমুখ দিবসের শুভেচ্ছা। ” জবাবেও ফরোয়ার্ডেড মেসেজ বা ছবিই পাঠান সকলে, না ও পাঠাতে পারেন কোন জবাব। কদাচিৎ কেউ কেউ ব্যক্তিগত মেসেজ পাঠান। “ভালো থেকো” মার্কা। মন ভরে ওঠে ভালো থাকার সুবাসে। তারপর? আবার সেই থোড় বড়ি এবং খাড়া।

যাই হোক, সেটাই বললাম। কি হয়েছে। সুললিত বাঙলা হরফে জবাব এল,“প্রায় বছরখানেক ধরে ভুগছে , নিউরো হসপিটালে চিকিৎসা চলছে। বার দুই মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে । নানারকম সমস্যা।দিনে, প্রথমদিকে , ১৪/১৫ বার জ্ঞান হারাচ্ছিল।কমে ৮/১০ বার...... ৪/৫ বার...... এখন ২/৩ দিনে ১/২ বার ।কোনও রকম উত্তেজনা ( আনন্দ বা দু:খ ) হলেই বেহুঁশ। মাথায় সামনের দিকে একজায়গায় আর পিছনদিকে এক জায়গায় ড‍্যামেজ হয়েছে। পড়ে যায় খালি,গেছে ও বেশ কয়েকবার। ধরে ফেলি আমরা। ফলে , সবসময় আমি আগলে বসে থাকি , বেরোতে পারি না। ডাক্তার strictly বলে দিয়েছে মাথায় আর চোট কোনও রকমে লাগলে fatal হয়ে যাবে , life risk হতে পারে।বুঝতেই পারছ, আর কেউ নেই , ছেলে তো বেরিয়ে যায় অফিস।”
ইশ্ ইশ্ ইশ্ ছাড়া আঙুল সরল না। বৌদিকে দেখিনি কোনদিন,গল্প শুনেছি,বিশাল হাউসিং এর দুর্গাপুজার সব দায়িত্ব উনি একা হাতে সামলাতেন। আর দাদা চণ্ডীপাঠ করতেন। একবার আমার কাতর অনুরোধে সাড়া দিয়ে উনি চার্চ লেনে আমার চেম্বারে কিছুটা চণ্ডীপাঠ করেছিলেন। কি উদাত্ত জলদগম্ভীর  কন্ঠস্বর। টকটকে ফর্সা রঙ,ঋজু চাবুকের মত মাঝারি চেহারা, আর্যসুলভ খাড়া নাক,চোখবন্ধ করে যখন সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করছিলেন,রীতিমত গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। সেই সৎ ভালোমানুষ দুটিরএকি অবস্থা?উনি ঠিক কারো সমবেদনা বা করুণাগ্রহণের পাত্র নন,তবুও আমার সমবেদনা কি ভাবে যেন খুব ভালো মনেই গ্রহণ করলেন। বললেন, “ জানো, রান্নার লোক নেই দীর্ঘদিন , পাচ্ছি না। ওর বারণ আগুনের সামনে যাওয়া।আমাকেই করতে হয়।ইদানীং ও একটু আধটু জোর করে করছে। আগে তো কোনওদিন করিনি , ভাই।  পারতাম না।ঠেলায় পড়ে শিখে গেছি।” আবার লিখলাম “ইস্ কি অবস্থা। ” আমার শব্দকোষ সাময়িক ভাবে খালি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আদি অনন্তকাল ধরে এই জনহীন নৈহাটি স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে প্রবল ঠান্ডায় আমিও জমে গেছি। উনি লিখে চলেছেন,“ চাইলেও যোগাযোগ রাখতে পারিনা।
২০/২২  টা ওষুধ খাওয়াতে হয়,সারা দিনে। ” 
ঘোষিকা ঘোষণা করে দিল, ট্রেন আসছে। গুটি কয়েক সহযাত্রীও দেখলাম কোথা থেকে এসে হাজির। ফোন বন্ধ করার আগে লিখলাম,“আপনাদের ঈশ্বর কেন এত যাতনা দিচ্ছেন বঝতে পারছি না। প্রার্থনা করি বৌদি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। ” উনি লিখলেন,“ সেটাই প্রার্থনা করো। এমনি তে আমি মোটামুটি ঠিকঠাকই আছি, অন্তত শারীরিক ভাবে। তোমাদের শুভেচ্ছা ভালোবাসা আর ঈশ্বরের আশীর্বাদই এই বৃদ্ধের একমাত্র সম্বল।  যোগাযোগ রেখো,একতরফা ভাবে হলেও। রাগ অভিমান না করে।ভালো থেকো। শুভেচ্ছা আশীর্বাদ নিও।” মনটা কেমন ভরে গেল জানেন। কে বলে পৃথিবী শুধুই আবেগহীন, হিসেবী ব্যক্তিবর্গের চারণভূমি ?মোটেই নয়। মোটেই নয়। আমরাও আছি। এবং বিশ্বাস করুন আমরাই কিন্তু সংখ্যাগুরু, আর যতদিন আমাদের মত আবেগসর্বস্ব মানুষজন রয়েছে,পৃথিবী কিন্তু সবুজই থাকবে।