Monday, 4 December 2017

অনির ডাইরি

অনির ডাইরি ৭/১২/১৭
দীনু কাকু, অর্থাৎ শ্রী দীনবন্ধু ভট্টাচার্য উসকে দিল স্মৃতিটা। কি যে এক ইয়ের অ্যাপ এসেছে, আর গোটা ফেবু মেতে উঠেছে প্রশ্নোত্তরের  খেলায়। যতজন এই প্রশ্নোত্তরের  খেলায় অংশ গ্রহণ করেছেন, কারো জবাব দীনু কাকুর ধারে কাছে আসে না। জবজবে ন্যাকামির রস সিক্ত প্রশ্নকেও সপাটে ওভার বাউণ্ডারি মারা বোধহয় কেবল দীনু কাকুই পারেন।
যাই হোক প্রশ্নটা ছিল,“দা মোস্ট ডিলিসিয়াশ মিল আই হ্যাভ এভার হ্যাড”- দীনু কাকু বললেন, “at বঙ্গলক্ষী হোটেল in 1974”। সত্যি বলছি জীবনে নামই শুনিনি। তাই আর উচ্চবাচ্য করলাম না। কিন্তু কেউ বোধহয় জানতে চাইলেন, কোথায় এই বঙ্গলক্ষী হোটেল? জবাব পাওয়া গেল- বহুবাজার আর কলেজ স্ট্রীটের ক্রশিং এ। এবার এল সেই অবধারিত প্রশ্ন, খেয়েছিলেন কি? যার স্বাদ  ৪৩বছর পরও মুখে লেগে আছে? দীনু কাকু বলতে শুরু করলেন,“ভাত, মুসুর ডাল, বেগুনভাজা, পালংশাকের ঘন্ট, ইলিশমাছের ঝাল, রুইমাছের কালিয়া, চাটনি, দই ।” উলস। জিভে জল চলে এল মাইরি।
হঠাৎ করে শান্তিনিকেতন হোটেলের কথা মনে পড়ে গেল। কোথায় বলুন তো? না না হাওড়া কলকাতা ছাড়ুন,বীরভূমেরও ত্রিসীমানায় খুঁজে পাবেন না। শান্তিনিকেতন হোটেল ছিল খড়্গপুরে, ইন্দা মোড়ের কাছে। ২০০৭সাল। লেবার সার্ভিসে যোগ দেওয়ার সাথে সাথেই পাঠিয়ে দেওয়া হল খড়্গপুর। ইন্দা মোড়েই আমাদের অফিস। হাওড়া থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারী করতাম। সকাল আটটায় চায়ের সাথে মার হাতের চাট্টি গরম ভাত খেয়ে, বিশাল ব্যাগ(সত্যি মাইরি বাবা একটা চটের ফ্যান্সি বাজার ব্যাগই কিনে দিয়েছিল, আদরের মেয়ের খাবার আর জল বয়ে নিয়ে যাবার জন্য) ভর্তি টিফিন, জলের বোতল,ছাতা, ট্রেনে পড়ার ইয়া মোটা গল্পের বই নিয়ে বেরোতাম।
যাই খাবার নিয়ে যাই না কেন, ট্রেনে উঠলেই খিদে পেত এবং সারাদিন খিদে পেতেই থাকত। টাকা যেমন টাকা টানে,মোটিরাও বোধহয় মোটিদেরই আকর্ষণ করে। অচীরেও গলায় গলায় দোস্তি হয়ে গেল নবনীতার সাথে। দুজনের কেউই চেহারা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত ছিলাম না। ট্রেনে ওঠা থেকে খাওয়া শুরু হত। ঝালমুড়ি, দশটাকায় দশটা পাতি লেবুর সাইজের মুসাম্বি, কুচো গজা, ঘুঘনি, বাদাম, চিট বাদাম যাকে বাদাম পাটালি বলে আর কি ইত্যাদি ইত্যাদি। কোনদিন কিছু না খেলে হকাররা এসে জ্বালাত,“আজ খেলেনি কেন?” আবার ফেরার পথে ট্রেনে একই কাণ্ড ঘটত।
কে যেন সেই সময় আমাদের জ্ঞান দিল, “তোমরা ভাতের সময় ভাত খাউনি, তাই তোমাদের এত খিদে পাউছু”। সত্যি। সত্যি। সত্যি।
শুরু হল ভাতের হোটেল খোঁজা। নবুর অফিস এবং আমাদের অফিস তোলপাড় করে একটাই ভাতের হোটেলের নাম পাওয়া গেল। ওয়ার্ল্ড ফেমাস ইন খড়্গপুর, দা ওয়ান এণ্ড ওনলি শান্তিনিকেতন হোটেল। প্রথম দিন আমরা টিফিন টাইমে গেছি, দুটো বাজছে সবে। ও বাবা, থিকথিকে ভিড়। কতলোক যে বসে খাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। দূর পাল্লার বাসের যাত্রীরাও বউ বাচ্ছা সহযোগে খেতে বসেছে। ভাত লে আও। ডালটা এট্টু দেখি, মাছ দে রে চিৎকারে আবহাওয়া সরগরম।  আমাদের বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, একজন ডেকে বসিয়ে দিল।স্কুলের বেঞ্চের মত বেঞ্চ পাতা। নীচুতে বসলাম, ওপরে খাবার এল। শালপাতার থালার ওপর কলাপাতা পাতা। গরম ভাত, অ্যালুমিনিয়ামের বালতি থেকে কাঁচের ডিশে করে খপাৎ করে তুলে যেটা নবনীতার পাতে ঢালল, তাতে আমরা দুজন খেয়েও আর একজন খেতে পারে। আমরা হাঁ হাঁ করে উঠলাম, ভাগ করে নেব বাপ। আর দিস না। এবার এল নুন,লঙ্কা আর পাতি লেবু।ছোট স্টীলের বাটিতে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ডাল। সদ্য সাঁতলানো হয়েছে, পাঁচ ফোড়ন আর শুকনো লঙ্কার গন্ধে ম ম করছে। এরপর ইয়া বড় বড় চাকা চাকা বেগুন ভাজা। আহা গরম ডাল বেগুন ভাজা লেবুর রস আর কাঁচা লঙ্কা চটকে গরম ভাত--- স্বর্গীয় অনুভূতি। এরওপর পড়ল দুটি ইয়া বড় বড় পোস্তর বড়া। উলস। সত্যি বলছি দাদা, মা কালীর দিব্যি। পেঁয়াজ কুচো কাঁচা লঙ্কা দিয়ে পোস্তর বড়া। তারপর ছোট স্টীলের বাটিতে সর্ষে বাটা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে গরম জিভ পুড়ানো বাটা মাছের ঝোল। বাটা মাছটা এত বড় যে,মুণ্ডুটা বাটিতে ডোবানো আর লেজটা শূণ্যে উঠে আছে,অনেকটা বাংলার ৯এর মত দেখতে। শেষ পাতে চাটনীর নামে যেটা এল,  সেটা অবশ্য কলকাতার স্বাদে হাল্কা মিষ্টিওলা পাতি টমেটোর ঝোল। তা হোক। দিলখুশ খানার পর মুখ হাত ধুয়ে ইন্দা বাজার থেকে পান কিনে যে যার অফিসের দিকে রওনা দিলাম, তবে অফিসে ঢোকার আগে আমাদের অফিসের নীচের মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি দই খেতে ভুলিনি। ঐ দোকানের বৃদ্ধ মালিক এককালে আইপিটিএর হয়ে গ্রামে গ্রামে পালাগান করে বেড়াতেন। পরবর্তী কালে সে সব আদর্শ  কাঁসাই এর জলে ভাসিয়ে মিষ্টির দোকান খোলেন। বড় স্নেহ করতেন আমাদের। মাঝে মাঝেই আমাকে ডেকে মিষ্টি খাওয়াতেন, দাম দিতে গেলেই ওণার অভিমান হত। দামের বদলে বসে ওণার গান শুনতে হত। চোখ বন্ধ করে মাটির সুরে সমাজের নানা সমস্যা, অনাচার,দিনবদল  আর শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন নিয়ে গান বাঁধতেন জেঠু। ভাবলেই মন ভালো হয়ে যায়।এই দম বন্ধ করা ইঁট কাঠ পাথর সোশাল মিডিয়া ভাইরাল ভিডিও লাভ জিহাদ খুন ধর্ষণ নির্যাতন থেকে বহুদূরে আমার আর নবুর লালনীল খড়্গপুর। আজীবন অমলিন।

অনির ডাইরি ৪/১২/১৭

স্পষ্ট অস্পষ্টের মায়াজালাক্রান্ত স্মৃতি।এটুকু মনে আছে, বড় মামার বিয়ে ছিল সেই সময়। মায়ের খুড়তুতো ভাই, বংশের বড় ছেলে, তার বিয়েতে না গেলে হয়?তখন নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের শুরু। মহানগরে ততোটা না হলেও সুদূর মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম রামনগরে জাঁকিয়ে বসেছে শীত। বিয়ে বাড়ির হুল্লোড়ের পাশাপাশি মাচা থেকে লেপ কম্বল  পাড়া,রোদে দেওয়ার কাজ চলছে পূর্ণোদ্যমে। ভোর বেলা হুহু করতে করতে কাঁচা ঘুমে উষ্ণ মিষ্টি খেজুরের রস খাওয়াতো দিদা। বড় মামা আর্মিতে ছিলেন। শুধু বড়মামা কেন, রামনগর-কাদখালি-বাছড়া গ্রামের সব সমর্থ পুরুষই বেলডাঙা ক্যাম্প দিয়ে মিলিটারিতে ঢুকত। গ্রামে ঘুরতো আড়কাঠি, এক্স আর্মি ম্যান। ট্যাকা দাও চাকরী নাও। জমি বেচে চাকরীতে ঢোকো, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার টাকা জমিয়ে জমি কেনো,গরু কেনো, মাটির বাড়ি সারাও,পাকা বাড়ি তোলো। বিয়ের সম্বন্ধ এল বলে, বর্তমান ধ্যানধারণা অনুসারে রূপসী না হলেও ঐ সময় চলনশীল মোটামুটি ডাগরডোগর মেয়েদের বাবারা রেডিও,সাইকেল, হাতঘড়ি এবং সে যুগে চমকে ওঠার মত নগদ নিয়ে পাত্রের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ত।
বড় মামার সাথে তার দুই আর্মি ম্যান বন্ধুও এসেছিলেন বিয়েতে। অজ গ্রাম। ইলেকট্রিসিটি দূর অস্ত। শৌচাগার স্নানাগারের কথা বলে আর সফিস্টিকেটেড ফেবু জনতাকে লজ্জা দিতে চাই না। কিন্তু ঐ দুই মিলিটারি  মামার তাতে কোন সমস্যা ছিল বলে মনে পড়ে না। দিব্যি বাড়ির ছেলে হয়ে মিশে গিয়েছিলেন।
বিয়ের দিন, বর যাবে পাল্কি করে। ছোটদা নীতবড়, বরের সাথে তার পাল্কি চাপার কথা। আমি এমন কান্না জুড়লাম, ছোটদা আমাকে পাল্কি চাপার সুযোগ করে দিয়ে সরে গেল। পলাশী থেকে দুটো স্টেশন পর সেই নবগ্রামের ভিতর দিকে মেয়ের বাড়ি। বিশাল জোড়া নৌকায় বরযাত্রীরা গঙ্গা পেরিয়ে এপাশ থেকে বাসে উঠল। লাক্সারী বাস না। বড় বাস, যেগুলি দূর পাল্লায় চলত তখন নদীয়া মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাসের নামটা কি ভাবে যেন আজও মনে আছে। বাস থেকে নেমে বর যাত্রীরা হেঁটে যাবে, আর আমি আর বর পাল্কিতে। আমরা আগে পৌঁছলাম। বড় মামিমার মা,বরকে বরণ করে নীতবরকে বরণ করতে গিয়ে থতমত খেয়ে একসা কাণ্ড। ছোটদা আজোও মাঝেমাঝেই মাথায় গাঁট্টা মারে, ওর ভাগের লাইমলাইট খেয়ে নেওয়ার জন্য।
যাইহোক, বিয়ে হল, আলো জ্বালিয়ে, কিসের আলো মনে নেই হ্যাজাক সম্ভবত।  বাবা বা দাদারা ভালো বলতে পারবে। আমি এতই ছোট ছিলাম যে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম ছোট মাসির কোলে। সেই ঘুম ভাঙে পরদিন সকালে। বর আসবে- নতুন বউ আসবে এই উন্মাদনায়।
রামনগরে খবরের কাগজ গিয়ে পৌঁছত প্রায় সূর্য ডোবার সময়। ইলেকট্রিসিটি নেই ফলে টিভির কোন গল্পই নেই। জনগণমাধ্যম বলতে রেডিও। যাতে খুব সহজে রেডিও বাংলাদেশ এবং রেডিও সিলোন আসত,কিন্তু বিবিধ ভারতী কখনই ধরা যেত না। কলকাতা ক এবং খ মাঝে মাঝে ঝাঁকি দর্শন দিত বটে তবে তার জন্য রেডিওটিকে নিয়ে রীতিমত কসরত করতে হত। কি নিস্তরঙ্গ জীবন ছিল ভাবুন।দেশ যদি রাতারাতি শত্রুপক্ষের করায়ত হয়ে যেত তাহলেও বোধহয় দিন দুয়েকের আগে রামনগরবাসীরা কিছুই জানতে পারত না। কারো খুব একটা জানার উৎসাহও ছিল বলে মনে হয় না। দেশ বা জাতীয় সংবাদের তুলনায় স্থানীয় গ্রাম্য পরনিন্দা পরচর্চাতেই অধিবাসীরা অধিক বরং বলা চলে অত্যধিক উৎসাহী ছিল।
ব্যতিক্রম ছিলেন বড় মেসোমশাই এবং অবশ্যই কিছুটা আমায় ছোট মেসোও। ছোটোর উৎসাহে বড় সকাল থেকেই রেডিও নিয়ে কসরত করছিলেন,হঠাৎ কি যে হল,বড় মেসোমশাই চিৎকার করে উঠলেন চুপ চুপ চুপ। শর্ট ওয়েভে ইংলিশ খবরে এমন কিছু বলছে, যে ক্ষণিকের মধ্যেই চূড়ান্ত নীরবতা নেমে এল উৎসবমুখর বিয়ে বাড়িতে। যারা ইংরাজি বুঝল না,তাদের বাংলায় বুঝিয়ে দিল পাশের জন। কিছু একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে বুঝতে পারলাম। বহু লোক রাতারাতি মারা গেছে। বড় মামা বিয়েতে আসা এক ভদ্রলোকের পরিবার থাকেন ঐ শহরে। তিনি উদ্ভ্রান্তের মত খানিক দৌড়দৌড়ি করলেন। তারপর হাঁচোড়পাঁচোড় করে ব্যাগ পত্র গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কিচ্ছুটি দাঁতে না কেটে। তখন মোবাইল ছাড়ুন ল্যাণ্ডফোনই দুর্লভ। বিস্তীর্ণ  অঞ্চল জুড়ে একটাও ল্যাণ্ডফোন থাকত না। যারা ফেবুতে আঁতেল মার্কা পোস্ট দেয় যে মুছে যাক সোশাল নেটওয়ার্ক, হারিয়ে যাক মোবাইল, পাড়ার মোড়ে শুধু একটা ডায়ালটোন ওলা ফোন থাকুক। লুপ্ত হোক ইমেল। ফিরে আসুক চিঠি ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের আমার সিরিয়াসলি মাইরি,“ক্যালাতে” ইচ্ছা করে।বাপ তোরা জঙ্গলে গিয়ে থাক। তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব যে আমাদের কতদূর এগিয়ে দিয়েছে,তা সেদিনের কথা ভাবলেই বুঝতে পারি। কি সাংঘাতিক মানসিক অবস্থা হয়েছিল ওণার তা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। তবে একজন ইস্পাত শীতল মিলিটারি ম্যান ও নিজের পরিবারের বিপদ সম্ভবনা দেখলে আলুভাতে মার্কা হয়ে যায় তা আমার স্বচক্ষে  প্রত্যক্ষ করা।
শোকের আবহে বিয়ে বাড়ি শেষ হল। রেডিও ছেড়ে নড়লেনই না দুই মেসোমশাই। দাদা মামারা সেই খবরের তর্জমা করে জনে জনে পরিবেশন করতে লাগল।
দেখতে দেখতে রামনগর আর আমাদের আশু বিরহে মুষড়ে পড়া দিদাকে ছেড়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম আমরা। বাড়ি ফিরেও সেই একই আলোচনা। ইণ্ডিয়া টুডের প্রচ্ছদে হাড় হিম করা সেই ছবি, একটা শিশু, আমাদেরই বয়সী হবে,যার খোলা দুই ঘোলাটে চোখে মৃত্যুর শীতলতা। বোধহয় কবর দেওয়া হবে,কারণ মাথা এবং গলার অনেকটাই মাটিতে ঢাকা। কি মিষ্টি,কি নিষ্পাপ একটা শিশু। ঘুমের মাঝে বেঘোরে মৃত।  যার জন্য একফোঁটা চোখের জল ফেলার কেউ নেই। কে ফেলবে?সবাই তো মারা গেছে।  পাহাড়ের ওপর থেকে গভীর রাতে চুপি চুপি নেমে এসেছিল মৃত্যুদূত।যার পোশাকী নাম মিথাইল আইসোসায়ানেট।  পথে যাকেই পেয়েছে গিলে নিয়েছে।বিশ্বের জঘণ্যতম ইণ্ডাসট্রিয়াল ট্রাজেডি।  সরকারী মতে মৃতের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিনহাজারের একটু বেশী (৩৭৮৭) আর বেসরকারী মতে? ১৬,০০০। সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ পঙ্গু হয়ে যায় রাতারাতি। প্রায় আট হাজার মানুষ সপ্তাহ দুইয়ের মধ্যেই মারা যান। অতঃপর চলতে থাকে দোষারোপ পাল্টা দোষারোপের পালা। বিচারের বাণী কেঁদে ককিয়ে গলা শুকিয়ে মরে  । মূল কালপ্রিটকে সযতনে কারা যেন পগার পার করে দেয়। জ্যাঠাইমা যেমন আমাদের দেখলেই প্রচ্ছদা উল্টে রাখত। তেমনি ছেলে ভুলানো ল্যাবেঞ্চুস ধরিয়ে চুপ করিয়ে রাখার চেষ্টা চলে কিছুদিন। তারপর?জনতার স্মৃতিশক্তি অস্বাভাবিক দুর্বল। রোজ নতুন নতুন উত্তেজক খবর চায়। ওসব পচাপাতকো খবরে আর কার মাথা ব্যথা।
৩৩বছর কেটে গেছে ভোপাল গ্যাস লিক কাণ্ডের। কেউ মনে রাখেনি। কেউ কথা রাখেনি।
#Bhopaltragedy

Friday, 17 November 2017

অমিয়ার একদিন

অমিয়ার একদিন #Throwback 17.11.2016

উদাস হয়ে বসেছিল অমিয়া। বিগত কয়েকমাসে জীবনটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল।  অমিয়া আজ দিশেহারা ।  সুনন্দ সামন্তের সঙ্গে সখ্যতা তো আজকের নয়, সেই যে যবে সুনন্দের প্রথমা স্ত্রী আত্মঘাতী হল, গোটা অফিস, আত্মীয় পরিজন সকলে বর্জন করেছিল ওকে।  অপ্রয়োজনে কেউ বার্তালাপ ও করত না।  শুধু অমিয়া ছিল, সেই গভীর ডিপ্রেসনের দিনগুলিতে ওরা ছিল নিছক বন্ধু।  অফিস অন্তে নির্ভেজাল আড্ডা,কখনও সাথে ঠান্ডা বীয়র।  আবার কখনও বা নিছক চা সিগারেট।  সুনন্দ বলত ,“ অমিয়া, মাই বাডি। ” কবে যে এই বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নিল সে কি ছাই অমিয়াও বুঝেছিল? বাবা মারা যাবার পর অমিয়া তখন এ্যাকিউট ডিপ্রেসনে ভুগছিল, দিনের পর দিন   অফিস কামাই।  নিজের চতুর্পাশে দুর্ভেদ্য  প্রাচীর গড়ে তুলেছিল অমিয়া। সেই প্রাচীর উড়িয়ে  টেনে হিঁচড়ে ডিপ্রেসন থেকে বার করেছিল সুনন্দ।  সেই কৃতজ্ঞতাবোধই হয়ে উঠল যত নষ্টের গোড়া।  বিবাহের প্রস্তাব অমিয়াই দেয়।  সুনন্দ ও আপত্তি করেনি।  বিয়ের পরও বছর কয়েক মন্দ কাটেনি। তারপর কি যে হল? সুনন্দ যেন ধীরে ধীরে ভুলে যেতে লাগল যে অমিয়া ওর জীবনে আছে।  প্রথমে ছুঁতোনাতায় আলাদা হল বিছানা।  স্টাডি রুমটাই হয়ে উঠল সুনন্দের শয়ন কক্ষ।  কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের কোন যুৎসই জবাব ওকে দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি সুনন্দ।  তীব্র অভিমানে দিন কয়েক মায়ের কাছে থেকে আসা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি অমিয়া। পরের ধাপে বন্ধ হল বার্তালাপ।  কথা বলতও না।  জবাবও দিত না। তৃতীয় ধাপে বন্ধ করল অমিয়ার মুখদর্শন। অমিয়া ডাইনিং হলে গিয়ে হাজির হলেই সটান উঠে চলে যেত সুনন্দ। অমিয়া কিছু কিনে আনলে বা রান্না করলে খেত না ।  অন্তিম ধাপে ছিল প্রকাশ্যে পরকীয়া।  অমিয়ারই চোখের সামনে ওদেরই দপ্তরের মহিলা সহকর্মীর সাথে রগরগে অ্যাফেয়ার।সেই নিয়ে গোটা অফিসে সে কি কেচ্ছা।  শেষে বীথি বলল,“ অমিয়াদি জানি তুমি সুনন্দ স্যারকে ভীষণ ভালবাস।  কিন্তু সহ্যের ও তো একটা সীমা আছে? উনি চান না এই বৈবাহিক সম্পর্ককে দীর্ঘায়ত করতে।  তুমি কি সত্যি সেটা বুঝতে পারছ না?”

মাস ছয়েক হল মায়ের কাছে আছে।  সম্পর্ক ভাঙা নিয়ে সুনন্দ কোন উচ্চবাচ্য করেনি। অমিয়াও নয়।  মা, বন্ধুরা বার কয়েক বলেছে উকিলের সাথে কথা বলতে।  বীথি পরিচিত  এক উকিলের নম্বরও যোগাড় করে দিয়েছে।  তাও মাস তিনেক হবে। অমিয়া ফোন করেনি। করতে পারেনি।

“ এই মরেছে! পয়সার ব্যাগটা কোথায় ফেললাম?” জনৈক মহিলা কণ্ঠ বলে উঠল, চমকে বাসে ফিরে এল অমিয়া। উল্টো দিকের সিটে বসে এক মধ্যচল্লিশের মহিলা তার ব্যাগ হাঁটকে চলেছেন, বাতানুকূল ভলভো বাস।  কন্ডাকটর পরম ভদ্র।  বিনীতভাবে বলল, “ আছে নির্ঘাত দিদি।  দেখুন না।  আমি ততক্ষণ অন্য টিকিট গুলো কাটি। ” কন্ডাকটর চলে গেলেও মহিলা ব্যাগ হাঁটকানো থামালেন না। কিছুক্ষণ পরে আবার আর্ত স্বর শোনা গেল,“ পেলাম না তো।  এবার কি হবে? হে ঠাকুর আমার আর কত পরীক্ষা নেবে?” শেষের দিকে মহিলার গলা ভেঙে গেল।  কেউ একজন পাশ থেকে বলল,“ কোথায় যাবেন?”
মহিলা কান্না চেপে জানাল,“ হাইকোর্ট নামব। ” পাশ থেকে অন্য কেউ বলল,“পয়সা  যখন নেই, এখানেই নেমে যান। ” ফিসফিসানি শোনা গেল,“ এসব এদের রোজের কেত্তণ। ” কথাটা মহিলার ও কানে গেল।  চোখের জল চলকে  উঠল।  উনি আর্ত স্বরে বললেন, “ বিশ্বাস করুন, আমি ভদ্র- ” কথা শেষ করত পারলেন না।  ক্ষণিক দম নিয়ে কাতর ভাবে বললেন,“ কেউ অনুগ্রহ করে টিকিটটা কাটিয়ে দেবেন? বিশ্বাস করুন আমার খুব বিপদ।  আমার ভাই আদালতে অপেক্ষা করছে, আমি পৌছেই টাকাটা ফেরৎ দিয়ে দেব।” অমিয়ার অসহ্য লাগছিল ওণার অসহয়তা। দৃঢ় স্বরে জানাল, “ আমি কাটিয়ে দিচ্ছি। ” টিকিটটা মহিলার হাতে দিতে উনি কৃতজ্ঞ ভাবে জানালেন, “ আপনি একটু হাইকোর্ট চলুন, আমি টাকাটা ফেরৎ দেব। ”
অমিয়া মৃদু হেসে বলল,“ মাত্র পঁয়তাল্লিশ টাকার জন্য আপনাকে হাইকোর্ট অবধি ধাওয়া করব? ছাড়ুন।  আপনি বিপদে পড়েছিলেন, এটুকু আর কি এমন?”
মহিলা নাছোড়বান্দা, “ আপনার নাম ঠিকানাটা দিন অন্তত।  প্লিজ ভাই!” মহিলার কাতর দৃষ্টির সামনে অমিয়া আর না করতে পারল না, দায়সারা ভাবে ঠিকানা দিয়ে নির্দিষ্ট  স্টপে নেমে পড়ল। ওর সঙ্গে রোজ নামেন, এক ভদ্রলোক  শুধু বললেন, “ রোজকার ব্যাপার দিদি।  কতজনকে দেবেন? ও টাকা আর পেয়েছেন?”

মহিলা সত্যিই এলেন না।  মঙ্গল থেকে রবিবার হয়ে গেল, তাঁর টিকিও দেখা গেল না। ভুলেও গেল অমিয়া।  রবিবার ভরপেট জলখাবার  খেয়ে, ছাতে গিয়ে মনের সুখে একটা বিড়ি ধরিয়েছে, হঠাৎ নীচে থেকে মা হাঁক পাড়ল, কে যেন দেখা করতে এসেছে।  দুড়দাড় করে নীচে নেমে দেখে সেই মহিলা একা বসে আছেন।  অমিয়া বাকরহিত। মহিলা সলজ্জ ভাবে বললেন, “ তোমার কবে ছুটি তা তো জানি না ভাই।  যদি দেখা না হয়, তাই -”
অমিয়া হাসবে না কাঁদবে? “ মাত্র কটা টাকা দিতে এত কষ্ট করলেন?”
“ মাত্র হতে পারে, তবে আমার দুঃসময়ে তোমার উপকারটুকু ভুলি কি করে?”
“ বসুন না। চা?” মহিলা মাথা নাড়লেন।  চা হতে যেটুকু সময় লাগে, ততক্ষণ কি কথা বলা যায়? মহিলাও মাথা নীচু করে নিজের হাত দেখছেন।  অমিয়া গলা ঝেড়ে বলল,“ তা আপনার সমস্যা মিটেছে?”
“ হুঁ চিরতরে। ”
“ বাঃ।  তাহলে তো নিশ্চিন্ত। ”
মহিলা মাথা না তুলেই ঘাড় নাড়লেন। নেহাৎ কথা বলার জন্যই অমিয়া জিজ্ঞাসা করল,“ তা কি সমস্যা সেটা কি জানতে পারি? মানে যদি সমীচীন হয়। ”
“ঐ দিন আমার স্বামীকে মুক্তি দিলাম। ”
“ অ্যাঁ?”
“ ডিভোর্স। ” মাথা তুলে করুণ ভাবে বললেন উনি।
“ কিন্তু  কেন?” উত্তেজিত ভাবে জিজ্ঞাসা করেই অমিয়া বুঝতে পারল শালীনতার সীমা লঙ্ঘন  করে ফেলেছে। ক্ষমা চাইতে যাবে, মহিলা বলে উঠলেন,“ সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।  পচা গলা সম্পর্ক আঁকড়ে তাও বসেছিলাম।  শয্যা আলাদা যে কবে হয়েছে আজ আর মনে পড়ে না। শেষের দিকে কথা বলা দূরের কথা, আমার উপস্থিতিও সহ্য করতে পারত না।”

“ ঘেন্না হত নিজেকে।  তোমাদের মত লেখাপড়া  শিখলে কবেই হয়তো বেড়িয়ে  আসতাম।  কোথায় যাব?নিরাপত্তাহীনতা নাকি প্রেম জানি না, হয়তো এই দ্বিধায় কেটে যেত জীবন।  কিন্তু উনি করজোড়ে মুক্তি চাইলেন। জানালেন, উনি শীঘ্রই বাবা হতে চলেছেন। সেই মহিলা ওণার বন্ধু পত্নী। ”
“ ছিঃ। ”ধপ করে বসে পড়ল অমিয়া। 
মহিলা মৃদু হাসলেন,“ওণার জীবন ভাই। যা ভাল বুঝেছেন। মাথা উঁচু করে বেড়িয়ে  এলাম।  খোরপোশ আদায় করার কথা বলেছিল আমার উকিল। নিইনি। ”
“কেন? ওটা আপনার অধিকার।  খাবেন কি? আপনাদের জন্যই এরা এত বাড়ে। ”ক্ষোভে ফেটে পড়ল অমিয়া।  অসহ্য ন্যাকা মেয়েছেলে। মহিলা ঘাড় উঁচু করে বললেন,“বাচ্ছা পড়াব, প্রয়োজনে লোকের বাড়ি বাসন মাজব। কিছু না হলে নিজেকে বেচব।
-----শেষের রেশ রাখব না। ”

মহিলা চলে গেছেন। মায়ের সঙ্গেও কিছুক্ষণ গল্প করে গেলেন।  নিজের ব্যক্তিগত কথা অবশ্য কিছু বলেননি। উনি চলে যাবার পর থেকে অমিয়া গোটা বাড়ি মাথায় তুলেছে, সেই বীথির দেওয়া উকিলের কার্ডটা কোথায় গেল? মা বা কাজের দিদি নির্ঘাত কোথাও ফেলেছে। ওটা ওর এক্ষুণি চাই।

Monday, 13 November 2017

অফিস অফিস

#১ ০৭/১১/২০১৭
সক্কাল সক্কাল তানিয়াদির ফোন, “ওরে মেইল আইডি টা দে রে।” কাল রাতে কথা দিয়েছিলাম,আজ অফিসে ঢুকেই, এক বিশেষ সরকারী দপ্তরের মেইল আইডি পাঠিয়ে দেব। যথারীতি ভুলে গেছি, তড়িঘড়ি মেল খুলে বললাম, “একটু লিখে নেবে প্লিজ।”
“বল”।
“wbhgl”
“ডবলু বি এইচ আর কি বললি বি?”
“বি নয় রে বাবা জি।জি। জি ফর গোয়াল ঘর।”
তানিয়া দি ফোনের ওপাশে হাল্কা হেসে গম্ভীর ভাবে বলল, “আমি বলতে যাচ্ছিলাম গরু আর তুই বললি গোয়ালঘর। কি বিস্ময়কর মিল আমাদের চিন্তাধারায়! ”
কি করব বলুন। দিনরাত্রি সবাই মিলে যে ভাবে গরু, গোমাতা, গোমূত্র, গোময়, গোবলয় নিয়ে পড়েছেন, আমাদের মত দুই তুচ্ছ মহিলাশ্রমিকের মাথাতেও আজকাল তাই জি দিয়ে গরু, গোয়ালঘর এসবই আসে।

Saturday, 11 November 2017

শ্রমিক আমি

শ্রমিক আমি (পর্ব-৪)
মনে করুন আপনি কোন বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত একজন শ্রমিক,এবার মালিকপক্ষ হঠাৎ করে একদিন আপনাকে বলে দিল কাল থেকে আর কাজে আসতে হবে না, কোনরকম নোটিশ ধরালো না, শোকজ করল না, এক মাসের অগ্রিম বেতন দিল না, কিছুই করল না, শুধু বলল, “বাপু অনেক হয়েছে, ভালোয় ভালোয় বিদায় দিলাম, আলোয় আলোয় চলে যাও”। তখন আপনি কি করবেন?
আপনাকে আসতে হবে আমাদের কাছে, আপনার মহকুমায় যে অ্যাসিস্ট্যান্ট বা ডেপুটি লেবার কমিশনারের দপ্তর আছে, আপনাকে সেখানে গিয়ে সাদা কাগজে তিন কপি দরখাস্ত দিতে হবে। আপনি অবশ্যই মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রেও আদালত জানতে চাইবে আপনি আমাদের কাছে এসেছিলেন কি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আদালত আবার ঘুরিয়ে আপনাকে আমাদের কাছেই পাঠাবে।
যাইহোক এবার আমরা কি করব? ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট, ১৯৪৭ অনুসারে আমরা হলাম কন্সিলিয়েশন অফিসার, আইনে আমাদের অসীম ক্ষমতা দেওয়া আছে, ডিসপিউটের মীমাংসা করার জন্য আমরা আক্ষরিক অর্থেই যা খুশি করতে পারি, এমনকি তেমন ত্যাঁদড় মালিক পক্ষকে দরকার হলে সমন পাঠিয়ে ধরে আনার অধিকারও আমাদের আছে। বাবা-বাছা করে হোক, ধমক-ধামক-হুমকি দিয়ে হোক, দুপক্ষকে বুঝিয়ে শুনিয়ে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি, পেরে গেলে ভালো, কিন্তু আদালতের মত কথা না শুনলে শাস্তি দেবার ক্ষমতা তো বেচারি কন্সিলিয়েশ্ন অফিসারের থাকে না, হাতে কোন ডাণ্ডা থাকে না যে গোঁয়ার গুলোকে দুঘা দিতে পারি, তাই যখন দেখা যায় এই কেসটার আর কোন মেরিট নেই, বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল মার্কা কানা গলিতে ঢুকে পড়েছি, তখন বাধ্য হয়ে ফেলিওর রিপোর্ট করতে হয় ওপরতলায়।গুরুত্ব বুঝে যা কালক্রমে কোর্টে পাঠানো হবে কি হবে না, সে সিদ্ধান্ত নেয় সদর দপ্তর।
আমার এই এগারো বছরের চাকরী জীবনে এরকম যে কটি কেসের সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রতিটিকে নিয়েই একেকটা গল্প লেখা যায়। যেহেতু নিখাদ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে তাই কন্সিলিয়েশন অফিসারের চেয়ারে বসেও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারি কই? অধিকাংশ সময়ই আমি নিজেই শ্রমিকের হয়ে সওয়াল জবাব করি এবং মনে মনে মালিক পক্ষকে শূলে চড়াই। এত বড় সাহস? এক কথায় একটা লোকের চাকরী খেয়ে নাও? কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে মালিকেরও তেমন দোষ থাকে না, মালিক পক্ষ চায়, বাবা অন্যায় হয়ে গেছে, না জেনে করে ফেলেছি এসো মিট্মাট করে নি- কিন্তু বলে না বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়, শ্রমিক নিমরাজি হলেও তার হিতাকাঙ্ক্ষীরা কিছুতেই রাজি হয় না।
সময়কাল বা স্থানকাল সম্বন্ধে নীরব থাকছি, একদিন এক ভদ্রমহিলা এলেন আমার কাছে, “নমস্কার ম্যাডাম। আমি অমুক স্কুলে পড়াই।“ দিদিমণির বরের একটি কেস চলছিল আমার তৎকালীন দপ্তরে। ফাইল থেকে যা বুঝলাম, ভদ্রলোক একজন কনট্রাক্টরের অধীনে একটি আপৎকালীন সরকারী দপ্তরে মোবাইল ভ্যান চালাতেন, কোন কারণবশতঃ উনি একদিন এমারজেন্সি ডিউটিতে যেতে পারেননি, ফলে ওনার চাকরী চলে যায়। কেসটা এসেছিল আমার পূর্বসূরির জমানায়, মালিক পক্ষকে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য লিখিত ভাবে জানাতে বলার পরই সে বেচারা বদলী হয়ে যায় এবং যাবার সময় দিদিমণিকে বলে যায় যে, “ম্যাডাম আসছেন। উনি ঠিক ধমকে ধামকে আপনার স্বামীর চাকরী ফিরিয়ে দেবেন।“যদিও বন্ধু মানুষ, তবু মনে মনে পূর্বসূরির মুণ্ডপাত করলাম, খুব ভালোই জানে, যে, ম্যাডাম তো দুরস্থান ম্যাডামের পিতৃদেবও কাউকে চাকরীতে পুনর্বহাল করার ক্ষমতা রাখেন না।
মালিক পক্ষকে উদোম ঝাড়লাম, লিখিত জবাব দেননি কেন? বৃদ্ধ মালিক ভয়ে ভয়ে বলল, “ম্যাডাম আমার শরীর ভালো নয়, ভেলোরে গেছিলাম, এই ফিরেছি, আপনি যেদিন ডাকবেন আসব।“ ডাকলাম দুপক্ষকে। শ্রমিকের সাথে সাথে দিদিমণিও এলেন।আলোচনা শুরু হল,মালিক জানালেন, ঐ ড্রাইভারের জন্য সেদিন সরকারের আপৎকালীন পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়,সরকারী দপ্তর ওনাকে শোকজ করে, এবং দপ্তরের আধিকারিক হুমকি দেন,ঐ ড্রাইভারকে না সরালে ওনার কন্ট্রাক্ট বাতিল করে দেবেন। নিঃসন্তান বৃদ্ধ মালিক, কন্ট্রাক্ট গেলে ওনার খাওয়া পড়ার অভাব হবে না, কিন্তু ওনার অধীনে কর্মরত বাকি ছেলে গুলোর কি হবে, এই ভেবে উনি এই ড্রাইভারটিকে বরখাস্ত করেন। এ গল্প আমার বহু পরিচিত। সব কেসেই মালিক এমনই কিছু ফাঁদে, যদিও এই লোকটিকে খুব একটা প্যাঁচালো মনে হল না।
এবার শ্রমিকের পালা, মালিকের বক্তব্যের মধ্যেই দিদিমণি অন্তত বার পাঁচেক মিথ্যা কথা, মিথ্যাবাদী, বাজে বকছে এসব করেছেন। বার কয়েক ধমক দিলাম, তাও শোনে না। শ্রমিককে যখন বলার সুযোগ দেওয়া হল, দিদিমণি, আগ বাড়িয়ে বললেন, “আমি বলছি, তুমি থামোঃ।“ আবার ধ্মকালাম,কে কার কথা শোনে, অচিরেই বুঝতে পারলাম না আমি দিদিমণির ক্লাশে বসে আছি, না দিদিমণি আমার চেম্বারে। তবে দিদিমণির প্রবল ধমক হুমকি অভিযোগের যা সারমর্ম বুঝলাম, শ্রমিক চায় ক্ষতিপূরণ সহ তাকে আবার পুনর্বহাল করা হোক। মালিক পক্ষ জানালো, আপাতত কোন কাজ ফাঁকা নেই,ড্রাইভার একজন নেওয়া হয়ে গেছে, যেহেতু মোবাইল ভ্যানটি সচল থাকা আবশ্যক। দিদিমণি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চিৎকার জুড়লেন, “ঐ ছেলেটাকে নেয় কোন সাহসে? ওকে আজই তাড়িয়ে দিয়ে আমার স্বামীকে নিতে হবে।“
এবার দেখলাম দিদিমণির ক্লাশ না নিলে চলছে না, ওনার চার গুণ চিৎকার করে বললাম, “আপনি শ্রম কমিশনারের অফিসে এসে,আর একজনকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করার দাবী করছেন? অনেক ক্ষণ থেকে আপনার বকবক শুনছি, মুখ বন্ধ করে না বসলে, চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।“ জোঁকের মুখে নুন পড়ার মত উনি শান্ত হয়ে বসলেন। মালিককে আলাদা করে বললাম, বিনা নোটিশে এভাবে ছাড়িয়ে দেওয়া বেআইনি কাজ, মিটমাট করে নিন। ঐ কাজ না দিতে পারেন, অন্য কোন কাজে লাগিয়ে দিন। একদিন যেতে পারেনি, হতেই পারে। এমন কিছু গর্হিত অপরাধ তো করেনি।
মালিক নিমরাজি হল, অন্য একটি চাকরী দিতে কিন্তু শ্রমিক কিছু বলার আগেই ওনার জাঁদরেল দিদিমণি ঝাঁপিয়ে পড়লেন, “ না নেব না। আমরা কিছুতেই অন্য চাকরী নেব না। নতুন ছেলেটাকে দূর করে আমার বরকে তার পুরানো চাকরী ফেরত দিতে হবে। ও ভেবেছেটা কি? ওকে আমি কোর্টে টেনে নিয়ে যাব। জেলের ঘানি ঘোরাব।“ দিদিমণিকে বুঝিয়ে বললাম, কোর্টে টেনে নিয়ে যাবেন সে তো ঠিকই আছে, কিন্তু এই অপরাধে কারো জেল হয় না। মাত্র কয়েকটা মিটিংয়েই যখন মিটে যাবার সম্ভবনা দেখা দিচ্ছে, তখন অনুগ্রহ করে তা নষ্ট করবেন না। কিন্তু কোন কথাই ওনারা শুনতে রাজি নন। ক্রমাগত দিদিমণির বাক্যবাণে আহত হতে হতে এবার বুড়ো মালিকও বেঁকে বসল।
অবস্থা আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ডিএলসি সাহেবের শরণাপন্ন হলাম, স্যারের ঘরে মিটিং ডাকা হল যতদিনে, ততদিনে চাকরী যাবার পর থেকে দশ মাস অতিক্রান্ত। প্রস্তাবিত ফাঁকা চাকরিটাও ইতিমধ্যে একজনকে দিয়ে দিয়েছেন বুড়ো মালিক। দিদিমণির দাবী সেই এক। স্যার খুব ভালো ভাবে বোঝালেন,এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণই একমাত্র উপায়। মালিককে বাইরে পাঠিয়ে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলেন শ্রমিককে, “দিদিমণি আপনি চুপ থাকুন। ভাই সত্যি বলতো, দশ মাস ধরে তুমি তো বসে নেই, কিছু করছ তো?” প্রসঙ্গত ওনারা যদিও বলেননি, কিন্তু আমরা জানতাম যে লোকটি টুকটাক কাজ করছে। ব্যাপারটা ওনাদের কাছে ইগোর পর্যায়ে চলে গেছে, মালিক শ্রমিক একই পাড়ার বাসিন্দা, একজন আর একজনকে বসিয়ে দিয়েছে, এবার এ শ্রম দপ্তরের সাহায্যে বুড়োকে উচিৎ শিক্ষা দিতে চায়, তাই ঐ চাকরিটাই ওদের চাই। স্যারের সামনে যদিও তা স্বীকার করল না, লোকটি বলতে গেল, “ঐ আর কি-“। দিদিমণি হাত নেড়ে বললেন,”সেটা কথা নয়। নতুন ছেলেটিকে ছাড়িয়ে...”।
অনেক ধস্তাধস্তির পর স্যার উভয় পক্ষকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে এবং নিতে রাজি করলেন। ঠিক হল, পরের মিটিং এ এসে এরা জানাবে, কত চায়, ওদের ওটা দিতে হবে, যেহেতু দোষ মালিকেরই।
নির্দিষ্ট দিনে এলেন সকলে, স্যার আগে সস্ত্রীক শ্রমিকের সাথে কথা বললেন, ওরা কোন টাকা ঠিক করে আসেনি, স্যার যা বলবেন তাই নেবে। স্যার বললেন, তিন মাসের বেতন যাতে ও পায় উনি সেই দাবীই জানাবেন, শ্রমিক রাজি হয়ে ঘাড় নাড়াতে লাগল, দিদিমণি শক্ত হয়ে বসে রইলেন, মালিক এল, স্যার কথা পাড়তে যাবেন, দিদিমণি ফোঁৎ করে বলল, “ঐ কটা টাকায় কি হয়? নতুন ছেলেটাকে দূর করে আমার বরকে তার পুরানো চাকরী ফেরত দিতে হবে।“স্যার হতাশ হয়ে বললেন, “অনিন্দিতা ১২/৪ করে দাও।এর কোন মীমাংসা হওয়া সম্ভব নয়।“ ১২/৪ হল ফেলিওর রিপোর্ট। হয়ে যাওয়া কেস দু- দুবার এভাবে কেঁচে যেতে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল, ক্লান্ত হাতে নোটশিট লিখছি, আড়চোখে দেখলাম, শ্রমিকটি মাথা নিচু করে বসে আছে্‌, একবার চোখ তুলে তাকালো এক রাশ হতাশা নিয়ে প্রশ্ন করল, “এবার কি হবে? কোথায় যাব?” কি জবাব দেব? সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করার পর যদি হেরে যেতে হয়, তাও যার জন্য লড়াই তারই নির্বুদ্ধিতায়, কিই বা বলার থাকে-