Saturday, 18 June 2016

হিমি


চতুর্দিক সাদা। চোখ ঝলসানো ধপধপে সাদা নয়, বরং নরম, কোমল, আরামদায়ক চোখ জুড়ানো সাদা। কি রকম যেন ধোঁয়াটে। চোখ খুলেই হিমির মনে হল, ও নির্ঘাত হাসপাতালে আছে। চোখ বন্ধ করতেই স্মৃতিপটে জেগে উঠল সেই দুটো চোখ। উফ! কি নির্মম, হিমশীতল, ঘন কৃষ্ণবর্ণ এক জোড়া চোখ। বাকি মুখটা কাপড় জড়ানো, পরিষ্কার বাংলায় ওকে প্রশ্ন করেছিল।হিমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, উত্তরটা মনে করার, কিন্তু তীব্র আতঙ্ক বারবার ভুলিয়ে দিচ্ছিল সবকিছু। উত্তরটা ওর জানা ছিল। আফ্রিকার কোন শপিং মলে ঠিক এভাবেই ওরা বহু লোককে হত্যা করেছিল। সার দিয়ে সবাইকে দাঁড় করিয়ে, কেবল একটা প্রশ্ন করেছিল, যাতে বোঝা যায় কারা ওদের ধর্মাবলম্বী আর কারা নয়। যারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছিল তাদের আর বেঁচে থাকতে দেয়নি ওরা।
        হিমির বস ওদের ধর্মানুসারী, কাগজে আফ্রিকার ঘটনাটা পড়ে এত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল হিমি যে পরদিনই অফিসে গিয়ে বসকে জিজ্ঞাসা করেছিল উত্তরটা। বস ভাবতে এত সময় নিয়েছিলেন যে, হিমি অসহিষ্ণু হয়ে বলেই ফেলেছিল, “এত সময় লাগালে, ওরা আপনাকেও ছাড়বে না!” বাড়ি ফিরে নিজের বরকে আর শিশুকন্যাকে পাখি পড়া করে শিখিয়েছিল উত্তরটা। সৌর বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “এখানে ও সব হবে না রে বাবা। তুই নিশ্চিন্ত থাক।” তাও হিমি আশ্বস্ত হয়নি, কে জানে বাবা, ভারতবর্ষের ওপর সকলের এত রাগ। আর আজ হিমি নিজেই মনে করতে পারছে না! কি বলেছিলেন স্যার, নাফিসা ? নাকি আয়েশা? জবাব দিতে পারবে না হিমি, আতঙ্কের সাথে সাথে তীব্র অভিমান ওর কন্ঠ রোধ করছিল। কেন ওরা এভাবে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে?
খুব একটা দামি নয় মলটা, বেশির ভাগই অফিস ফেরতা মধ্যবিত্ত, সবৎসা গৃহবধূ আর কলেজে পরা উঠতি প্রেমিক-প্রেমিকা। হিমিও তো এসেছিল অফিস ফেরত ক্রিম কিনতে। ওর মেয়ে চিকেন ভর্তা খেতে খুব ভালবাসে, ক্রিম দিলে স্বাদটা ভালো হয়। সবে ক্রিম এর কার্টনটা হাতে নিয়েছে এমন সময় প্রবল শোরগোল, ফটফট করে গুলি চালানোর আওয়াজ। লুকানোর সুযোগ দেয়নি ওরা। বাথরুম থেকে টেনে টেনে সবাইকে বার করেছে, ন্যূনতম প্রতিরোধ যারা দেখাতে গেছে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছে তৎক্ষণাৎ। হিমির চোখের সামনে এক প্রতিবাদী বৃদ্ধ শিখের মাথায় গুলি করল। রক্ত আর ঘিলু ছিটকে এসে লাগল তাকে থরেথরে সাজানো সুদৃশ্য খাবার গুলির গায়ে। থরথর করে কাঁপছিল হিমি। আত্মপক্ষ সমর্থনে কিনা জানে না, কিন্তু উগ্রপন্থীগুলো প্রত্যেককে হত্যা করার সোচ্চারে বলছিল, এটা কিছু বছর আগে ঘটে যাওয়া এক দাঙ্গার প্রতিশোধ। কোথায় একদল পাষণ্ড নির্বিচারে কিছু মানুষকে হত্যা করেছিল, তার জন্য তো হিমি কোন অংশে দায়ী নয়। বরং দাঙ্গাকারীদের যখন কোর্ট কঠিন সাজা দিয়েছিল,  হিমি উল্লসিত বোধ করেছিল। যে গণধর্ষিতা মায়ের চোখের সামনে তার শিশুকন্যাকে আছড়ে মেরেছিল নরাধম পশু গুলো তার বেদনা এই আতাতায়ীদের থেকেও বেশি উপলব্ধি করেছিল হিমি।নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে হুহু করে কেঁদে ফেলেছিল তার দুঃখে।  
এই সব ভাবতে ভাবতেই লোকটা এসে দাঁড়িয়েছিল ওর সামনে, পরিষ্কার বাংলায় প্রশ্ন করেছিল, উদ্যত বন্দুক তাগ করে। হিমি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “নাফিসা”। তারপরই চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল দম চাপা আতঙ্কে। শুধু মনে পড়েছিল পুটুস অপেক্ষা করছে।  
এটা যদি হসপিটালই হয়, তাহলে ডাক্তার, নার্স, স্যালাইন কিছুই নেই কেন? এমনকি হাসপাতালের সেই চেনা গন্ধটাও নেই।হিমি একা দাঁড়িয়ে আছে, সকালে যা পরে বেরিয়েছিল, এখনও তাই পরে আছে, শুধু রঙগুলো অস্বাভাবিক হাল্কা প্রায় সাদাটে লাগছে। হয়তো পারিপার্শ্বিকের প্রভাব। কাধের ব্যাগটা নেই। ব্যাগটা কোথায় গেল? ব্যস্ত হয়ে পড়ল হিমি। সৌরকে খবর দেওয়াটা জরুরী। অফিস থেকে বেড়িয়ে জানিয়েছিল মল ঘুরে বাড়ি ফিরবে। সৌর চিন্তা করবে। কখন বাড়ি ফিরতে পারবে কে জানে? পুটুসের মাসির বাড়ি যাবার সময় হয়ে এল কি? কটা দেখতে গিয়ে দেখে হাতে ঘড়িটা নেই। কোথায় ফেঁসেছে ও।
চারিপাশ যেন সাদা মেঘে ঢাকা, না জানি কতক্ষণ ধরে ঘুরছে হিমি, একটাও চেনা লোক দেখতে পেল না। উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে, মনে হাজার প্রশ্ন জবাব দেবার কেউ নেই। ভুল বললাম, চারিদিকে অগণিত মানুষ। অথচ কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। সবাই কি মৌন ব্রত ধারণ করল নাকি? রিমি একাধিক লোককে জিজ্ঞেস করল, কেউ বলতে পারল না ও কোথায় আছে। সবথেকে আশ্চর্যের কথা হল, এখানে নানা প্রজাতির মানুষ আছে, কেউ শ্বেতাঙ্গ, কেউ বা কৃষ্ণাঙ্গ, কেউ পীত বর্ণ, কারো ছোট চোখ থ্যাবড়া নাক আবার কারো শরীরে খাঁটি আর্য রক্ত সোচ্চারে নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করছে। মূল্যবান জামাকাপড় পরা মানুষ ও যেমন আছে তেমনি লেঙটি পরা লোকজনেরও অভাব নেই।এমন কি আলখাল্লা পরা আরব দেশীয় লোক ও আছে। হিমি যাকে যে ভাষাতেই প্রশ্ন করুক না কেন, সকলেই বাংলায় জবাব দিল। কেউ বলতে পারল না ও কোথায় আছে। কেউ জানে না। পুটুস বারন্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে, মা কখন আসবে আর পুটুসের মা পথ হারিয়ে ঘুরে মরছে, বুক ফাটা কান্না এত ক্ষণে গলা চিরে বেরিয়ে এল। “আ- হা-হা-হা” করে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে হিমি। গ্রাম্য মহিলাদের মত বুক চাপড়ে চাপড়ে “পুটুস- পুটুস রে” বলে, হঠাৎ এক স্নেহময় হাতের স্পর্শে চমকে উঠল।
সাদা বোরখা পরা এক মধ্যবয়সী মহিলা, পাকিস্তানী বর্ষীয়সী অভিনেত্রী সামিনা পিরজাদার মত দেখতে, ওর পাশে বসে ওর পিঠে হাত বোলাচ্ছে। দেখে ভারতীয় মনে হয় না, মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দা বোধ হয়। হিমি অশ্রু সজল চোখে তার দিকে তাকাল, মহিলা বাংলায় বলল, “কাঁদে না বেটি। কাঁদে না। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হবে। প্রিয়জনেদের জন্য দিল খুব দুখবে। ভুলে যাবার চেষ্টা কর। না হলে এগোতে পারবে না। এখানেই আটকে থেকে যাবে।” কি ভুলে যাবে? হিমি আবার জিজ্ঞাসা করল, “ আমি কোথায় মা? এটা কোন জায়গা?” মহিলা করুণ ভাবে বলল, “এটা কোন জায়গা আমিও জানি না। মৃত্যুর অব্যবহিত পরে আমাদের এখানে আসতে হয়। জাগতিক টান যতদিন না কাটে আমরা এখানেই থেকে যাই। তারপর কোথায় যায় জানি না। বেহেস্তে নাকি দোজখে, নাকি আবার পৃথিবীতে ফিরে যায় তাও আমি জানি না। যারা এখান থেকে চলে যায় তারা আর ফিরে আসে না।” হিমির অবিশ্বাসী মন, বেদনাতেও হেসে উঠল, পাগল মহিলা। মহিলা বেদনার্ত চোখে তাকাল, “ না মা। এখানে কেউ পাগল নয়। তবে যারা নতুন আসে তারা কেউ বিশ্বাসই করতে পারে না, যে তাদের ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে।” সদ্য মৃত শব্দটা তপ্ত সীসার গুলির মত হিমির কানে প্রবেশ করল। হিমির মন চিৎকার করে উঠল, না না না। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ মা প্লিজ বল কি করে বাড়ি যাব? বাড়িতে আমার ছোট্ট মেয়েটা--” গলা বুজে এল হিমির। মহিলা অল্প হাসলেন, কান্নার চেয়েও করুণ সে হাসি। “ বাড়ির জন্য আমারও বড় মন কেমন করে রে। কবে এসেছি, আজো পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারলাম না। জানিস আমাদের দেশে বড় যুদ্ধ চলছে। বারো মাস গুলি গোলা চলে, বোমা ফাটে, আকাশে বোমারু বিমান চক্কর কাটে। বেওয়া  আমি এরই মাঝে কত কষ্ট করে মেয়েটাকে বড় করলাম। বিয়ে দিলাম অথচ সেই মেয়ে আমার তালাকশুদা হয়ে ফিরে এল দু-দুটো বাচ্ছা নিয়ে। যুবতী মেয়ে আমার, তায় রূপবতী, চারিদিকে কাক চিল উড়ছে, আইনশৃঙ্খলার বালাই নেই। দুশ্চিন্তায় ঘুম আসত না। একদিন রাতে বুকে অসহ্য বেদনা, জ্ঞান হারালাম। চোখ খুলে দেখি এখানে। কত কেঁদেছি জানিস? বুড়া বাবা না থাকলে কি হত কে জানে? নতুন যারা আমার বা তোর মত দিশেহারা হয়ে পড়ে, বুড়া বাবাই তাদের সাহারা।”
মহিলা কিছুই বলতে পারবে না বুঝতে পেরে হিমি ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। মহিলা ওকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন। মাথায় আলতো আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, হঠাৎ কাকে দেখে যেন বলে উঠলেন, “ খুব কাঁদছে। নতুন এসেছে তো। আপনিই পারবেন সামলাতে বুড়া বাবা।” মহিলার বুক থেকে মুখ তুলে হিমি অত দুঃখেও হেসে ফেলল। সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আদৌ বুড়ো নয়। কত হবে বছর পয়তাল্লিশ, মাথায় ছয় ফুট তো বটেই। গৌর বর্ণ, তীক্ষ্ণ নাসা, ঠোঁটের ওপর পাতলা প্রজাপতি গোঁফ। রীতিমত সুদর্শন। কিন্তু কি পরেছে রে বাবা? মাথায় চকচকে পাথর বসানো উষ্ণীষ, গায়ে সিল্কের ঝলমলে জোব্বা, তলায় চুড়িদার, কোমরে নাচের সময় মেয়েরা যেমন পরে তেমনি সোনালি রঙের কোমরবন্ধনী, তাতে আবার একটা সুদৃশ্য তরোয়ালের খাপ ঝোলানো আছে। যদিও খাপটা খালি। 
(চলবে)

Wednesday, 15 June 2016

এই হঠাৎ পাওয়া মন খারাপ

আয়নার সাথে বিশেষ প্রীতি কোনদিনই ছিল না মেয়েটার।
আয়না যে তাকে দেখলেই বলে, "মেয়ে তুই বড় সাধারণ।"
আয়নার কথা শোনার সময় কোথায়, নির্দয় জীবন সংগ্রামে ব্যপ্ত যে-
কদাচিৎ গভীর রাতে গিয়ে বসত, আয়নার কাছে , আলতো হাতে ধুলো ঝাড়ত, আয়না মুখ খুললেই, সে উঠে যেত।

হঠাৎ একদিন প্রশ্ন করল, “ বল দেখি আয়না, কেমন লাগছে?”
প্রভাতী সূর্যের আলোয় চোখ ঝলসে গেল আয়নার, মৃদু হেসে বলল, “মন্দ কি?”
তারপর আয়নাই হল তার প্রিয় সখী। আয়না জানল, কে যেন একটা এসেছে।
তার জন্য বার মাসই বসন্ত, তার জন্যই দুধের সর, মেঘলা রঙের শাড়ি, অপটু প্রসাধন, দুই ভ্রুর মাঝে ছোট্ট কুমকুমের ছোঁয়া।

সেদিন প্রাক বর্ষার বৃষ্টিতে প্লাবিত মহানগর, জল থৈথৈ চরাচর, উদ্বিগ্ন আয়না অপেক্ষা করছিল তার প্রিয় সখীর-
সে এল, ধুয়ে গেছে কুমকুম, ঝরে গেছে প্রসাধন, মাথা নত করে বসে রইল বহুক্ষণ,
বুঝেও নির্বাক রইল আয়না। চোখ তুলে তাকালো সে আয়নার দিকে, “চলে গেছে।”
তার চোখে অকাল শ্রাবণ, “ সে আমার ছিল না। তবু –”
মৃদু হাসল আয়না, মাথা নত করে সে বলল, “ তুমি বলেছিলে। সত্যি বড় সাধারণ আমি। যদি আর একটু –”
“তুমি অনন্যা!” জোর গলায় বলে উঠল আয়না। অবিশ্বাসী চোখে তাকালো সে, মুছে নিল অশ্রুবারি, মেরুদণ্ড ফুলিয়ে বলল, “করুণা করছ? তুমিও”

আবার হাসল আয়না, “ পাগল? কাল আবার সূর্য উঠবে। যত্ন করে আঁকড়ে থেকো এই হঠাৎ পাওয়া মন খারাপ-”
#AninditasBlog
https://www.facebook.com/amianindita.blogspt.in/

Tuesday, 7 June 2016

সরিতা ভাবী (part-3)


শম্পার বিয়েতে বড়মার দুই মেয়েই এসেছিল, বেশ কিছুদিন ছিলও, যাবার সময়, দুই পিসিমাই বড়মাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলেও বড়মা গেল না। হেসেই উড়িয়ে দিল, “আমি তো দিব্যি আছি রে।আমার রিন্টি- সিন্নি আমায় ছাড়া থাকতে পারবে না। পুজোর সময় ওরা যখন মামার বাড়ি যাবে, তখন দু একদিনের জন্য নিয়ে যাস বরং।” বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বড়মার বড় জামাই, রিন্টি দের বালির পিসিমার বর মারা গেলেন। মেয়ের ঐ ঘোর দুর্দিনে কাঁদতে কাঁদতে বড়মাকে যেতেই হল, যাবার সময়, রিন্টিকে কথা দিয়ে গেল, কাজকর্ম মিটলেই চলে আসবে। শ্রাদ্ধশান্তি মিটলেও বালির পিসিমা ছাড়ল না বড়মাকে। সদ্য বিধবা কন্যাকে ফেলে বড়মাও আসতে পারল না। বালির পিসিমা অত্যন্ত ধনী, বাড়ির লাগোয়া নিজস্ব গঙ্গার ঘাট, ঘাটের লাগোয়া শিবমন্দির, বাড়ি ভর্তি পরিচারক- পরিচারিকা, খিদমৎ খাটার লোক। পিসিমা বোধহয় ভেবেছিলেন বড়মা শেষ জীবনটা গঙ্গাস্নান আর পুজোআচ্চা করে আরামে কাটবে। কিন্তু কাজের মানুষ তো, ও ভাবে শুয়ে বসে থাকতে বোধহয় একদম ভালো লাগত না। কাউকে না বলে, ভোর বেলায়, লুকিয়ে চা করতে গিয়েছিলেন, উনুনে নয় স্টোভে। ৭০% পোড়া অবস্থায় যখন পিজি হসপিটালে আনা হল, ডাক্তার বলেই দিলেন, জরুরীভিত্তিতে চিকিৎসা ওনারা করছেন বটে, তবে বড়মার বয়সে ঐ তীব্র দহনের জ্বালা সহ্য করা প্রায় অসম্ভব। সেদিন সকাল থেকেই মেঘলা ছিল, টিপিটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল, রিন্টির বাবা-মা, কাকা, জেঠু সবাই গিয়েছিল পিজি তে। মেজদাদু মাঝে মাঝে চোখ মুছছিল আর বলছিল, “ ও থাকতে চায়নি। কেন যে জোর করে আটকে দিল।” নিমতলা ঘাটে দাহ করে বাবাদের ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়েছিল সেদিন। বাড়ি ফিরেও মা গুনগুন করে কাঁদছিল, “আমরা যখন গেলাম, তখনও প্রাণ ছিল। কাঁচের বাইরে থেকে ঠিক আমায় চিনতে পারল। হাতের ইশারায় জিজ্ঞেস করল রিন্টি- সিন্নি কি করছে।” রিন্টি তখন আট, শুকনো চোখে অবাক হয়ে ভাবছিল, পিসেমশাই এর শ্রাদ্ধের দিনও বড়মা বলছিল, “একদম ভালো লাগছে না এখানে। দাঁড়া না কটা দিন যাক, এরা একটু সামলে নিলেই আমি চলে যাব।”
বড়মার মৃত্যুর কিছুদিন পর একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, কাকা-কাকিমা আলাদা হয়ে গেল। তলায় তলায় দ্বন্দ্ব চলছিলই। এত বড় পরিবারে, কিছুটা খাদ্য কৃচ্ছতা থাকেই, রেশ্নের চালের ভাত, রেশ্নের গম ভাঙানো আটার রুটি, মাথা পিছু আধখানা ডিম, এক পিস মাছ তাও সপ্তাহে দুদিন, ছোট ছোট করে কাটা খাসির মাংস, জলজলে পায়েস ইত্যাদি। এই নিয়েই অশান্তি দানা বাঁধছিল। কাকা-কাকিমা দুজনেই কলেজে পড়ান, বেশ ভালো মাইনে পত্র পান, কেন তাদের সন্তানসন্ততি রোজ মাছ খাবে না? বিশেষ করে কাকিমার আপত্তি ছিল নন্তুকে র্যা শন দোকানের চালের ভাত খাওয়াতে। সিন্নির বেলায় কাকিমা আলাদা করে ভাত করে নিত, এবার আর পারবে না। হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেল, একদিকে রিন্টির ঠাকুমা, মেজদাদু-মেজঠাম্মা, জেঠু- জেঠিমা, বাবা-মা আর রিন্টি। অন্যদিকে কাকা-কাকিমা-সিন্নি আর নন্তু। কাকাদের খাবার ঘরও আলাদা হয়ে গেল। ছুটির দিন হলে কাকারা কি খেল রিন্টিরা জানতেও পারত না। কিন্তু মুস্কিল হত, যেদিন কাকা-কাকিমা দুজনেই থাকত না। এক সাথে বড় দালানে খেতে বসত রিন্টি আর সিন্নি। রিন্টি দাল-পোস্ত ভাত আর সিন্নি মাছের ঝল-ভাত। তাতে সমস্যাটা কি হত সেটা রিন্টি বুঝত না। মা রোজ রাতে বাবাকে ফিসফিস করে শোনাত আজ কাকাদের কি রান্না হয়েছে, অথচ রিন্টির জন্য একটুও দেয়নি। কেন যে কাকিমা রিন্টির জন্য রাখবে, সেটাই তো রিন্টি বুঝে উঠতে পারত না। কাকিমা কোনদিনই রিন্টিকে পছন্দ করেনি। সিন্নি-নন্তুর জন্য আনা খেলনা তো দূরের কথা, সামান্য গল্পের বইটাও রিন্টিকে পড়তে দিত না। রিন্টি হ্যাংলার মত চাইত, তাও না। সিন্নির জন্য আনা আনন্দমেলা, চাঁদমামা গুলো একটু স্পর্শ করার জন্য রিন্টি হাঁকপাঁক করত, কিন্তু তাও হাত দেবার অনুমতি পেত না। কাকিমার সাফ বুলি, “বই আমি কাউকে দি না। কেউ বই ফেরত দেয় না।” আরে একই তো বাড়ি, একটা বই এ ঘর থেকে ও ঘর গেলে কি হারিয়ে যায়, কিন্তু কাকিমাকে কে বোঝাবে? রিন্টির চোখের সামনে পুরানো বই বেচে দেওয়া হত, তাও ওকে পড়তে দিত না কাকিমা। তবে জেঠুকে দিত। জেঠুর ঘরে লুকিয়ে বই পড়ত রিন্টি। একবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, কাকিমা জেঠুকে শারদীয়া আনন্দমেলাটা পড়তে দিল, আমায় কেন দিল না মা? আমি ছিঁড়ে ফেলব বলে?” মা খুব স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিয়েছিল, “না। আমরা গরীব বলে।” গরীব মানে কি? বাবার কারখানাটা অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ।বাড়িতে দিনরাত অশান্তি। বাবা-মায়ের ঝগড়া না কোনদিন হাতাহাতির রূপ নেয় রিন্টি সেই ভয়েই আছে।বাবা পাগলের মত টিউশনি খুঁজছে আর মা, গলার বার মাস পড়ার হারটা বেচে একটা সেলাই মেশিন কিনেছে, অবসর সময়ে মেজ ঠাকুমার কাছে শায়া-ব্লাউস, জামা বানানো শিখছে।
বিয়ের পর শম্পাও যেন কেমন বদলে গেছে। ইতিমধ্যে বরের সাথে কিছুদিনের জন্য দামস্কাস আর ডোহায় কাটিয়ে এসে যেন বড়ই উন্নাসিক হয়ে উঠেছে। ওদের পুরানো শহরটাকে আর সহ্যই করতে পারে না শম্পা। হাওড়ার থেকে খারাপ আর নোংরা শহর বুঝি আর পৃথিবীতে হয় না। এ বাড়ির রান্নাও আর শম্পার মুখে রোচে না। এ বাড়ির চা নাকি অখাদ্য, গয়লার দুধে নাকি নর্দমার জল মেশানো, এ বাড়ির আজন্ম ব্যবহৃত স্নানঘর, পায়খানা নাকি ব্যবহারের অযোগ্য। এ শম্পা রিন্টির পরিচিত নয়। রিন্টি বরাবরই দিদির গায়ে ঠেস দিয়ে বসতে ভালবাসত, শম্পা আগে বিরক্ত হত, ঠেলে সরিয়ে দিত। এ শম্পা বিরক্তি প্রকাশ করে না, ঠেলে সরিয়ে দেয় না, বরং এক অদ্ভুত শীতলতার সাথে নীরবে বিচ্ছিন্ন করে নেয়, মৃদু সরে বসে। রিন্টি গায়ে হাত বোলালে, হাসি মুখে তাকায়, কিন্তু অজান্তে শক্ত হয়ে যায় পেশী। রিন্টি গায়ে পড়ে কথা বলে, না বললে, শম্পা সে ভাবে কোন কথাই বলে না। রিন্টি একদিন মাকে বলেই ফেলল, “মা, দিদি যেন কেমন বদলে গেছে না? আজকাল আসেই না। এলেও ভালো করে কথা বলে না।” মা আনমনে সেলাইকল চালাতে চালাতে বলল, “ হ্যাঁ বদলে গেছেই তো। কথায় কথায় শ্বশুর বাড়ির বৈভবের গল্প করে, ও বাড়িতে নাকি মাসের শুরু- শেষ বোঝা যায় না। সারা মাসই মাছ আসে, এত বড় বর পিস। যার যটা ইচ্ছা খাও- এই সব বলছিল আর কি।” কথা বলতে বলতে হঠাৎ মা সোজা হয়ে বসল, “তোকে আজকাল পাত্তা দেয় না, না? দেবেই বা কেন? জানে তোর বাবার কারখানা বন্ধ। গরীব কাকা টিউশনি করে সংসার চালায়। আর তোকে দেখতেও তো তেমন সুন্দর নয়।” দেখতে ভাল নয়, তা রিন্টি জানে, ছোট থেকেই ঠাকুমা বলত, “ভাগ্যে রঙটা কালো হয়নি। নাহলে এর বিয়ে দেওয়া মুস্কিল হত। তবে সর্ব দোষ হরে গোরা।” তবে কি নিষ্কলুষ ভালোবাসার প্রতিদানে কি ভালোবাসা পাওয়া যায় না? প্রিয়জনেদের ভালোবাসাও অর্থ বা রূপের ওপর নির্ভরশীল?
(to be continued)
#AninditasBlog
https://www.facebook.com/amianindita.blogspt.in/

Saturday, 4 June 2016

সরিতা ভাবী (part-2)



এক সপ্তাহ স্কুল গেল না শম্পা। পরের রবিবার, সাজো সাজো রব পড়ে গেল, গোটা বাড়িতে। কারা যেন শম্পাকে দেখতে আসবে। বাইরের ঘরে, পেতে রাখা ফরাশে, নতুন ধপধপে চাদর পাতা হল। তেলচিটে তাকিয়া গুলোকে, ওয়াড় খুলে ভালো করে রোদ খাওয়ানো হল। কাকা রিণ্টি আর সিন্নিকে নিয়ে, উঠোনের শ্যাওলা সাফ করতে লাগল। কাকিমা তার কয়েক মাসের সদ্যজাত পুত্রকে কোলে নিয়ে, আলমারি থেকে বিয়েতে পাওয়া মূল্যবান কাঁচের প্লেট, গ্লাস, চামচ, বোন চায়নার কাপ-ডিস বার করতে লাগল। শম্পার হারমোনিয়ামটাকে ঝেরে-ঝুড়ে নামিয়ে এনে বাইরের ঘরের মাটিতে শতরঞ্চি পেতে বসানো হল। মূল্যবান চা পাতা, বিস্কুট, মিষ্টি আনা হল।বিকাল বেলায় তাঁরা এলেন, বেশ কয়েকজন সম্ভ্রান্তদর্শন পুরুষ এবং মহিলা, সঙ্গে একটি বাচ্ছা ছেলেও ছিল। রিণ্টির বাবা এবং কাকা খাতির করে এনে বসালেন পেতে রাখা ফরাশের ওপর। মেজদাদু এসে করজোড়ে নমস্কার জানিয়ে পাশে রাখা আরাম কেদারায় বসলেন, রিণ্টি এবং সিন্নি, যে যার মার রক্ত চক্ষু অগ্রাহ্য করে হারমোনিয়ামের দুপাশে গুটিগুটি গিয়ে বসল। বড়রা গল্পই করে যাচ্ছে, একি রে বাবা, রিন্টি আর সিন্নি যাত্রা দেখার উত্তেজনা নিয়ে জুলজুল করে তাকাচ্ছে, পাত্রপক্ষের সাথে আসা বাচ্ছা ছেলেটা পর্যায়ক্রমে একবার রিন্টি আর একবার সিন্নিকে মুখ ভ্যাঙাচ্ছে। বিরক্তি চরমে ওঠার ঠিক মুখোমুখি, কাকিমা শম্পাকে নিয়ে ঢুকলেন। পড়ন্ত সূর্যের কনে দেখা আলোয়, ড্যাম্প ধরা হাল্কা সব্জে রঙের চুনকাম করা ঘরটা যেন ঝলমলিয়ে উঠল। কাকিমাই সাজিয়ে দিয়েছে, একটা কাঁচা হলুদ রঙের তাঁতের শাড়ি, কানে দুটো ছোট সোনার ঝুমকো, দু হাতে দুই-দুই করে চারগাছা সোনার চুড়ি, চোখে হাল্কা কাজল, আর কপালে কুমকুমের ছোট্ট টিপ। পায়ের নুপুরে মৃদু রিনিরিনি আওয়াজ করে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল শম্পা। দু-হাত জোড়া করে নীরবে নমস্কার জানিয়ে, মাটিতে পেতে রাখা শতরঞ্চিতে বসতে যাবে, ওনারা হাঁহাঁ করে উঠলেন, ওনাদের পাশে গিয়ে বসল শম্পা। মাথা নিচু করে সব প্রশ্নের জবাব দিল, প্রশ্নোত্তর পর্বের অন্তে মেজদাদুর ছদ্ম অনুরোধে গান ধরল শম্পা, “গোধূলি গগনে মেঘে, ঢেকেছিল তারা----।” রিন্টির বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠল, ওঁরা নিয়ে চলে যাবে ওর দিদিকে? মনের গভীরে রিন্টি বারংবার প্রার্থনা করছিল, “হে মা দুর্গা, হে বাবা পঞ্চানন, হে নারায়ন, দোহাই, দিদিকে যেন ওঁরা নাপসন্দ- নাকচ করে দেয়।” যদিও বেশ ভালই বুঝেছিল, যে তা অসম্ভব।
ওরা চলে গেলেন। জানিয়ে গেলেন, দু একদিনের মধ্যেই খবর পাঠাবেন। শম্পাও আবার স্কুল যাওয়া শুরু করল। ওঁরা সত্যিই খবর পাঠিয়েছিল, শম্পাকে ওদের খুব পছন্দ। কিন্তু বয়সটা বড়ই অল্প, তাই ওঁরা অপারগ। জেঠিমা যখন রিন্টির মাকে কথাটা বলছিল, ওর মা তখন রান্নাঘরে রুটি বেলছিল, আর জেঠিমা সেঁকছিল, ভাগ্যক্রমে সেই সময় রিন্টি ঘুম পেয়েছে বলে মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়েছিল । পরের রবিবার আবার একদল দেখতে এল, আগের বারের মত না হলেও এবারেও যথেষ্ট আয়োজন করা হল। এদের খুব পছন্দ হয়ে গেল শম্পাকে। ওনারা জানালেন, বিয়ে পাকা হয়ে যাক, কিন্তু শম্পা বড়ই ছোট। সবে দশম শ্রেণীতে উঠেছে, স্কুল ফাইনাল এবং উচ্চ মাধ্যমিকটা অন্তত পাশ করুক। কলেজে উঠলে বিয়েতে ওনাদের কোন আপত্তি নেই। এবারের সম্পর্কটা এরাই বাতিল করে দিল। অতদিন অপেক্ষা করতে নারাজ জেঠিমা। পরের পরের রবিবার আর একদল দেখতে এলেন। এঁরা অত্যন্ত ধনাঢ্য, দেখেই বোঝা গেল। নাকি শোভাবাজারের অত্যন্ত বনেদী পরিবার। ধপধপে সাদা কন্টেসা গাড়ি চেপে ওঁরা এলেন, অল্প দুচার কথায় সম্পর্ক পাকা হয়ে গেল, পাত্র সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শম্পার থেকে বয়সে একটু বড়, তা হোক ঠাকুমা বলল, “সোনার আংটি আবার বেঁকা।” শম্পার হবু শাশুড়ি, জেঠিমার দুহাত জড়িয়ে বলে গেলেন, “কিচ্ছু চিন্তা করবেন না। ও আমাদের মেয়ের মত থাকবে। আমরাই পড়াব।” গিনির মালা দিয়ে আশীর্বাদ করে গেলেন শম্পার হবু শ্বশুর।
দেড় মাসের মাথায়, বিয়ে হয়ে গেল শম্পার। তড়িঘড়ি আয়োজন করতে গিয়ে অনেক গুলো ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙতে হল জেঠুকে। অনেক টাকার সুদ মারা গেল। সঞ্চয়িতা চিট ফান্ডে টাকা রেখে ইতিমধ্যেই একবার বিরাট লোকসান হয়েছিল ওনার, সেই চোট সারার আগেই এত গুলো টাকা হারিয়ে তথা ধনী বেয়াই বাড়ির সাথে সৌহার্দমূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বেপোট প্রেশার- সুগার বাড়িয়ে ফেলল জেঠু। নির্বিঘ্নে বিয়ে করে হাসতে হাসতে শ্বশুর বাড়ি চলে গেল শম্পা, যাবার সময় এক ফোঁটা কাঁদলও না। সবাই হাউ হাউ করে কাঁদছিল, মেজদাদু, বড়মা, ঠাকুমা, মেজ ঠাম্মা, জেঠু, জেঠিমা, রিন্টির মা, রিন্টি, সিন্নি সবাই। কাকা বা রিন্টির বাবার চোখও ছলছল করছিল। রিন্টির মা একবার বলেই ফেলল, “শম্পা তুই শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিস। সেই শোভাবাজার। চাইলেও আর আমাদের দেখতে পাবি না। তোর কি কোন কষ্ট হচ্ছে না? একটু তো কাঁদ?” কি অসহায় বোকা বোকা ভাবে তাকাচ্ছিল শম্পা, রিন্টি বেশ বুঝতে পারছিল, হাজার চেষ্টা করেও কাঁদতে পারছে না শম্পা।নীরব বোবা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল, খাঁচায় বন্দী পাখির মত। শুধু বরের গাড়ি যখন ছেড়ে যাচ্ছে, জেঠুর হাতটা জড়িয়ে একবার ডুকরে কেঁদে উঠল, জেঠু ওর মাথায় হাতটা রাখতে গেল, তার আগেই হুস করে বরের গাড়ি এগিয়ে গেছে অনেকটা। ফুল দিয়ে সাজানো সেই সাদা কন্টেসা--।
শম্পা চলে যাবার বছর দেড়েকের মাথায় বড়মাও চলে গেল। সেই কোন তরুণী বয়সে, অকাল বিধবা বড়মা তার দুই নাবালিকা কন্যার হাত ধরে বাপের বাড়ি এসে উঠেছিলেন তা আজ আর কারো মনে নেই। বড়মার দুই মেয়েই রিন্টির জেঠুর থেকে বড়, এ বাড়ি থেকেই তাদের বিয়ে হয়েছে, এবং উভয়ই অত্যন্ত ধনী তথা সমৃদ্ধশালী পরিবারের পুত্রবধূ। তা সত্ত্বেও বড়মা যে কেন তার বাপের ভিটেতে পড়ে থাকত, তা কেউ জানত না। মা, জেঠিমা আর কাকিমা সুযোগ পেলেই মৃদু অভিযোগ করত, যে বড়মার মেয়েরা মায়ের বিন্দুমাত্র খোঁজ খবর রাখে না। বড়মার অবশ্য বিন্দুমাত্র হেলদোল ছিল না। এ বাড়ির প্রতিটা শিশু বড়মার নিজের হাতে মানুষ, রিন্টি, সিন্নি মায় সিন্নির পুঁচকে ভাই নন্তু যখন হল, আঁতুড়ের সব কাজ একা হাতে বড়মা করেছে। সকাল থেকে বড়মা রান্না ঘরে গিয়ে ঢুকত, সবাই অফিস কাছারি বেরিয়ে গেলে ঠাকুমা-মেজ দাদু- মেজ ঠাম্মা আর বড়মা বেলা বারোটায় জল খাবার খেত। কি সাধারণ ছিল সেই জলখাবার, একটু ডাল, হাতে গড়া রুটি আর একটু চিনি না হলে ভেলি গুড়। সারাদিন যে যা বলত ছুটে ছুটে সেই ফরমায়েশ পালন করত বড়মা। বাবা বা কাকা চা করতে বললে কি খুশিই যে হত। বিকাল চারটের আগে ভাত খেত না। চারটের সময়, ভাত, ডাল, একটু নিরামিষ তরকারি আর অম্বল, এই ছিল নিত্যনৈমিত্তিক আহার। কত রকমের যে অম্বল রাঁধতে জানত বড়মা। কুমড়ো, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, বড়ি দিয়ে, কাঁচা তেঁতুল দিয়ে, শীত কালে মুলো দিয়ে, টমেটো দিয়ে কি অসাধারণ অম্বল রাঁধত বড়মা। কিছু না পেলে পাকা তেঁতুল গুলে চিনি দিয়ে টক। বিকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে, বড়মার পাতে অম্বল দিয়ে মাখানো এক গাল ভাতের স্বাদ বোধহয় জীবনেও রিন্টির মুখ থেকে যাবে না।
সন্ধ্যে বেলা, পড়ার জন্য যে যার মায়ের হাতে ঠ্যাঙানি খেয়ে, কেঁদে চোখ মুখ ফুলিয়ে বড়মার কোলে আশ্রয় নিত রিন্টি আর সিন্নি। গ্রীষ্ম কালে উঠোনে পেতে রাখা চৌকিতে, বড়মার দুপাশে দুই বোনে শুয়ে শুয়ে গল্প শুনত, আর শীত কালে, খাটে লেপের তলায় শুয়ে।রামায়ণ, মহাভারত থেকে রাজা-রাণী- রাজপুত্র-রাজকন্যা- রাক্ষস- খোক্কশ-ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমীর সাথে পরিচয় তো বড়মার মাধ্যমেই। এমনকি ইতিহাসের সাথে প্রাথমিক পরিচয়ও বড়মার হাত ধরে। অ্যালেকজান্ডার- পুরু, চন্দ্রগুপ্ত- কৌটিল্য, চণ্ডাশোক- ধর্মাশোক হয়ে বাদশাহ আকবর, হতভাগ্য শাহ জাহান, নিষ্ঠুর ঔরংজেব, বর্গীদের আক্রমণ, সিপাহী বিদ্রোহ, হয়ে ভারত ছাড় আন্দোলন কিছুই বাদ দিত না বড়মা। গল্পের সাথে সাথে নাটকীয় ভাবে উঠত নামত বড়মার কণ্ঠস্বর, কখনও ভয়ে কুঁকড়ে যেত দুই বোন, কখনও আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠত। গল্প বলতে বলতে বড়মা যার দিকে ফিরে শুত, অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে বড়মার মুখটা টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিত। এই নিয়ে প্রায়ই মারামারি লেগে যেত ওদের। সেই বড়মা যে এত তাড়াতাড়ি ওদের ছেড়ে চলে যাবে রিন্টি স্বপ্নেও ভাবেনি। কেন যে ভালবাসার মানুষ গুলো এত দ্রুত হারিয়ে যায়?
#AninditasBlog

https://www.facebook.com/amianindita.blogspt.in/
 

Thursday, 2 June 2016

সরিতা ভাবী (part-1)




সরিতা ভাবীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা রিন্টি আজো ভোলেনি। তখনও অবশ্য সরিতা ‘ভাবী’ হয়নি। সবাই ওকে পানওয়ালার মেয়ে বা পাঁড়েজীর কন্যা বলেই চিনত। সেটা আশির দশকের প্রথমার্ধ। রিন্টির জীবনের সবথেকে সুন্দর সময়। আজ বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হয় সেই সময়টা যেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা কোন গল্প ছিল। মধ্য হাওড়ায় নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা ফ্ল্যাটবাড়ি তখন নেহাতই দুর্লভ। রিন্টিদের ছিল বিশাল যৌথ পরিবার। ঠাকুমা, তাঁর তিন ছেলে, তিন পুত্রবধূ, তিন নাতনী এছাড়াও নিঃসন্তান মেজ দাদু আর মেজ ঠাম্মা, আর ছিল বিধবা বড়মা অর্থাৎ রিন্টির বাবার বড় পিসিমা। এছাড়াও ছিল দুজন পরিচারিকা, স্বামী পরিত্যক্তা জ্যোতিদি আর অনাথা টেঁপিদি।

তখন রবিবার মানেই জল খাবারে আটার লুচি, আলু চচ্চড়ি আর আখের গুড়। রবিবার মানেই দুপুরে খাসির মাংস, অবশ্য মাসের শেষ রবিবার বাদে। মুরগী ঢুকতই না অধিকাংশ হেঁসেলেই। রেডিও মানেই কলকাতা ‘ক’ আর বিবিধভারতী। গোটা মহল্লায় কারো বাড়িতে টেলিফোন ছিল না। রিন্টির বাবা-কাকারা অফিস কামাই করলে সেই বড় রাস্তা টপকে পাশের পাড়ার পুনু পিসিমার বাড়ি যেত একটা ফোন করে অফিসে খবর দিতে। একটা কল করতে কত টাকা লাগে কোন ধারণা ছিল না রিন্টির, তবে , না কোনদিন বাবা-কাকা টাকা দিয়েছে, না কোনদিন পুনু পিসি তাদের ফোন ব্যবহার করা নিয়ে কোন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বরং কেউ এলে তাঁর সাথে গল্প করতে পেলে বেঁচে যেত পুনু পিসি। ফোন শেষ হতে না হতেই দু কাপ চা আর মেরি বিস্কুট নিয়ে হাজির হয়ে যেত পুনু পিসি। আর রিন্টির জন্য বরাদ্দ ছিল দুটো মোড়ের মাথার গুপ্তর দোকানের রসগোল্লা। তখনও বাচ্চারা চা খেত না। কম করে আধঘণ্টা বকবক করে তারপর ছাড়ত। কাকা প্রত্যেক বার পুনু পিসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলত, “উফঃ। এই শেষ আর আসছি না এই গপ্পে বুড়ির কাছে। বছর ঘুরে গেল অ্যাপ্লাই করেছি, আজও আমাদের টেলিফোন এল না।”

তখন কেবল রিন্টিদের বাড়িতেই টিভি ছিল। বিরাট বড় শাটার টানা টেলেরামা টিভি, একটাই চ্যানেল আসত, “দূরদর্শন”। আজো মনে পড়ে বুধবার হিন্দি গানের চিত্রহার, বৃহস্পতি বার বাংলা গানের চিত্রমালা, শনিবার সন্ধ্যায় বাংলা, রবিবার দুপুরে আঞ্চলিক ভাষার চলচিত্র আর রাতে হিন্দি ছায়াছবি। পাড়ার কুচোকাঁচা আর মেয়ে বউদের ভিড় লেগে যেত।আর খেলা থাকলে ছেলেবুড়ো দের। সেটা ছিল টেস্টের যুগ। যদি ইন্ডিয়া-পাক বা ইন্ডিয়া-ওয়েস্টইন্ডিজ এর টেস্ট থাকত, তো রিন্টির বড় জেঠু অফিসে ডুব মেরে সারাদিন টিভি চালিয়ে বসে থাকত। আর মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ থাকলে তো কথাই নেই। গোটা মহল্লায় অঘোষিত কার্ফু কেবল রিন্টিদের টিভির ঘর ছাড়া। মোহনবাগান গোল দিলেই সেদিনের পুঁচকে ছেলে গুলো নাচতে শুরু করে দিত। “গো—ও-ও-ল” বলে চিৎকার বোধহয় শোনা যেত এক মাইল দূর থেকেও । মাঝে মাঝেই এত শোরগোল হত, যে ঠাকুমা রেগে গিয়ে গৃহত্যাগের হুমকি দিত। তবে সব উত্তেজনায় জল ঢেলে দিত, “রুকাবট কে লিয়ে খেদ হ্যাঁয়” বা “অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় আমরা দুঃখিত।” সবার ওপরে ছিল কাকের উৎপাত বা বেমক্কা ঝড়ে অ্যান্টেনা ঘুরে যাওয়া। কাকা বাড়িতে থাকলে কাকাই দৌড়ত নাহলে পাশের বাড়ির বুকাই দাদা একটা পুরানো ঝুলঝাড়া নিয়ে দৌড়ত। আর ছিল লোড শেডিং। কি লোড শেডিং হত বাপরে বাপ। কখনও কখনও সারা রাত কারেন্ট আসত না। গোটা মহল্লায় শুধু একটা বাড়িতে এসি কারেন্ট ছিল, বাকি সকলেরই ডিসি। সামান্য ঝড় হত আর তার ছিঁড়ে যেত। আলো চলে গেলেই রিন্টি আর ওর জেঠতুতো দিদি শম্পা দৌড়ত, দোতলার বারন্দা থেকে উকি মেরে দেখার জন্য যে কার কার বাড়িতে কারেন্ট গেল। যদি কারো না থাকে তাহলে শান্তি, নাহলে রিন্টির বাবা এত বড় পাঁচ সেলের টর্চ নিয়ে দেখতে যেত, মিটার বক্সের ফিউজ উড়ে গেল কিনা। এসি কারেন্ট ওলা বাড়িতে লোডশেডিং প্রায় হতই না। রিন্টির জেঠিমা তাই রেগে গজগজ করত, “এসি টা হল বড়লোকের কারেন্ট। তাই ওদের আলো যায় না।”

তখনও পাড়ার ছেলে ছোকরারা গুরুজনের সামনে সিগারেট খেত না। পাড়াতেই ছিল পাঁড়েজির পান বিড়ী সিগারেটের দোকান, কিন্তু কাকা সিগারেট কিনতে যেত, বড় রাস্তা পেরিয়ে পাশের পাড়ার ভোলার দোকানে। লুকিয়ে ক্লাব ঘরে বা ছাতে গিয়ে ফুঁকত। জেঠু আর মেজদাদুর সামনে দিয়ে একা একা সিগারেট কিনতে যেতে সাহস হত না, তাই খুব প্রয়োজন হলে রিন্টি আর ওর খুড়তুতো বোন সিন্নিকে বেড়াতে নিয়ে যাবার ছুতো করে বেরত। সেদিনও তাই হয়েছিল। রিন্টি তখন তিন আর সিন্নি এক বছরের। এক হাতে রিন্টির হাত ধরে আর কোলে সিন্নিকে নিয়ে কাকা গিয়েছিল সিগারেট কিনতে। মোড়ের মাথায় পৌঁছে দেখে একটা বছর এগার-বারোর মেয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে। কাকা জিজ্ঞেস করল, “এই তুই পান- ইয়ে মানে পাঁড়েজির মেয়ে না? কি যেন নাম?” মেয়েটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে মাথা নাড়ল, “সরিতা”। পরনে সাদা ফ্রক, লাল বেল্ট, মাথার চুল লাল ফিতে দিয়ে কলা বিনুনি করা, পিঠে হলুদ রঙের স্কুল ব্যাগ। বেশ লম্বা এবং ততোধিক মোটা। ব্যাঙের মত মুখ আর অস্বাভাবিক মোটা এক জোড়া ঠোঁট। বেশ কুদর্শন, ক্রন্দনরতা বলে আরও কদাকার লাগছিল। কাকা আবার জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন? আজ পরীক্ষা বুঝি? আর তুই নির্ঘাত কিছু পড়িসনি?” মেয়ে সজল চোখে বলল, “না। রোজ মা স্কুলে দিতে যায়। আজ বাড়িতে কুটুম এসেছে তাই আমায় একা ছেড়ে দিয়েছে।” কাকা ভ্যাবলার মত বলল, “তো কি হয়েছে? স্কুল চিনিস না? কোন স্কুল?” মেয়েটি ফোঁপাতে ফোঁপাতে জানাল, “তারাসুন্দরী। আমি চিনি তবে রাস্তা পেরোতে পারছি না।” কাকা সস্নেহে হেসে বলল, “ অঃ। এই ব্যাপার। কি ভন্দু মেয়ে রে। রাস্তা পেরোতে পারছে না বলে কাঁদছিস? আয় আমাদের সাথে। তুই রিন্টির হাত ধর।”

এর পরে মাঝে মাঝেই দেখা হত রাস্তায় ঘাটে, হাটে-বাজারে, দোকান-পাটে, পাড়ার পুজোর প্যান্ডেলে, ছুটির সময় স্কুলের গেটে চেনা-অচেনা মানুষের ভিড়ে, কোন টাই মনে রাখার মত নয়। মুঠোয় ধরে রাখা বালির মত দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছিল আশির দশক। পাল্টে যাচ্ছিল চেনা শহর। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, বড় বড় কলকারখানা। মেটাল বক্স, কেশোরাম কটন মিলস, বেঙ্গল ল্যাম্প, সুলেখা ওয়ার্কস, গেস্কিন উইলিয়ামসের মত বড় বড় কলকারখানার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল অজস্র ছোট ছোট কারখানা। উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত থেকে রাতারাতি খুব গরীব হয়ে পড়ছিল লোকজন। যেমন ওদের পাড়ারই হাসু কাকু বা তপন জেঠু, কিছুদিন আগেও চকচকে জামাপ্যান্ট পরে জার্মান সিলভারের টিফিন বক্স আর পানের ডিবে নিয়ে অফিস করতে যেত, এখন গলির মোড়ে বসে পেয়াজি ভাজে হাসু কাকু। আর তপন জেঠু, ডাঁটি ভাঙা চশমা সুতো দিয়ে বেঁধে বাড়ি বাড়ি কাগজ বিলি করে। রিন্টির বাবার অফিসেও কি সব যেন চলছে, মাইনে কমে গেছে বাবার। আগের মত বাবা আজকাল আর অত হাসিখুশি থাকে না। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিনরাত ঝগড়া করে ওর বাবা-মা। স্বপ্নময় জীবনটা যেন কি রকম কষাটে হয়ে যাচ্ছিল।

এরই মাঝে হঠাৎ একদিন বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে গেল শম্পা। দুই জেঠতুতো খুড়তুতো বোনের মধ্যে বয়সের এতটাই তফাৎ ছিল যে ওরা কখনই একে অপরের বন্ধু হতে পারেনি। রিন্টি ছিল শম্পার মুগ্ধ অনুরাগিণী। সৌন্দর্য নিয়ে গোটা রায়চৌধুরী বাড়ি দুভাগে বিভক্ত ছিল, একদলের চোখে হেমা মালিনী ছিলেন দুনিয়ার সেরা রূপসী, অপর দল ছিল সায়রা বানুর অন্ধ ভক্ত। শ্রীদেবী তখনও জাতে ওঠেনি। কাকা বলত, “এই তোদের শ্রীদেবী? নাকি বিশ্রীদেবী?” যাই হোক কিন্তু রিন্টির চোখে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপসী ছিল শম্পা। শম্পা যখন স্কুল থেকে ফিরে, বিকালে গা ধুয়ে, এক ঢাল কালো চুল ফাঁপিয়ে একটা এলো খোঁপা বাঁধত, মুখে আলতো করে বুলিয়ে নিত পাউডারের পাফটা, চোখে দ্রুত ঘষে নিত কাজল, কপালে কুমকুমের টিপ, হাঁ করে তাকিয়ে থাকত রিন্টি। ডুবন্ত সূর্যের মায়াবী আলোয় কি যে অপরূপা দেখাত শম্পাকে, তা ভাষায় অপ্রকাশ্য। না গৌরী ছিল শম্পা, নাই কৃষ্ণ বর্ণা। ঠাকুমা বলত কাঁচ কাঁচ রঙ। লক্ষ্মী প্রতিমার ধাঁচে গোল মুখ, তাতে ঘন কৃষ্ণ এক জোড়া ভ্রুর নীচে, আঁখি পল্লবের ভারে অবনত টানাটানা দুটো চোখ, পাতলা সুউচ্চ নাক, নাকে এক কুচি হিরে সব সময় যেন জ্বলজ্বল করত। ভিজে ভিজে এক জোড়া ঠোঁট, ওপরের ঠোঁটটা যত পাতলা ছিল, নীচেরটা ততটাই মোটা ছিল, ঠিক যেন এক কোয়া কমলা লেবু। বিয়ে বাড়ি বা কোন অনুষ্ঠানে যখন লিপস্টিক লাগাত শম্পা, রিন্টির মনে হত, শম্পার রূপের বাহার যেন অনেকটাই কমে যেত। কি অপরূপ হাত-পায়ের গড়ন ছিল শম্পার, হাজার ধুলো ঘাঁটলেও কখনও মলিন হত না। শীতের সকালে যখন ফ্রকের ওপর পুরানো শাল জড়িয়ে পড়তে বসত শম্পা, নিজের পড়া ভুলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত রিন্টি। ছুটির দুপুর বেলা লুকিয়ে পুরানো সিনে অ্যাডভান্সের পাতা ওলটাতে ওলটাতে, বা টিভিতে চিত্রহার বা চিত্রমালা দেখতে দেখতে, শম্পা মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলত, “এরাও নাকি নায়িকা! হুঃ। তুই বল বোন, এদের থেকে আমায় ভাল দেখতে না?” শম্পা কি সত্যি ওর জবাবের প্রত্যাশা করত? পরে রিন্টির মনে হয়েছিল, ও গুলো আসলে ছিল স্বগতোক্তি। কিন্তু সাগ্রহে শম্পাকে সমর্থন জানাতে পেরে যেন বিগলিত হয়ে যেত রিন্টি। জেঠিমা বাড়িতে না থাকলে, মাঝে মাঝে লুকিয়ে সীমন্তে সিঁদুর ছোঁয়াত শম্পা, তারপর চোখ মটকে জিজ্ঞেস করত, “ আমায় কেমন দেখাচ্ছে রে?” কোন এক অলস মুহূর্তে আনমনে শম্পার গাওয়া, এক কলি, “নাম গুম জায়েগা-” সেই সব মুহূর্ত গুলো ছিল রিন্টির শৈশবের মণিমুক্তো।

শম্পার যে এই রকম রাতারাতি বিয়ে হয়ে যাবে তা বোধহয় কেউ ভাবেনি। শম্পা তখন সবে দশম শ্রেণীতে উঠেছে। চারটে দশে ছুটি হত। খুব রক্ষণশীল পরিবার ওদের, উঠতি যৌবনা মেয়েকে একা রাস্তায় ছাড়া হত না। জেঠিমা স্বয়ং দিতে এবং আনতে যেত, সেদিনও সাড়ে চারটে নাগাদ জেঠিমা এবং শম্পা ফিরেছিল। রিন্টির আজো স্পষ্ট মনে আছে, ওদের বাড়ি সেদিন এক নাগা সন্ন্যাসী এসেছিলেন। আদপে হয়তো ভিক্ষা চাইতেই এসেছিলেন, মেজ ঠাকুমার এই সন্ন্যাসীদের প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি। কাউকে পেলেই হত, তাদের খাতির করে বসিয়ে, চা-জলখাবার খাইয়ে তুষ্ট করে ভবিষ্যৎ জানতে চাইতেন। নিঃসন্তান ঐ বয়সী রমণীর ভবিষ্যতের কাছে কি জিজ্ঞাস্য ছিল, তা কোনদিনই রিন্টি বোঝেনি। তবে মনে আছে, প্রায় প্রত্যেকেকেই অন্তে একই প্রশ্ন করতেন মেজ ঠাকুমা, “বাবা কবে মরব বলতে পার? মরার আগে পরের গলগ্রহ হয়ে থাকব না তো? আমার বরের আগে মরব না তো? একটু দেখ বাবা। বড্ড অসহায় ও।” বলতে বলতে প্রতিবার গলা বুজে যেত মেজ ঠাকুমার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুলভাল জবাব দিত সাধুবাবারা, কেউ কেউ অবশ্য দয়াদ্র কণ্ঠে বলত, “জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ কি বলা যায় মা?” আবার কেউ কেউ ভারি পুজো-আচ্চা, হোম যজ্ঞের বিধান দিত। ঠাকুর, দেবতার নাম করে টাকা, পয়সা নিয়ে যেত। মেজ দাদু তাই এই সব সাধু বাবাদের দুচক্ষে দেখতে পারত না। কিন্তু অসহায়া বৃদ্ধ স্ত্রীকে মুখের ওপর নিষেধ করতেও পারতেন না।

সেদিনও এ রকমই এক সাধু বাবা এসেছিল, পড়ন্ত বিকালে ভিক্ষা চাইতে। উঠোনে পেতে রাখা চৌকিতে বসে, মেজ ঠাকুমার নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন বাবাজী। মৃত্যুর প্রসঙ্গে, হাত তুলে বলেই দিলেন, যে কে কবে মরবে তা বলতে পারার মত জ্ঞান ওনার নেই। তবে মেজ ঠাকুমার হাত দেখে এটুকু আশ্বস্ত করলেন, যে ওনার কপালে বৈধব্য যোগ আছে। বারংবার বলা সত্ত্বেও মেজদাদু হাত দেখাতে চাইল না। রিন্টি তখনও শিশু শ্রেণীতে পড়ে, মেজ ঠাকুমার সনির্বন্ধ অনুরোধেও সাধু বাবা রিন্টির হাত দেখতে চাইল না। বলেই দিলেন, “পনেরো ষোল বছরের আগে ওদের হাতের রেখাই তৈরি হয় না। ওদের বাবা-মায়ের হস্তরেখাই আপাততঃ ওদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।” রিন্টির মা, বড়মা, ঠাকুমা সকলে সারি দিয়ে হাত দেখাতে বসেছিলেন। কাকার সেদিন কলেজে অফ ডে ছিল, তাই বাড়িতেই ছিল, বাড়ির মেয়েরা এরকম সারি বদ্ধ ভাবে একজন অপরিচিত পুরুষকে হাত দেখাতে বসায়, কাকা বোধহয় ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু বলেছিল, সাধু বাবা তখন বড়মার হাতটা দেখছিল।একটানে হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিশাল চেহারা, কোমর অবধি জটা নেমেচে, ভস্ম মাখা প্রায় উলঙ্গ শরীরে শুধু লজ্জা নিবারণের জন্য একটুকরো বিবর্ণ লালচে লেঙটি আর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। রক্ত চক্ষু মেলে কাকার দিকে তাকিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে ঠেঠ হিন্দিতে বলে উঠল, “ দুপাতা ইংরাজি পড়ে, বিরাট পণ্ডিত হয়ে গেছিস? প্রমাণ চাস, বেশ এই মেয়েটার পিঠে যে থলে আছে” বিশাল হাত বাড়িয়ে শম্পার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, “ ঐ থলে খুঁজলে একটা চিঠি পাবি।এক বিজাতীয় যুবকের লেখা প্রেম পত্র। আর এই আমি বলে যাচ্ছি, যদি আগামী তিনটে পূর্ণিমার মধ্যে এর বিয়ে না দিস, তো এই মেয়ে কুলত্যাগিনী হবে।”

মুহূর্তের বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে, কাকা ব্যঙ্গ করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, জেঠিমা তার আগেই ছিনিয়ে নিল, শম্পার ব্যাগ। পাগলের মত হাঁটকাতে লাগল, প্রতিটা বই, খাতা। কাকা উপহাস করে বারবার নিষেধ করছিল, পাত্তাও দিল না জেঠিমা। ঝাড়তে ঝাড়তে এক টুকরো কাগজ ঝরে পড়ল ওদের শান বাঁধান উঠোনে। শম্পা ঝুঁকে তুলতে যাবার আগেই বাঘের মত ছিনিয়ে নিল জেঠিমা। চিঠিতে কি লেখা ছিল, রিন্টি জানে না। চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে শম্পাকে টেনে নিয়ে গেল জেঠিমা। কি মার খেয়েছিল সেদিন শম্পা। শম্পা যতটা কেঁদেছিল প্রায় ততটাই কেঁদেছিল রিন্টি। ছোট ছোট হাতে গুমগুম করে কিল মারছিল জেঠিমাকে। কাকা পাগলের মত চ্যাঁচাচ্ছিল, ঠাকুমা, মেজ ঠাকুমা হাউমাউ জুড়ে দিয়েছিল। রিন্টির মা ওকে টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে রিন্টি শুধু শুনতে পাচ্ছিল শম্পার আর্ত চিৎকার, “বিশ্বাস কর মা, আমি চিনি না। আমিনা দিল। আমিনার দাদা হয়। আমি পড়িনি। আমিনা শুধু বলেছিল, চুপচাপ ব্যাগে রাখ। বাড়ি গিয়ে পড়ে, কাল জানাস।” আমিনা দি? আমিনা দি তো দিদির সাথে পড়ে, বহুবার ওদের বাড়ি এসেছে। দিদির সাথে রিন্টি, সিন্নিও গেছে ওদের বাড়ি। কাকা স্কুটারে চাপিয়ে দিয়ে আসত, আবার নিয়ে আসত। আমিনা দি এমন কি করল, যে জেঠিমা দিদিকে এত মারছে, তা সেদিন রিন্টির ছোট্ট মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না।
#AninditasBlog
Facebook Page - https://www.facebook.com/amianindita.blogspt.in/
(চলবে)